ইতিহাস

আলেকজান্ডার পোপ

অষ্টাদশ শতকের একজন বিখ্যাত ইংরেজ কবি হলেন আলেকজান্ডার পোপ(Alexander Pope)৷ ব্যঙ্গাত্মক ও প্রহসনমূলক লেখার জন্য তিনি ইংরেজি সাহিত্যে কিংবদন্তিতুল্য স্থান অধিকার করে আছেন৷ দ্য অক্সফোর্ড ডিক্সনারি অফ কোটেশনস (The Oxford Dictionary of Quotations) অনুসারে শেক্সপীয়ারের পরে আলেকজান্ডার পোপই এমন একজন লেখক যাঁকে বিভিন্ন রচনায় সব থেকে বেশী উদ্ধৃত করা হয়েছে। তাঁকে হিরোয়িক কাপলেট(Heroic couplet) ব্যবহারে সর্বশ্রেষ্ঠ ধরা হয়৷

১৬৮৮ সালের ২১ মে লন্ডনে আলেকজান্ডার পোপের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম আলেকজান্ডার পোপ সিনিয়র এবং মা এডিথ টার্ণার। লন্ডনের স্ট্রান্ডে তাঁর বাবা কাপড়ের ব্যবসা ছিল ৷

আলেকজান্ডার পোপের প্রাথমিক পড়াশুনা শুরু হয় ১৫৯৮/৯৯ সালে টফোর্ড বিদ্যালয়ে (Twyford School)। টেস্ট অ্যক্টের প্রভাব তাঁর পড়াশোনায় পড়েছিল৷ টেস্ট অ্যক্ট ছিল এমন একটি আইন যার দ্বারা রোমান ক্যাথলিকদের ওপর বিভিন্ন নাগরিক প্রতিবন্ধকতা চাপিয়ে দেওয়া হত৷ তাঁর মা বাবা দুজনেই ছিলেন রোমান ক্যাথলিক ফলে তাঁকে পড়াশোনার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল৷ ১৭০০ সালে পরিবারের সঙ্গে তিনি রয়্যাল উইন্ডফরেস্ট এর কাছে বিনফিল্ড এর পোপসউড এ চলে আসেন। এখানে আসার পর তাঁর প্রথাগত শিক্ষা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়৷ তিনি এরপর নিজে থেকেই পড়াশোনা শুরু করেন৷ ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, লাতিন, ফরাসি, এবং গ্রীক কবিদের লেখা তিনি পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষায় জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন৷ বিভিন্ন সাহিত্যের ক্লাসিক লেখাগুলো তিনি পড়তে শুরু করেন। যে সমস্ত সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে তিনি ভালোবাসতেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জিওফ্রে চসার, উইলিয়াম শেক্সপীয়ার, হোমার, ভার্জিল, হোরেস ও জুভেনাল প্রভৃতি৷

আলেকজান্ডার পোপের কর্মজীবন বলতে তাঁর সাহিত্য জীবনকেই বোঝায়৷ ১৭০৯ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা ‘প্যাস্টোরালস’ । এই লেখা  তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। ১৭১১ সালে তেইশ বছর বয়সে তিনি লেখেন ‘অ্যন এসে অন ক্রিটিসম’। এই কাব্যটির ভিত্তি ছিল  “To err is human, to forgive divine” এই উক্তিটি৷ ১৭১১ সালে  জন গে, জোনাথন সুইফট, থমাস পার্ণেল এবং জন আরবাথনটকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘স্ক্রিবলেরাস ক্লাব’। ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্য সৃষ্টিতে এই ক্লাবের সদস্যদের অবিস্মরণীয় অবদান ছিল৷ ১৭১২ সালে প্রকাশিত ‘রেপ অফ দ্য লক’ ছিল আলেকজান্ডার পোপের বিখ্যাত কবিতা। ১৭১৪ সালে এই কবিতাটির সংশোধিত এবং বর্ধিত সংস্করণ  আবার প্রকাশিত হয়। ১৭১৭ সালে তাঁর কবিতার সংকলন নিয়ে একটি ফোলিও প্রকাশিত হয়েছিল যাতে ছিল দুটি প্রেমের কবিতা, ‘ভার্সেস টু দ্য মেমরি অব ইমরটাল লেডি’ এবং ‘এলয়সা টু আবেরলার্ড'(Eloisa to Abelard)। একজন ব্যঙ্গাত্মক কবি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
জোসেফ অ্যডিসনের সঙ্গে বন্ধুত্বের খাতিরে জোসেফের নাটক ‘ক্যাটো’ (Cato) তে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন৷ একই ভাবে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এবং ‘দ্য স্পেকটেটর’ এই দুই সংবাদপত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ১৭১৯ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত ভিলা ‘Grotto’ এবং একটি বাগান নির্মান করেন৷

আলেকজান্ডার পোপের বিখ্যাত মহাকাব্য ‘দ্য রেপ অফ দ্য লক’। এছাড়া ‘অ্যন এসে অন ক্রিটিসিসম’, ‘প্যাস্টোরালস’, ‘উইন্ডসোর ফরেস্ট’, ‘প্রোলোগ টু দ্য স্যাটায়ার্স’, ‘থ্রি আওয়ার আফটার ম্যারেজ’ প্রভৃতি৷ ‘অ্যন এসে অন ক্রিটিসিসম’ ‘(An Essay on Criticism) কবিতাটি আলেকজান্ডার পোপ তাঁর জীবনের প্রথম দিকে লেখা শুরু করেছিলেন এবং এটি শেষ করতে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছিল।  কবিতাটি কাঠামোগত দিক থেকে একদম নতুন ছিল৷ ‘দ্য রেপ অফ দ্য লক’ (The Rape of the Lock) ছিল আলেকজান্ডার পোপের বিখ্যাত কবিতা। এটিকে মক্ এপিক (mock-epic) বলা হয়। অ্যরাবেল্লা ফারমর (Arabella Fermor) এবং লর্ড পিটার (Lord Petre)এর মধ্যে চলা অভিজাত সম্প্রদায়ের বিবাদকে ব্যঙ্গ করে কবিতাটি রচিত হয়েছে।

‘দ্য ডানসিয়াড এন্ড মরাল এসেস'(The Dunciad and Moral Essays) কবিতাটি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা কাজ । ইংরেজি কবিতার ইতিহাসে স্বতন্ত্র একটি রচনা এটি৷ আলেকজান্ডার পোপ তাঁর প্রতিটি সাহিত্য কর্মে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবগুলি নিয়ে ব্যঙ্গ করার কোনও সুযোগ কখনই হাতছাড়া করেননি৷ তাঁর কাব্যিক প্রতিভায় সেটিই ছিল অভিনবত্ব।

১৮৩৮ সালের পর থেকে আলেকজান্ডার পোপ নিজস্ব লেখালিখি কমিয়ে দেন৷ তিনি ‘ব্রুটাস’-এর দেশাত্মবোধ নিয়ে লিখতে চেয়েও শেষপর্যন্ত লিখে উঠতে পারেননি৷ নিজস্ব লেখালিখি ছাড়া তিনি বেশ কিছু অনুবাদের কাজও করেছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই তিনি হোমারের রচনা পড়ে মুগ্ধ হয়ে ছিলেন৷ ১৭১৩ সালে ইলিয়ড অনুবাদের পরিকল্পনা তিনি ঘোষনা করেন। পাঁচ বছর সাধনা করে তিনি অনুবাদ করেছিলেন হোমারের ইলিয়ড। প্রতি বছর একটি করে ভলিউম অনুবাদ করেছিলেন। প্রকাশক Bernard Lintot এর সঙ্গে তাঁর প্রতি ভলিউমের জন্য তিনি দুশো গিনি চুক্তি হয়েছিল৷  ১৭১৫-১৭২০ সালের মধ্যে এই অনুবাদ শেষ হয়েছিল। লেখক স্যামুয়েল জনসন তাঁর এই অনুবাদ কার্যের প্রশংসা করে বলেছেন, “a performance which no age or nation could hope to equal”। ইলিয়ডের সাফল্যের পর ১৭২৫- ১৭২৬ সালে একই প্রকাশকের থেকে পাঁচ খন্ডের ওডিসি তিনি অনুবাদ করেন৷ এরপর প্রকাশক জেকব টনসনের(Jacob Tonson) সাথে চুক্তিবদ্ধ হন শেক্সপীয়ারের রচনা অনুবাদের জন্য৷ প্রকাশের পর দেখা যায় তিনি শেক্সপিয়ারের রচনা থেকে ১৫৬০ টি লাইন বাদ দিয়েছেন যার ফলে তাঁকে প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়৷

তাঁর ব্যক্তিগত জীবন খুব একটা আরামদায়ক ছিল না৷ রোমান ক্যাথলিক হওয়ার সুবাদে ছোটোবেলা থেকে তাঁকে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল৷ মাত্র বারো বছর বয়েস থেকে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় তিনি ভুগেছেন৷ তিনি Pott disease নামের একটি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এটি যক্ষ্মার এমন একটি ধরন যার প্রভাব পড়েছিল তাঁর মেরুদণ্ডের উপর৷ ফলে দেহে বিকৃতি দেখা যায় এবং বৃদ্ধি হার বন্ধ হয়ে যায়।জ্বর, চোখ ফোলা, পেট ব্যথা, শ্বাস কষ্ট ও অন্যান্য নানা সমস্যা দেখা দেয় তাঁর শরীরে। তাঁর উচ্চতাও ছিল চার ফুট ছয় ইঞ্চি৷ এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন।

মৃত্যুর আগে যখন চিকিৎসকেরা বলেছিলেন তিনি ভালো আছেন, আলেকজান্ডার উত্তর দিয়েছিলেন “Here am I, dying of a hundred good symptoms.” ১৭৪৪ সালের ৩০ মে আলেকজান্ডার পোপের মৃত্যু হয় ।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।