বিবিধ

আমূল কন্যা

বিশ্বের সবথেকে বড় দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী সংস্থা আমূল। আমূল বলতেই প্রথমেই যেই ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেটা একটি ছোট্ট মেয়ের ছবি যার মাথার চুলের রং নীল, গায়ে লাল পলকা ডটের ফ্রক, মাথায় রিবন। মেয়েটির মুখে মুচকি হাসি। সে কখনও একহাতে আমূলের মাখন নিয়ে আবার কখনও একহাতে আমূলের দুধের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মেয়েটি ভারতের সর্বাধিক পরিচিত বিজ্ঞাপনী ম্যাসকট- আমূল কন্যা (Amul Girl)। 

স্বাধীনতার আগে ইংল্যান্ডের “পলসন” নামে একটি ডেয়ারি সংস্থা ভারতের কৃষকদের থেকে অত্যন্ত কম দামে দুধ কিনে বোম্বে (মুম্বাই)তে গিয়ে চড়া দামে বিক্রি করত। গুঁড়ো দুধও তারাই প্রথম এনেছিল ভারতে। ভারতে দুধের ব্যবসায় একচ্ছত্র ব্যবসা ছিল পলসন ডেয়ারির। দুধের দাম বেশী হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ দুধ কিনে খেতে পারত না। ১৯৪৬ সালে গুজরাটের ত্রিভুবন দাস প্যাটেল নামে একজন দুধ ব্যবসায়ী যিনি প্রথমবার এমন এক সংস্হা তৈরী করতে উদ্যোগ নেন যেখানে সমবায় পদ্ধতিতে নায্য মুল্যে সমস্ত দুধ ব্যবসায়ীদের থেকে দুধ কিনে নিয়ে বিক্রি করার ব্যবস্থা করা হয়। গ্রামের মহিলারা সরাসরি দুধ বিক্রি করার সুযোগ পান বোম্বেতে(মুম্বাই)। ত্রিভুবন দাসের এই সংস্হা সরাসরি দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করে সারা ভারতে বিক্রি করা শুরু করে এবং তাঁকে এই কাজে সাহায্য করেন ডঃ ভার্গিস কুরিয়েন যাঁকে ভারতের “শ্বেত বিপ্লব” এর জনক বলা হয়ে থাকে। এই সংস্থার নাম রাখা হয় “আনন্দ মিল্ক ইউনিয়ন লিমিটেড” পরবর্তীতে সংস্কৃত শব্দ “অমূল্য” থেকে অণুপ্রাণিত হয়ে এই সংস্হার নাম রাখা হয় “আমূল”। এইভাবেই আমূল কোম্পানির সূত্রপাত হয়।

১৯৫৭ সালে “আমূল” ব্র্যান্ড হিসেবে রেজিষ্টার্ড হয়। ১৯৬২ সালে কোম্পানির চেয়ারম্যান ডঃ কুরিয়েন ঠিক করেন কোম্পানীর বিজ্ঞাপন তৈরী করবেন । সেইমত ডঃ কুরিয়েন বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব দেন বোম্বের বিখ্যাত “আ্যডভার্টাইজিং আ্যন্ড সেলস প্রমোশন কোম্পানি” কে। সংস্হার আর্ট ডিরেক্টর সিলভেস্টার ডি কুনহাকে ডেকে আমূলের কণর্ধার ভার্গিস কুরিয়েন বলেন যে এমন একটা ম্যাসকট তৈরী করতে হবে যা দেশের প্রতিটি গৃহবধূর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। তিনি আরও বলেছিলেন ম্যাসকটটি যেন এমন হয় যে সহজেই মনে রাখা যায় এবং মনের মধ্যে তার একটা প্রতিচ্ছবি তৈরী হয়ে যায়। সেইমতো সংস্থার কমিউনিকেশনের প্রধান রাহুল ডিকুনহা, কপিরাইটার মনীষ জাভেরি এবং জয়ন্ত রানে গবেষণা শুরু করে দেন।

রাহুল এবং জাভেরি দুজনে প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করেন। বুঝতে চেষ্টা করেন প্রতিদিনের সমালোচিত বিষয়গুলি কি কি, মানুষের আগ্রহ কোন বিষয়ের প্রতি। এইভাবে তাঁরা গবেষণা করে একটি বিষয় ঠিক করেন যে ম্যাসকট হিসেবে তাঁরা একটি ছোট মেয়ের ছবি স্কেচ করবেন। সেইমতো তাঁরা ৭১২টি বাচ্চা মেয়ের ছবি বাছাই করেন কিন্তু তাঁদের মনের মত বাচ্চার ছবি আর খুঁজে পান না। সেই সময় সংস্হার কর্ণধার সিলভেস্টার ডি কুনহা শশী থারুরের (বতর্মানে লোকসভার সদস্য) বাবা চন্দন থারুরকে অনুরোধ করেন তাঁর মেয়েদের ছবি পাঠাতে। সেইমতো শশী থারুরের দুই বোনের ছবি পাঠানো হয়। বড় বোন শোভাকে পছন্দ করা হয় প্রথম আমূল কন্যা হিসেবে। জয়ন্ত রানে স্কেচ আঁকার কাজ করেন । ইউষ্টাস ফার্নান্দেজ ছিলেন কোম্পানির আর্ট ডিরেক্টর। তাঁর উপরেই দায়িত্ব পরে সেই মেয়েটির ছবি বোর্ডে আঁকার।

১৯৬৬ সালে প্রথমবার আমূল ম্যাসকট হিসেবে আমূল কন্যা বা আমূল গার্ল-এর স্কেচ আঁকা হয় সাদা কালোয়। জন্ম হয় “আমূল গার্ল” এর। সেই থেকে আজ অবধি আমূলের এই ম্যাসকটটিকে নানারূপে নানান ভঙ্গিতে চিত্রিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে যখন আমূল কন্যা রঙিন হয় তখন শোভার বোন স্মিতার ছবি ব্যবহৃত হয়। স্মিতাই হলেন প্রথম রঙিন আমূল গার্ল ম্যাসকট।

ইউষ্টাস ফার্নান্দেজ প্রথমবারের জন্য আমূল কন্যার ম্যাসকটটি আঁকেন এবং জাভেরি ক্যাপশন লেখেন। প্রথম বিজ্ঞাপনটি বিলবোর্ডে এসেছিল। বিজ্ঞাপনটি ছিল এমন — একটি ছোট্ট মেয়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। তার এক চোখ বন্ধ। অন্য চোখ মাখনে নিবদ্ধ যাতে লেখা “প্রতিদিন আমাদের জন্য রুটি আর আমূল মাখন রেখো।” প্রথম বিজ্ঞাপনই সফল। ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। দেশবাসীর হৃদয় জয় করে নেয় ম্যাসকটটি। আমূল কন্যা খুব তাড়াতাড়ি জনপ্রিয়তা লাভ করে। চাহিদা বাড়তে থাকে বিজ্ঞাপনী এই ম্যাসকটটির। আমূল প্রতিদ্বন্দ্বী পলসনকে টেক্কা দিতে শুরু করে। সিলভেষ্টার ম্যাসকটটিকে আরও মনোগ্রাহী কীভাবে করা যায় তার চেষ্টা করতে থাকেন। ইসকনের জনপ্রিয় স্তব “হরে কৃষ্ণ হরে রাম ” এর অণুকরণে আমূল তাদের প্রথম স্লোগান তৈরী করে ,”হারি আমূল হারি হারি।” বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এই স্লোগানটি। সেই সময়ে সপ্তাহে এক বা দুইবার বিজ্ঞাপন আসত। দর্শক সারা সপ্তাহ অপেক্ষা থাকত পরের বিজ্ঞাপনে নতুন কি চমক আছে তার জন্য। আমূল মাখনের সাথে যে ক্যাচ লাইনটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেই “আটারলি বাটারলি ডিলিশিয়াস” লাইনটি কিন্তু সৃ‌ষ্টি করেছিলেন সিলভেস্টারের স্ত্রী নিশা ডি কুনহা।

যখনই দেশে কোন বিষয় নিয়ে আলোড়ন ঘটেছে তখনই তা আমূল গার্লের বিজ্ঞাপনে তার প্রতিফলন আমরা দেখেছি। সিলভেষ্টার ডি কুনহার ছেলে রাহুল ডি কুনহা দায়িত্ব নেওয়ার পরে আমূলের বিজ্ঞাপনে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি বেশী করে দেখা যায়। ১৯৭৬ সালে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে যখন দেশে জরুরী অবস্হা জারি হয় তখন আমূলের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় তার প্রতিচ্ছবি। ২০০১ সালে যখন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস স্ট্রাইক ঘোষণা করে সেইসময়ও আমূল গার্ল সেই স্ট্রাইককে সমর্থন করে একটি বিজ্ঞাপন সামনে আনে। যদিও এই নিয়ে সমালোচনা হয় বিস্তর। হুমকি দেওয়া হয় যদি আমূল কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞাপনটি তুলে না নেন তাহলে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে তাদের মাখন সরবাহ বন্ধ করা হবে। কিন্তু আমূল কর্তৃপক্ষ বা রাহল ডি কুনহা কেউই বিজ্ঞাপনটি তুলে নেননি। তাঁরা কোনদিনই কোন হুমকির সামনে মাথা নত করেননি বরঞ্চ অকুতোভয় হয়ে কাজ করে গেছেন এবং আজও করে চলেছেন। আর্থিক ঘাটতির কারণে ধুঁকতে থাকা টেলিকম সংস্থাগুলির জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটি বিশেষ ছাড় ঘোষণা করেন যেখানে আগামী দুবছর বিনামূল্যে টেলিকম সংস্হাগুলি স্পেকট্রাম ব্যবহার করতে পারবে। এই বিষয়ের উপর আমূলের বিজ্ঞাপনটি ছিল খুব আর্কষণীয়। আমূল কন্যাকে এক হাতে মাখন পাউরুটি সহ অন্য হাতে ফোনে কথা বলতে দেখা যায়। ফাইটার প্লেন রাফালের ভারতে আগমনকে কেন্দ্র করেও আমূল গার্লকে দেখা যায় ফাইটার প্লেন চালকের পোশাকে। পাশে লেখা “জেট উই মেড”। ২০১২ সালে আমূল অলিম্পিক গেমসের স্পনসর ছিল। সেই সময়ে তাদের বিজ্ঞাপনে আমূল কন্যাকে অলিম্পিকের রিং নিয়ে দেখা যায়। বার বার বিখ্যাত ব্যাক্তিত্বের কার্টুন আমূলের এই ম্যাসকটটির সাথে একই সাথে দেখা গেছে। এদের মধ্যে জগমোহন ভালমিয়া, সুরেশ কালমাদি, সুব্রত রায়ের মতন বিখ্যাত ব্যাক্তিত্বরা যেমন আছেন তেমনই এই তালিকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বা বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতারাও রয়েছেন।

১৯৬৬ সালে যখন আমূলের ম্যাসকটটি তৈরী হয় তখন তাদের বার্ষিক দুধ বিক্রির পরিমাণ ছিল ১০০০ টন। কিন্তু “আমূল কন্যা” ম্যাসকটির জন্য আমূলের জনপ্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে তাদের বিক্রিও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ১৯৯৫ সালে আমুলের বার্ষিক বিক্রির পরিমান ছিল ২৫০০০ টন। একটি ছোট্ট কো অপারেটিভ সংস্থা থেকে আমূল আজ ৬০০০ কোটি টাকার কোম্পানি। এই এতটা পথ তৈরী হতে আমূলের পণ্যের গুণগত মান যেমন সঠিক রয়েছে তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে এই “আমূল কন্যা”। ভারতের বিজ্ঞাপনের জগতে সবচেয়ে বিখ্যাত ম্যাসকট হল “আমূল কন্যা”।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন