ইতিহাস

বিহারীলাল চক্রবর্ত্তী

বিহারীলাল সম্পর্কে প্রমথনাথ বিশী বলেছেন, ‘তিনি নব্য রোমান্টিক কবিগণের অগ্রণী আর বাঙালি মাইনর (অপ্রধান) কবিগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।’ [বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা : ভূদেব চৌধুরী]

মাইনর কবিগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেও বোধহয় উনিই একমাত্র কবি, যাকে কবিগুরুর গুরু বলা হয়। রবীন্দ্রনাথের চোখে বাংলা গীতিকবিতার ‘ভোরের পাখি’।

আধুনিক গীতিকাব্যের অন্যতম পুরোধা এবং রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুরু বিহারীলাল চক্রবর্ত্তীর জন্ম ২১ মে, ১৮৩৫ কলকাতার নিমতলায়।

রবীন্দ্রনাথ তখন যুবক আর জ্যেষ্ঠ সহোদর দ্বিজেন্দ্রনাথ বিহারীলালের একনিষ্ঠ অনুরাগী। ‘সঙ্গীত শতক’ পাঠে মুগ্ধ হয়ে তিনি বলতেন-“ বিহারীলালের হাড়ে হাড়ে প্রাণে প্রাণে কবিত্ব ঢালা থাকিত। তাহার রচনা তাঁহাকে যত বড় কবি বলিয়া পরিচয় দেয়, তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বড় কবি ছিলেন।” সেসময় ঠাকুরবাড়িতে আসত বিহারীলালের ‘অবোধবন্ধু’ নামক মাসিক পত্রিকা আর সেই অবোধবন্ধুর বন্ধুত্বেই কোথাও ধরা পড়েছিল যুবক রবীন্দ্রনাথের মন। সুদীর্ঘ দুপুরে দাদার বইয়ের আলমারী থেকে চুরি করে পড়তেন ‘বঙ্গদর্শন’, ’সংগীত-শতক’’, বা ‘সারদামঙ্গল’ এর মত বিহারীলালের যুগোত্তীর্ণ সৃষ্টিগুলোকে। নিজের সুর খুঁজে পাচ্ছিলেন ভবিষ্যতের এক বিশ্বকবি। রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাতেই-“বাংলা ভাষায় বোধ করি সেই প্রথম মাসিক পত্র বাহির হইয়াছিল যাহার রচনার মধ্যে একটা স্বাদবৈচিত্র্য পাওয়া যাইত। বর্তমান বঙ্গসাহিত্যের প্রাণসঞ্চারের ইতিহাস যাঁহারা পর্যালোচনা করিবেন তাঁহারা অবোধবন্ধুকে উপেক্ষা করিতে পারিবেন না। বঙ্গদর্শনকে যদি আধুনিক বঙ্গসাহিত্যের প্রভাতসূর্য বলা যায় তবে ক্ষুদ্রায়তন অবোধবন্ধুকে প্রত্যুষের শুকতারা বলা যাইতে পারে।” রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক বিকাশে বিহারীলালের প্রভাব বা অনুপ্রেরনা অস্বীকার করা যায় না, ঠিক যেভাবে অস্বীকার করা যায় না বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাসে বিহারীলালের উপস্থিতি। রবীন্দ্রনাথের ‘বনফুল’, ‘ভগ্নহৃদয়’, বা ‘কবিকাহিনী’ তে হয়ত তাঁর সুস্পষ্ট প্রভাবও রয়েছে কিন্তু বিহারীলাল প্রসঙ্গে এ তথ্য যতটা না প্রাসঙ্গিক তার চেয়েও প্রাসঙ্গিক এক কবির একাধিক কবির প্রেরণা হয়ে ওঠা বিষয়টি, নির্ভরতা ও নির্বাচন হয়ে ওঠার প্রসঙ্গটি। কেবল রবীন্দ্রনাথ নয়, সমসাময়িক উদীয়মান কবি ও লেখকদের মধ্যে অধরলাল সেন, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, রসময় লাহা, অক্ষয়কুমার বড়াল, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত প্রমুখরা বিহারীলালের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিল বলা চলে, অক্ষয়কুমার তাঁকে গুরু বলেও মানতেন ঠিক যেমন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলতেন ‘ভোরের পাখি’। এমনকি রবীন্দ্রনাথের মানসচরিত্র গঠনে যে কাদম্বরী দেবীর উপস্থিতি অনস্বীকার্য, তিনিও বিহারীলালের কবিতার পরম ভক্ত ছিলেন, কবির নিজের কবিতারই কয়েক লাইন বুনে আসন করে উপহার দেন কাদম্বরী দেবী। ১৩০১ সালে ‘সাধনা’ পত্রিকায় বিহারীলালের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি এভাবেই ঋনস্বীকার করেছিলনে রবীন্দ্রনাথ –“এমন নির্মল সুন্দর ভাষা, এমন ভাবের আবেগ, কথার সহিত এমন সুরের মিশ্রণ আর কোথাও পাওয়া যায় না; বর্তমান সমালোচক এককালে “বঙ্গসুন্দরী’ “সারদামঙ্গলে’র কবির নিকট হইতে কাব্যশিক্ষার চেষ্টা করিয়াছিল, কতদূর কৃতকার্য হইয়াছে বলা যায় না, কিন্তু এই শিক্ষাটি স্থায়ীভাবে হৃদয়ে মুদ্রিত হইয়াছে যে, সুন্দর ভাষা কাব্যসৌন্দর্যের একটি প্রধান অঙ্গ; ছন্দে এবং ভাষার সর্বপ্রকার শৈথিল্য কবিতার পক্ষে সাংঘাতিক।”
‘বঙ্গসুন্দরী’ র বিহারীলাল যখন বলেন- “ প্রিয়তম সখা সহৃদয়!/প্রভাতের অরুণ উদয়, /হেরিলে তোমার পানে, /তৃপ্তি দীপ্তি আসে প্রাণে, /মনের তিমির দূর হয়। “- তখন মনে হয় বাংলা কবিতারই এক সরল মুখ কোথাও বিহারীলালের চোখদুটিকে আঘাত করছে সপ্রতিভ উড্ডীন থেকে। সাধু ভাষার মাঝেও কবিতার বিষয় ও প্রসঙ্গকে সেই যুগে বিহারীলালই আধ্যাত্মিক অর্জনের পাশাপাশি দিয়েছিলেন বস্তুজগতের বিবিধতা। তাঁর শ্লোকগুলি শরীরের ভেতরের তন্ময় ধ্যানকেই শ্রেষ্ঠতা দেয়, সংগীতসুধা দেয়, শাসনকাল পেরিয়ে যেতে দেয় সংরক্ষনবাদীদের। ‘সারদা-মঙ্গলে’ এও বিহারীলাল দেবী স্বরস্বতীকে কেবল চিরায়ত ঈশ্বরী রূপে দেখেননি বরং সওয়াল জবাব করেছেন অগ্রন্থিত প্রকারভেদগুলোর, বেছে নিয়েছেন ঈশ্বরীর অজুহাতে লুকিয়ে থাকা পৃথিবীর মুখগুলো। জননী, কন্যা, প্রেয়সী এমনই বহুবিধ জীবনধারার বিন্যাসে উঠে এসেছে এক প্রচ্ছন্ন প্রমাণ, থাকার ভেতরেও আরও এক থাকা। বিহারীলালের মৃত্যুতে ‘চিকিৎসাতত্ত্ব-বিজ্ঞান এবং সমীরণ’ নামক মাসিকপত্রে প্রকাশিত প্রবন্ধে লেখা হয়েছিল-“ সারদা-মঙ্গল বুঝিতে বিস্তৃত প্রাণ চাই। ‘সারদা-মঙ্গল’ কবি ভিন্ন অন্যে বুঝিবে না। এইজন্য বলিতে হয়, বিহারীলাল কবির কবি”।

কাব্যগ্রন্থ-
‘বঙ্গসুন্দরী’, ‘সঙ্গীত-শতক’, ‘সারদামঙ্গল ’, ‘মায়াদেবী ‘, ‘শরৎকাল’, ’ধুমকেতু’, ’দেবরানী’, ’বাউল বিংশতি’, ‘সাধের আসন’, ’কবিতা ও সঙ্গীত’, ‘নিসর্গ-সন্দর্শন’, ‘বন্ধু-বিয়োগ’ , ‘প্রেম-প্রবাহিনী’ , ‘স্বপ্ন-দর্শন’

কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সববাংলায় এর শ্রদ্ধার্ঘ্য



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।