ইতিহাস

দেবব্রত বিশ্বাস

দেবব্রত বিশ্বাস (Debabrata Biswas) ছিলেন বাংলার একজন প্রথিতযশা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। রবীন্দ্র সঙ্গীতকে তিনি তাঁর অনুনকরণীয় গায়কীর গভীরতায় এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতের পাশাপাশি তিনি গণসঙ্গীতেরও শিল্পী ছিলেন। তিনি জর্জ বিশ্বাস নামেও পরিচিত ছিলেন। গানের সাথে সাথে তাঁর আঁকাও ছিল অনবদ্য। তিনি যে কেবল খুব ভাল স্কেচ এবং ব্যঙ্গচিত্র আঁকতে পারতেন তাই নয়, তাঁর রান্নার হাতও ছিল দারুণ। এছাড়া তিনি লেখালেখিও করতেন। ১৯৩০ এর দশকের শেষের দিকে তিনি আইপিটিএ-এর (Indian People Theatre Association, IPTA) সঙ্গে যুক্ত হন। একাধিক বাংলা চলচিত্রে দেবব্রত বিশ্বাসকে অভিনয় করতেও দেখা যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাংলা গানের জগতে দেবব্রত বিশ্বাস ওরফে জর্জ বিশ্বাস একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।

১৯১১ সালের ২২ আগস্ট অধুনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ এলাকায় একটি ব্রাহ্ম পরিবারে দেবব্রত বিশ্বাসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা দেবেন্দ্র কিশোর বিশ্বাস ছিলেন একজন স্বনামধন্য আইনজীবী এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল অবলা দেবী। সামান্য গৃহবধূ হলেও দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনে তাঁর মায়ের বিশেষ প্রভাব পড়েছিল। তাঁর জন্মকালে রাজা পঞ্চম জর্জ ভারতে আসেন। সেই থেকে তাঁর ডাকনাম হয়ে যায় জর্জ।

১৯৩৩ সালে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে সেই বছরেই দেবব্রত বিশ্বাস হিন্দুস্তান ইন্সিয়োরেন্স কোম্পানিতে একজন কর্মী হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৭০ (মতান্তরে ১৯৭১) সালে অবসর নেন। ১৯৩৩ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। ছোটোবেলা থেকে গানের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও দেবব্রত বিশ্বাস যাঁদের কাছ থেকে গানের তালিম পেয়েছিলেন তাঁরা হলেন হিমাংশু দত্ত, অনাদি কুমার দস্তিদার, পঙ্কজ মল্লিক এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।  

তিরিশের দশকের শেষের দিকে আইপিটিএ-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরে তিনি গণসচেতনতা গড়ে তোলার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেন। এই সময় থেকেই একাধারে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী এবং গণসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। কয়েক বছরের বিরতির পরে ১৯৬১ সাল থেকে তিনি আবার গান রেকর্ড করা শুরু করেন। এরপরে বিখ্যাত চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের কিছু ছবিতেও তিনি গান গেয়েছেন। এমনকি, ঋত্বিক ঘটক তাঁর ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নির্বাচনের জন্যও দেবব্রত বিশ্বাসের সাহায্য নিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের কথা এবং সুরে যখন দেবব্রত বিশ্বাস স্বর মেলাতেন তখন যেন জাদু হত। কবিগুরুর গানের গভীরতাকে তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন এবং সেই অনুভূতিই তাঁর গাওয়া গানে ধরা পড়ত। তাঁর গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আবেগঘন অভিব্যক্তি এবং দরদী কন্ঠস্বর। সমসময়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতে তাঁকে পাল্লা দেওয়া মতো অন্য কোন গায়ক ছিলেন না। দেবব্রত বিশ্বাস, পঙ্কজ মল্লিক এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়– এই ত্রয়ী গায়ক রবীন্দ্রসঙ্গীতকে শহুরে শিক্ষিত মানুষজন ছাড়াও জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া বিখ্যাত কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীত হলো, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, ‘পুরানো সেই দিনের কথা’, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’, ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’, ‘তোমার কাছে এ বর মাগি’, ‘চোখের জলের লাগল জোয়ার’, ‘স্বপ্নে আমার মনে হোলো’ ইত্যাদি। তিনি ছিলেন এমন একমাত্র শিল্পী যিনি  সংস্কৃত, ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি এবং রুশ ভাষায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন। রামকৃষ্ণ মিশন ইন্সটিটিউট অফ কালচার থেকে তিনি এই ভাষাগুলির প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচলিত ছন্দ, তাল, লয় ইত্যাদিকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দেবব্রত বিশ্বাস স্বাধীনভাবে গান গাইতেন। একসঙ্গে এই গানের সঙ্গতের জন্য তিনি সেতার, সরোদ, এসরাজ, বেহালার মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি স্প্যানিশ গিটার, স্যাক্সোফোন, ক্ল্যারিয়ানেট, পিয়ানোর মতো বিদেশি বাদ্যযন্ত্রও ব্যবহার করতে থাকেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যাখ্যা এবং অভিব্যক্তির স্বাধীনতা তিনি এইভাবেই প্রকাশ করতেন। কিন্তু তাঁর এই শৈল্পিক স্বাধীনতা এবং বহুল জনপ্রিয়তাকে ১৯৬৪ সাল থেকেই প্রাতিষ্ঠানিকতার একাধিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তাঁকে রীতিমতো বাণিজ্যিক সৃষ্টিকার্য থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। সত্তরের দশকের শেষ দিকে বিশ্ব ভারতী মিউজিক বোর্ডের তরফ থেকে দেবব্রত বিশ্বাসের ওপরে রবীন্দ্রসঙ্গীত না গাওয়ার এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড না করার একটি স্বৈরাচারী ফতোয়া জারি করা হয়।     

দেবব্রত বিশ্বাসের জীবদ্দশায় রেকর্ড করা গানের সংখ্যা মাত্র ১০০ টি। কিন্তু, তাঁর অগণিত অনুগামীদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে কমপক্ষে ৬০০ টি নতুন গান পাওয়া গিয়েছিল। সলিল চৌধুরি, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মিত্রদের দেওয়া সুরে তিনি গান গেয়েছেন। নজরুলগীতি রেকর্ড করার সময়ে স্বয়ং কাজি নজরুল ইসলাম ছিলেন তাঁর প্রশিক্ষক। তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রসঙ্গ এলেই আজও তাঁকে নিয়ে আলোচনা করা হয়। বাংলা সঙ্গীতের জগতে তিনি একজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।

গানের পাশাপাশি রাজনীতিতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। আজীবন বামপন্থী এই মানুষটি কম্যুনিস্ট পার্টির ভাঙনে দ্বন্দ্বে  পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমৃত্যু দলের সঙ্গে তিনি সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন। দেবব্রত বিশ্বাস ছিলেন খোলামনের কৌতুকপ্রিয় মানুষ। নকশা এবং ব্যঙ্গচিত্র আঁকতেন খুব ভাল। প্রায়ই অটোগ্রাফ দেওয়ার সময় কিছু না কিছু এঁকে দিতেন। ‘কোমল গান্ধার’, ‘ছেঁড়া তার’, ‘ভুলি নাই’- এই তিনটি ছবিতে দেবব্রত বিশ্বাস অভিনয় করেছেন। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দুটি বই, ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত’ এবং ‘অন্তরঙ্গ চীন’। এই দুটি বই এবং গান থেকে প্রাপ্ত তাঁর সমস্ত রয়্যালটি তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে তুলে দেন।      

প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে নীরবে প্রতিবাদ করে যাওয়া এই স্বনামধন্য সঙ্গীতসাধক ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট ৬৯ বছর বয়সে মারা যান। তবে, যতদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের অস্তিত্ব থাকবে ততদিনই দেবব্রত বিশ্বাস, সাধারণ মানুষের প্রিয় জর্জ বিশ্বাস মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন