ইতিহাস

দেবেন্দ্র মোহন বসু

দেবেন্দ্র মোহন বসু (Debendra Mohan Bose) একজন ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী যিনি মহাজাগতিক রশ্মি, কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা এবং নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলেন। তিনি বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর ভাগ্নে। তিনিই প্রথম ফটোগ্রাফিক ইমালশন পদ্ধতিতে মেসনের এর ভর নির্ণয় করেছিলেন। তাঁর পদ্ধতি অনুরসণ করে মেসনের ভর নির্ণয়ের জন্য ১৯৫০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সিসিল ফ্রাঙ্ক পাওয়েল (Cecil Frank Powell)।

১৮৮৫ সালের ২৬ নভেম্বর দেবেন্দ্র মোহন বসুর জন্ম হয়। বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার জয়সিদ্ধি গ্রামে আদি বাড়ি ছিল দেবেন্দ্রমোহনদের। তাঁর বাবা মোহিনীমোহন বসু আমেরিকায় হোমিওপ্যাথি নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর জ্যাঠা আনন্দমোহন বসু অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় র‌্যাংলার (Wrangler)। মোহিনীমোহন এবং তাঁর দাদা আনন্দমোহন বিয়ে করেন খ্যাতনামা প্রশাসক ভগবান চন্দ্র বসুর দুই কন্যাকে। মোহিনীমোহনের সঙ্গে বিয়ে হয় সুবর্ণপ্রভার। তাঁদের দুই সন্তানের নাম দেবেন্দ্রমোহন এবং সুধাংশুমোহন। দু’জন ছোট থাকতেই মারা যান মোহিনীমোহন। সুবর্ণপ্রভা দুই ছেলেকে নিয়ে এসে উঠলেন ভাই জগদীশচন্দ্রের কাছে। ফলে মামাই হয়ে দাঁড়ালেন তাঁদের অভিভাবক।

ছোটবেলায় মামার বাড়িতে বহু বিখ্যাত মানুষের সংস্পর্শে আসেন তিনি তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ভগিনী নিবেদিতা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

শৈশবে দেবেন্দ্রমোহনের  প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল একটি ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ে। বালিকা বিদ্যালয় হলেও এতে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত  সহশিক্ষা চালু ছিল। এরপর তিনি আনন্দমোহন বসু প্রতিষ্ঠিত সিটি স্কুলে লেখাপড়া করেন এবং এখান থেকেই এন্ট্রান্স পাশ করেছেন। এন্ট্রান্স পাশ করে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার লক্ষ্যে ভর্তি হন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। কিছুদিন পর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে ছাত্রাবাস ছেড়ে বাড়ি ফিরে যান ; আর তাঁর শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ফিরে যাওয়া হয়নি। দেবেন্দ্রমোহন পুনরায় প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন পদার্থবিদ্যা আর ভূতত্ত্ব নিয়ে। যথাসময়ে প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি পাস করলেন। ১৯০৬ সালে এমএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হলেন; জগদীশচন্দ্র বসু তখন বায়োফিজিক্স ও প্ল্যান্ট ফিজিওলজি নিয়ে গবেষণা করছেন। দেবেন্দ্রমোহন যোগ দিলেন জগদীশচন্দ্রের রিসার্চ গ্রুপে শিক্ষানবিশ গবেষক হিসেবে। ১৯০৭ সালে দেবেন্দ্রমোহন ইংল্যান্ড গিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন। এখানে তিনি ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে স্যার জে জে থমসন ও চার্লস উইলসনের সাথে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। ১৯০৮ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ করেন তিনি। ১৯১০ সালে তিনি লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব সায়েন্সে ভর্তি হন। ১৯১২ সালে এখান থেকেই  ডিগ্রি লাভের পর তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন।

১৯১৩ সালে কলকাতার সিটি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ‍্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। দেবেন্দ্রমোহন নব-প্রতিষ্ঠিত সায়েন্স কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের ‘রাসবিহারী ঘোষ অধ‍্যাপক’ পদে যোগ দেন। বিজ্ঞান কলেজে যোগ দিয়ে দেবেন্দ্রমোহন উচ্চশিক্ষার জন্য ‘ঘোষ ভ্রমণ বৃত্তি’ পেয়ে ১৯১৪ সালে ইউরোপ যান। ভর্তি হলেন বার্লিনের হামবোল্ড ইউনিভার্সিটিতে। দু’বছর পড়াশোনা ও গবেষণা করলেন প্রফেসর এরিখ রিগনারের গবেষণাগারে। রিগনার দেবেন্দ্রমোহনকে কাজ দিলেন নতুন একটি ক্লাউড চেম্বার তৈরি করে আলফা ও বিটা কণিকার গতিপথ শনাক্ত করার। দেবেন্দ্রমোহন তৈরি করলেন ক্লাউড চেম্বার। হাইড্রোজেন গ্যাস দিয়ে ভর্তি করা হলো চেম্বার। এরপর চেম্বারে পাঠানো হলো আলফা-কণার স্রোত। এই আলফা-কণা হাইড্রোজেন থেকে ইলেকট্রনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। ঋণাত্বক চার্জের ইলেকট্রন হারিয়ে হাইড্রোজেন হয়ে পড়লো ধনাত্বক চার্জের প্রোটন। এই প্রোটনের গতিপথ শনাক্ত করতে সমর্থ হলেন দেবেন্দ্রমোহন। এখান থেকে এরকম কণার মধ্যে সংঘর্ষের ফলে যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয় তার একটা হিসেব পাওয়া গেল। এই কাজ দিয়েই পি-এইচ-ডি থিসিস লিখলেন দেবেন্দ্র মোহন। ততদিনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ইউরোপে। যুদ্ধের কারণে থিসিস জমা দিতে পারলেন না তিনি। পাঁচ বছর তাকে জার্মানিতে থাকতে হলো। প্রোটনের গতিপথ সনাক্তকরণের ওপর দেবেন্দ্রমোহন বসুর প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে – জার্মানির ফিজিক্যালিশে জেইটসক্রিফট (Physikalische Zeitschrift)-এ। ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে পিএইচডি সম্পন্ন করে ভারতে ফিরে আসেন দেবেন্দ্রমোহন। ফের যোগ দিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর আগের পদে, এই পদে তিনি ছিলেন ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পালিত প্রফেসর’ পদে যোগ দেন ও ১৯৩৮ সালে ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’-এ যোগ দেওয়া পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন।

১৯২৩ সালে দেবেন্দ্র মোহন বসু তাঁর গবেষক ছাত্র এস কে ঘোষকে সাথে নিয়ে ক্লাউড চেম্বারে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কাজ শুরু করলেন। হিলিয়াম গ্যাসের মধ্যে পোলোনিয়াম থেকে উৎসরিত আলফা কণার গতিপথ পর্যবেক্ষণ করেন এবং নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনের গতিপথের ছবি তোলেন। ছবিতে ধরা পড়ল যে নাইট্রোজেন নিউক্লিয়াস বিয়োজিত হয়েছে। বিখ্যাত নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁদের তোলা ছবি ও গবেষণাপত্র যা আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া ফেলে দেয়।

চৌম্বকত্বের গবেষণাতেও প্রচুর উল্লেখযোগ্য অবদান আছে দেবেন্দ্রমোহনের। গটিনগেন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হুন্ড (F. Hund) পরমাণুর চৌম্বক ভ্রামক (magnetic moment) হিসেব করার একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। দেবেন্দ্রমোহন দেখলেন হুন্ডের পদ্ধতি বিরল মৃত্তিকা গ্রুপের ত্রিযোজী ও চতুর্যোজী মৌলের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে কাজ করলেও আয়রন গ্রুপের কোন আয়নের ক্ষেত্রেই সঠিক ভাবে কাজ করে না। তিনি নেচার পত্রিকায় লিখে জানালেন এ কথা। নতুন একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন দেবেন্দ্রমোহন যা হুন্ডের পদ্ধতির চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর। ১৯২৭ সালে দেবেন্দ্রমোহনের এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত জার্মান সাময়িকীতে (Zeitschrift fur Physik)। জটিল যৌগের চৌম্বকধর্ম নিয়ে পরীক্ষা করার সময় (১৯২৯) স্টোনারের তত্ত্বে (E. C. Stoner) ত্রুটি দেখতে পেয়ে সংশোধন করেন তিনি। স্টোনারের সূত্র তার সংশোধনী সহ পরিণত হয় ‘বোস-স্টোনার’ তত্ত্বে।

১৯৩৮ সালের একটি সায়েন্স কনফারেন্সে গিয়ে জার্মান নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী ওয়ালথার বোথের (১৯৫৪ সালে বোথে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন) সাথে আলাপের পর ফটোগ্রাফিক প্লেটের ওপর কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাব বিষয়ক গবেষণার উৎসাহ জাগে দেবেন্দ্রমোহনের। সহকর্মী বিভা চৌধুরির সাথে গবেষণা শুরু করলেন। তখনো পার্টিক্যাল এক্সিলারেটর আবিষ্কৃত হয়নি। সাব-এটমিক কণার একমাত্র উৎস সূর্য। ওয়ালথার বোথে তাঁদের পরামর্শ দিলেন ফটোগ্রাফিক ইমালশনকে ক্লাউড চেম্বারে ডিটেক্টর হিসেবে ব্যবহার করে তার ওপর মহাজাগতিক রশ্মির গতিপথের ছাপ পড়ে কি না দেখতে। ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করলে তার ওপর স্থায়ী ছাপ আশা করা যায়। ১৯৩৯-১৯৪২ সালের মধ্যে দেবেন্দ্রমোহন ও বিভা চৌধুরি দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে গিয়ে ইলফোর্ড হাফ-টোন ফটোগ্রাফিক প্লেটের ওপর দিনের পর দিন সূর্যালোকের বিচ্ছুরণ ঘটান। প্লেটের ওপর লম্বা বক্রাকার আয়নিত গতিপথ দেখতে পান। তাঁরা ব্যাখ্যা করে দেখান যে এগুলো প্রোটনের ট্র্যাক বা আলফা কণিকার ট্র্যাক থেকে ভিন্ন। তবে নিশ্চয় এরা  সাব-এটমিক কণা ‘মেসোট্রন’ এর গতিপথ। তাঁদের ফলাফল প্রকাশিত হয় বিখ্যাত ‘নেচার’ পত্রিকায়। কিন্তু সেইমুহূর্তে গতিপথগুলোকে তাঁরা ঠিকমত বুঝতে পারছিলেন না। তাঁরা আরো পরীক্ষা করার জন্য ফটোগ্রাফিক প্লেটগুলোকে এক নাগাড়ে ২০২ দিন সূর্যালোকে রেখে দিলেন। কিন্তু উচ্চ-শক্তির প্রোটন কণার গতিপথ দেখলেন না। তাঁদের গবেষণা এতই চাঞ্চল্যকর ছিল যে ‘নেচার’ পত্রিকায় তা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। দেবেন্দ্রমোহন ও বিভা চৌধুরির গবেষণার প্রতি সবার এত আগ্রহের কারণ হল সাব অ্যাটমিক বা অব-পারমাণবিক কণা ‘মেসোট্রন’ বা ‘মেসন’ এর আবিষ্কারের প্রত্যাশা। জাপানী পদার্থবিজ্ঞানী হাইডেকি ইউকাওয়া ১৯৩৫ সালে (নোবেল পুরস্কার ১৯৪৯) তত্ত্বীয় ভাবে প্রমাণ করেন যে নিউক্লিয়ার বলের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু নতুন ধরনের কণা বিনিময় হয় – যে গুলোকে ইউকাওয়া নাম দিয়েছেন এক্সচেঞ্জ পার্টিক্যাল (বিনিময়-কণা)। এই কণাগুলির ভর হতে হবে ইলেকট্রনের ভরের চেয়ে সামান্য বেশি – কিন্তু প্রোটনের ভরের চেয়ে অনেক কম। ইউকাওয়া হিসেব করে দেখিয়েছেন যে এ ধরনের অব-পারমাণবিক কণার ভর হবে ইলেকট্রনের ভরের ২৭০ গুণ (প্রোটনের ভর ইলেকট্রনের ভরের ১৮৪০ গুণ)। এদের ভর ইলেকট্রনের ভর ও প্রোটনের ভরের মাঝামাঝি বলে এদের নাম দেয়া হয় ‘মেসোট্রন’ – গ্রিক ভাষায় যার অর্থ ‘মধ্যবর্তী’। ‘মেসোট্রন’ থেকে আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে এদের নাম হয় ‘মেসন’।

দেবেন্দ্র মোহন বসু ও বিভা চৌধুরি তাঁদের কণাগুলির ভর হিসেব করে দেখলেন ইলেকট্রনের ভরের ১৬০ গুণ। বুঝতে পারলেন কোথাও ভুল হচ্ছে। যে ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করছেন তা ‘হাফ-টোন’। কিন্তু যুদ্ধের বাজারে ভারতে বসে ‘ফুল-টোন’ প্লেট পাওয়া অসম্ভব। তবুও পরীক্ষণ পদ্ধতি যতটুকু সম্ভব নিখুঁত করে আবার পরীক্ষা করলেন। এবার কণাগুলোর ভর পাওয়া গেলো ইলেকট্রনের ভরের ১৮৬ গুণ। দেবেন্দ্রমোহন বুঝতে পারলেন আরো উন্নতমানের আরো স্পর্শকাতর ফটোগ্রাফিক প্লেট ছাড়া তাঁদের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন। আক্ষরিক অর্থেই অর্থের কারণে তারা কাঙ্খিত ফলাফল পেলেন না। ১৯৪৫ সালে বিভা চৌধুরি ইংল্যান্ডে চলে যান প্যাট্রিক ব্ল্যাকেটের সাথে কাজ করার জন্য। দেবেন্দ্রমোহন গবেষণা আর বেশিদূর চালিয়ে নিতে পারেন নি।

এদিকে ইংরেজ পদার্থবিদ সিসিল পাওয়েল একই পদ্ধতি অনুসরণ করে পরীক্ষা শুরু করলেন বলিভিয়ায় গিয়ে। কসমিক রশ্মি এখানে ইংল্যান্ডের চেয়ে প্রবল। পরীক্ষার ফলাফল হিসেব করে দেখলেন নতুন কণিকার ভর হয়েছে ইলেকট্রনের ভরের ২৭৩ গুণ। ইউকাওয়ার মেসনের ভরের সাথে প্রায় হুবহু মিলে গেছে পাওয়েলের ফলাফল। ১৯৫০ সালে এ কাজের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান।

জগদীশচন্দ্র প্রয়াত হওয়ার পর কে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের দায়িত্ব নেবেন তা নিয়ে কিছুটা  সংশয় তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে দেবেন্দ্র মোহন এই দায়িত্ব নেন। ১৯৩৮ সালে তিনি বসু বিজ্ঞান মন্দিরের পরিচালক নিযুক্ত হন। ১৯৬৭ পর্যন্ত তিনি বসু বিজ্ঞান মন্দির পরিচালনা করেন। এসময় দেবেন্দ্রমোহন নতুন নতুন বিভাগ খুলে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাপ্রদান ও গবেষণামূলক কাজের ব্যাপক প্রসার ঘটান। মাইক্রোবায়োলজি, রেডিও কেমিস্ট্রি ইত্যাদি নতুন বিভাগও চালু করেন। তিনি সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন এবং বেশ কয়েক বছর এর সভাপতি, সচিব ও কোষাধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ১৯৫৩ সালে লখনউতে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস অধিবেশনের সাধারণ সভাপতি ছিলেন । বিশ্বভারতীর নানা কাজে রবীন্দ্রনাথ নির্ভর করতেন দেবেন্দ্রনাথের উপর। দীর্ঘ দিন বিশ্বভারতীর অর্থসচিবের দায়িত্ব পালন করেন দেবেন্দ্রমোহন। বিশ্বভারতীর সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘দেশিকোত্তম’-এ ভূষিত করা হয় তাঁকে।

দেবেন্দ্র মোহন বসু ভারতে বিজ্ঞানের প্রসারে নিরলস কাজ করে গেছেন। ১৯৪৫ সালে নিউক্লিয়ার কেমিস্ট্রি বিশেষজ্ঞ হিসেবে এটমিক এনার্জি কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ পঁচিশ বছর মেঘনাদ সাহা প্রতিষ্ঠিত ‘সায়েন্স এন্ড কালচার’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন তিনি। তবে শুধু সম্পাদনাই নয়, নিজে বিভিন্ন সংখ্যার জন্য লিখেছেনও প্রচুর। বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখা সম্পর্কে তথ্য পরিবেশন থেকে শুরু করে বরেণ্য বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়েছে এর পাতায়। খুঁটিয়ে পড়লে ধরা পড়বে দেবেন্দ্রমোহনের প্রখর ইতিহাস চেতনা যা আজ বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিরল। তিনি ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি ছিলেন। সমরেন্দ্রনাথ সেন ও সুব্বারাপ্পার সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন ভারতবর্ষের বিজ্ঞানের ইতিহাস। ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব হিস্ট্রি অব সায়েন্স’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন দেবেন্দ্রমোহন।

স্বাধীন ভারতে বহু সংগঠন প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন তিনি। তিনি ভূষিত হন বহু সম্মানে। কিন্তু প্রচারের আলো থেকে সবসময় নিজেকে দূরে রাখতেন দেবেন্দ্রমোহন। ১৯৬৭ সালে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অধিকর্তার পদ থেকে অবসর নিয়েও থেকে যান এই প্রতিষ্ঠানের অর্থ উপদেষ্টার পদে।  ভারতবর্ষে বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ দেবেন্দ্র মোহন বসুর ১৯৭৫ সালের ২ জুন মৃত্যু হয়।

  • telegram sobbanglay

তথ্যসূত্র


  1. https://bigyan.org.in
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.somewhereinblog.net/
  4. Indian Journal of History of Science, 50.3 (2015) 438-455

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন