ধর্ম

দীর্ঘতমা

দীর্ঘতমা

মহাভারতের আদিপর্বে চতুরধিকশততম অর্থাৎ ১০৪তম অধ্যায়ে ঋষি দীর্ঘতমা (dirghatama) -র কথা বলা আছে। মহারাজ শান্তনু ও রাজ্ঞী সত্যবতীর দুই পুত্র ছিলেন চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। অতি অল্প বয়সে চিত্রাঙ্গদের মৃত্যু হয়। কনিষ্ঠ বিচিত্রবীর্যেরও অত্যধিক নারী সংসর্গের কারণে যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত হয়ে অপুত্রক অবস্থায় মৃত্যু হয়। কুরুবংশ রক্ষার চিন্তায় তখন উদ্বেল হয়ে ওঠেন রানী সত্যবতী।

মন্ত্রীবর্গের পরামর্শে সত্যবতী সৎপুত্র ভীষ্মের শরণাপন্ন হলেন। ভীষ্মকে তিনি অনুরোধ করেন দুই ভ্রাতৃবধূ অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করতে। স্বামীর অবর্তমানে বংশের অন্য যোগ্য পুত্রের দ্বারা সন্তান উৎপাদন সে যুগে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু ভীষ্ম রাজী হলেন না। তিনি আজীবন ব্রহ্মচর্য পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মাতৃ-আজ্ঞাতেও সেই প্রতিজ্ঞাচ্যুত হতে রাজি হননি তিনি।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

হতাশ হলেন সত্যবতী…এখন উপায়? ভীষ্ম তখন বিধান দিলেন, কোনো বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের দ্বারা রাজবধূদ্বয়ের গর্ভে ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদন করা যেতে পারে। বেদে উল্লেখিত আছে, ব্রাহ্মণের দ্বারা ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপন্ন হলে সেই সন্তান পাণিগ্রহীতার পুত্র হয়। ভগবান পরশুরাম যখন পৃথিবী ক্ষত্রিয়শূন্য করেছিলেন, তখন এই সনাতন প্রথা গ্রহণ করে ক্ষত্রিয়পত্নীরা বংশ রক্ষা করেছিলেন।

নিজের বক্তব্যকে সমর্থন করতে ভীষ্ম উদাহরণ দিয়েছিলেন ঋষি দীর্ঘতমার কাহিনীর। প্রাচীনকালে উতথ্য নামে এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী ছিলেন দেবী মমতা। একদিন ঋষি উতথ্যের কনিষ্ঠ ভ্রাতা দেবগুরু বৃহস্পতি ভ্রাতৃবধূ মমতার রূপলাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যত হন। নিজের দেবরকে কামাতুর দেখে ভীত মমতা বলেন, “আমি আপনার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কর্তৃক পূর্বেই অন্তঃসত্ত্বা হয়েছি। অতএব আপনার রমণেচ্ছা সংবরণ করুন। আমার গর্ভে বালক উতথ্যকুমার ষড়ঙ্গ বেদ অধ্যয়ন করছেন। আপনিও অমোঘরেতাঃ (যার বীর্য কখনো নিষ্ফল হয় না), এক গর্ভে দুই সন্তানের অবস্থান কার্যত অসম্ভব। দয়া করে এই দুষ্কর্ম হতে নিবৃত্ত হউন।”

কিন্তু কামজ্বালায় জর্জরিত দেবগুরু ভ্রাতৃবধূর মিনতিতে কর্ণপাত না করেই মমতার উপর বলপ্রয়োগ করতে শুরু করেন। তখন গর্ভস্থ ঋষিকুমার বৃহস্পতিকে নিবারণের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন, “আমি পূর্বেই এই গর্ভে স্থান নিয়েছি। এখন আপনার অমোঘ বীর্য দ্বারা আমাকে পীড়িত করা আপনার শোভা পায় না। হে ভগবন, নিজের ইন্দ্রিয় সংবরণ করুন!”

বালকের অনুরোধও বিফলে গেল। কামমদে মত্ত বৃহস্পতি সমস্ত বিবেকবোধ বিসর্জন দিয়ে মাতৃসম ভ্রাতৃবধূকে ধর্ষণ করলেন। গর্ভস্থ মুনিকুমার এই অশালীন কার্যে অত্যন্ত কুপিত হয়ে নিজের দুটি পা দিয়ে বীর্যের প্রবেশপথ রুদ্ধ করে দিলেন। প্রবেশ করতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল দেবগুরু বৃহস্পতির বীর্য।

নিজের অমোঘ বীর্যকে ভূপতিত হতে দেখে রাগে জ্বলে উঠলেন দেবগুরু। ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজ ভ্রাতুষ্পুত্রকে অভিশাপ দিলেন তিনি, “যেহেতু সর্বজীবের একান্ত ঈপ্সিত কর্মে তুমি আমাকে বাধাপ্রদান করলে, অতএব আমার অভিশাপে তুমি জন্মান্ধ হবে।” দেবগুরুর অভিশাপে অন্ধ হয়েই মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হন উতথ্য-নন্দন দীর্ঘতমা।

ধীরে ধীরে বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ দীর্ঘতমা সর্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়ে উঠলেন এবং যৌবনপ্রাপ্ত হয়ে প্রদ্বেষী নামে এক রূপবতী ব্রাহ্মণকন্যাকে বিবাহ করলেন। যথাসময়ে মুনিপত্নী প্রদ্বেষী মহর্ষি গৌতমকে জন্মদান করেন ও উতথ্যের বংশরক্ষা হয়৷ এদিকে ঋষি দীর্ঘতমা কামধেনু সুরভির কাছে শিক্ষা পেয়ে “গোধর্ম’’ (পশুর মতো যত্রতত্র কোনো বিচার ছাড়াই রমণ) ও সেইরূপ আচরণে প্রবৃত্ত হলে বিচলিত হলেন আশ্রমের অন্যান্য ঋষিরা। তাঁদের মতে, নিজধর্ম পরিত্যাগী ব্যক্তি আশ্রমবাসী হওয়ার অযোগ্য। অতএব এই ঘৃণ্য ব্যক্তি হতে দূরে থাকা উচিত। এই মন্ত্রণা করে ঋষিগণ পূর্বের ন্যায় দীর্ঘতমাকে সম্মান প্রদর্শনে বিরত হলেন ও তাঁর সংস্রব ত্যাগ করলেন।

রুষ্ট হলেন বিদূষী প্রদ্বেষী। ধর্মভ্রষ্ট স্বামীর প্রতি তিনিও যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনে বিরত হলেন। পতিব্রতা স্ত্রীর এই আচরণে বিস্মিত হলেন ঋষি। এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে প্রদ্বেষী বলেন যে স্বামী জন্মান্ধ বলে এতদিন তিনিই স্বামী-সন্তানের সমস্ত দায়ভার গ্রহণ করেছেন। কিন্তু অন্যান্য ঋষিদের কটূক্তি সহ্য করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। সমস্ত স্বামীর অবশ্যকর্তব্য নিজের স্ত্রী-পুত্রের দায়ভার বহন করা। প্রতিপালনের ক্ষমতা না থাকলে পরিবার পরিত্যাগ করা উচিত।

স্ত্রীর এহেন অবাধ্যতায় ঋষি ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণের অভিশাপ দিলেন। কিন্তু অবিচলিত দেবী প্রদ্বেষী সগর্বে বললেন, কিছুতেই তিনি তাঁর এই পরিবার প্রতিপালনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না এবং ঋষির যা ইচ্ছা তিনি তাই করতে পারেন।

পত্নীর সগর্ব বচনে অত্যন্ত অপমানিত বোধ করলেন ঋষি দীর্ঘতমা। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হল সেই অমোঘ অভিশাপবাণী, “আমি আজ থেকে এই নিয়ম প্রচলিত করলাম যে, স্ত্রীজাতিকে যাবজ্জীবন একমাত্র পতির অধীন হয়ে কালযাপন করতে হবে। পতি জীবিত থাকলে বা তাঁর জীবনাবসান ঘটলেও, নারী যদি অন্য পুরুষে আসক্ত হন, তাহলে তিনি অবশ্যই পতিত হবেন, সন্দেহ নাই। আর পতিবিহীনা নারীগণের সর্ব্বপ্রকার সমৃদ্ধি থাকলেও তা ভোগ করতে পারবে না; বিষয়ভোগ করলে নারী কীর্ত্তিহীন হবেন।”

বিনা দোষে অভিশপ্তা হয়ে ক্রুদ্ধ হন দেবী প্রদ্বেষী। তাঁর আদেশে পুত্র গৌতম ও তাঁর অন্যান্য ভ্রাতারা ঋষি দীর্ঘতমাকে ভেলার সঙ্গে বেঁধে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেন। ভাসতে ভাসতে সেই ভেলা পৌঁছায় রাক্ষসরাজ্যে। রাক্ষসরাজ বলি গঙ্গায় স্নান করতে এসে দর্শন পান ঋষি দীর্ঘতমার এবং তাঁর জীবনকাহিনী শুনে ঋষিকে প্রাসাদে নিয়ে আসেন রাজা।

মহারাজ বলি ও মহারাণী সুদেষ্ণা ছিলেন নিঃসন্তান। তাই মহারাজ দীর্ঘতমাকে অনুরোধ করেন রাণীর গর্ভে সন্তান উৎপাদন করার জন্য এবং ঋষি এই প্রস্তাবে সানন্দে সম্মতি দেন। এদিকে অন্ধ ও বৃদ্ধ এক ঋষির সঙ্গে মিলনে ঘোরতর অনিচ্ছুক রাণী সুদেষ্ণা স্বামী-আজ্ঞার বিরোধিতা করতে না পেরে নিজে না গিয়ে গোপনে ঋষির শয্যায় পাঠিয়ে দিলেন নিজের এক দাসীকে আর তার ফলে সেই দাসীর গর্ভে জন্ম হল কাক্ষীবৎ আদি একাদশ কুমারের।

এই সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত ক্ষুণ্ন মহারাজ বলি রাণী সুদেষ্ণাকে ভর্ৎসনা করে পুনরায় পাঠালেন ঋষির কাছে। তারপরেই দীর্ঘতমা ও সুদেষ্ণার মিলনে জন্ম নিল অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুহ্ম নামে পাঁচ পুত্র। পরবর্তীকালে এই কুমারেরাই রাক্ষসবংশ রক্ষা করেছিল।

এই সমস্ত ঘটনা জানার পরে কুরুবংশ রক্ষার জন্য রাণী সত্যবতী আহ্বান করেন নিজ কানীন পুত্র মহর্ষি দ্বৈপায়ন বেদব্যাসকে যাঁর ঔরসে জন্ম নিল ধৃতরাষ্ট্র ও‌ পাণ্ডু, রক্ষা পেল কৌরববংশ।

তথ্যসূত্র


  1. কালীপ্রসন্ন সিংহ বিরচিত “মহাভারত”, আদিপর্ব, অধ্যায় ১০৪, পৃষ্ঠা ২৫১-২৬৪
  2. http://onushilon.org/
  3. https://4thpillars.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মনোরথ দ্বিতীয়া ব্রতকথা নিয়ে জানতে


মনোরথ দ্বিতীয়া

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন