ধর্ম

ঈদ আল গাদীর

ঈদ আল গাদীর

আপামর মুসলমান সম্প্রদায় ঈদ-এর আগমনের অপেক্ষায় থাকে সারা বছর। তবে সারা বছর জুড়েই পৃথক পৃথক ঈদের উদ্‌যাপন হয়ে থাকে ইসলামি দিনপঞ্জি অনুযায়ী যার মধ্যে ঈদ আল গাদীর (Eid al-Ghadir) এক অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী তাৎপর্য নিয়ে পালিত হয় সমগ্র বিশ্বের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে। ঈদ আল গাদীর হল শিয়া মুসলমানদের এক বৃহৎ উৎসব। এই পবিত্র দিনেই শিয়ারা বিশ্বাস করে ইসলাম ধর্মের পূর্ণতা দান করেছিলেন হজরত মহম্মদ (সাঃ) এবং গাদীর খুমের সেই বিখ্যাত ভাষণের মাধ্যমে তাঁর পরবর্তী মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রধান হিসেবে আলী ইবনে আবী তালিবকে নির্বাচন করেছিলেন। ঠিক এই কারণেই সকল মুসলমানদের কাছে ঈদ আল গাদীর পবিত্রতম উৎসব।  

ইসলামি দিনপঞ্জি অনুযায়ী দশম হিজরি সনের জ্বিলহজ্জ মাসের ১৮ তারিখে শিয়া মুসলমানদের মধ্যে পালিত হয়ে থাকে এই উৎসব। অন্যান্য ঈদের মতো এই উৎসবের সঙ্গে চাঁদের বিশেষ সম্পর্ক নেই। এই উৎসবকে ইসলামি হাদিস অনুসারে অনেকক্ষেত্রে ঈদ্‌-এ-বুজুরগ্‌-এ-ইলাহী, ঈদ্‌-আহল্‌-বায়েত-মহম্মদ কিংবা আশরাফ্‌-আল-আয়াদ্‌ বলেও অভিহিত করা হয়ে থাকে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

ঈদ আল গাদীর পালনের পিছনে রয়েছে ইসলামি ইতিহাসের বিখ্যাত গাদীর খুমের ঘটনা। ৬৩২ সালে হজরত মহম্মদ (সাঃ) শেষবারের মতো যখন বিদায় হজ সেরে ফিরে আসছিলেন, সেসময় খুম নামে এক পুকুরের পাশে তিনি তিনি এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন যা মহম্মদের মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ বক্তৃতা ছিল। মক্কা আর মদিনার মধ্যবর্তী অংশে এই পুকুর অত্যধিক লবণাক্ত হওয়ায় একে তঞ্চক পুকুর বলা হতো কারণ এর জল পানের অযোগ্য ছিল আর কেউ যদি ভুল করেও এটি পান করত, তাঁর মৃত্যু ছিল অবধারিত। আরবি ভাষায় এই তঞ্চক পুকুরকে ‘খুম’ বলা হয়। মদিনা, ইরাক এবং মিশর এই তিনটি প্রদেশকেই স্পর্শ করে রয়েছে এই বিরাট খুম যা বর্তমানে সৌদি আরবের আল-জুহ্‌ফাহ্‌ শহরে অবস্থিত। হিজরতের দশ বছর পরে এই বিরাট প্রত্যাবর্তনের মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় সত্তর হাজারেরও বেশি মহম্মদের অনুগামী যাদের ফার্সি ভাষায় ‘সাহাবি’ বলা হয়। এই সাহাবিদের মধ্যে ছিলেন মহম্মদের খুড়তুতো ভাই ও জামাই আলী ইবনে আবী তালিব। সেই সময় হজরত মহম্মদ (সাঃ) সমস্ত সাহাবিদের একত্রিত করে একটি দীর্ঘ বক্তৃতার মাধ্যমে আলী ইবনে আবী তালিবকে তাঁর পরবর্তী ‘মওলা’ (ইসলাম ধর্মের প্রধান) হিসেবে নিজের পদে অধিষ্ঠিত করেন যাতে হজরত মহম্মদের (সাঃ) মৃত্যুর পর ইসলামের প্রধান হিসেবে আলী তালিব ধর্মরক্ষা করতে পারেন। এই বক্তৃতার সময় হজরত মহম্মদ (সাঃ) এক অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, ‘মান কুন্তু মাওলা ফাহাজা আলীউন মাওলা’। আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদ করলে যার অর্থ দাঁড়ায় – ‘আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা’ এবং এরই সঙ্গে হজরত মহম্মদ (সাঃ) বলেছিলেন যে আলীর বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষা কোরো আর আলীর শ্ত্রুদেরকে শত্রু বলেই চিহ্নিত কোরো। মহম্মদের বক্তব্যে ‘মওলা’ কথার অর্থ দুই রকম হয়ে থাকে, কখনো বন্ধু বা মিত্র আবার কখনো প্রভু।

শিয়া মুসলমানরা মনে করেন মহম্মদ আসলে বলতে চেয়েছিলেন ‘আমি যার প্রভু, আলীও তাঁর প্রভু’। অর্থাৎ মহম্মদ এই কথার মধ্য দিয়ে তাঁর অবর্তমানে আলী ইবনে আবী তালিবকে মুসলমানদের প্রধান তথা মওলা হিসেবে নির্বাচিত করে যান। ঠিক এই ঘটনার পরেই শিয়া মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্র কুরানের শেষ আয়াতটি নাজিল হয় অর্থাৎ ঘোষিত হয়। এই সমগ্র ঘটনাটিকে নিয়ে সুন্নিরা আবার ভিন্নমত পোষণ করেন। শিয়ারা মনে করেন মহম্মদ দৈবী ক্ষমতাবলে আগে থেকেই জানতে পেরেছিলেন আলী তালিবকেই পরবর্তী প্রধান করা উচিত এবং সেই মতো মহম্মদ সেই ভাষণ দেন। আরবি কবি হাসান-ইবন-থাবিত আলী তালিবের এই অভিষেককে কেন্দ্র করে একটি কবিতাও রচনা করেছিলেন। হজরত মহম্মদের (সাঃ) নির্দেশ অনুযায়ী সকল মুসলমান সেই থেকে আলী তালিবকেই ‘আমির-আল-মুমিনিন’ অর্থাৎ বিশ্বস্তের নির্দেশক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে সুন্নিরা মনে করে মহম্মদের বক্তৃতার মওলা শব্দটি আসলে প্রভু নয় বন্ধুকে বোঝায় আর একইসঙ্গে তাঁরা আলীর এই অভিষেকের সঙ্গে গাদীর খুমের ঘটনার কোনো সংযোগ মানতে চান না।  

ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে এই ঘটনার সত্যতা আজও প্রমাণিত হয়নি। শিয়া ঐতিহাসিকরা এই ঘটনার সপক্ষে অনেক বক্তব্য রাখলেও অন্যরা তা মানতে চান না। ঐতিহাসিক আল-তাবারি তাঁর লেখা দুই খণ্ডের গাদীর খুমের ইতিহাস বিষয়ক বইতে জানিয়েছেন আলীকে যে সময় পরবর্তী প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন মহম্মদ তথ্য প্রমাণ অনুযায়ী আলী সেসময় ছিলেন ইয়েমেনে। অনেক সুন্নি ঐতিহাসিক মনে করেন যে সেই সময় আলী তালেবের বয়স ছিল মাত্র পঁচিশ বছর ফলে এত কম বয়সের এক তরুণকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান সম্প্রদায়ের সামাজিক কাঠামোয় কখনোই নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হত না। তাই আলীর এই নেতৃত্বে আসীন হওয়ার কাহিনিটি ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত বিতর্কিত। এমনকি ঐতিহাসিক কালক্রম অনুসারে দেখা গেছে ৬৩২ সালে হজরতের মৃত্যুর পরে পরপর তিনজন খলিফা হন আবু বকর, উমর ইবন আল-খাতাব এবং ওথমান-ইবন-আফান, এখানে আলী তালিবের নাম কোথাও পাওয়া যায় না। তবে ইসলামের বিভিন্ন প্রামাণ্য হাদিস গ্রন্থে এই কাহিনির বর্ণনা আছে বলে সকল মুসলমান সম্প্রদায় একে সত্য বলেই বিশ্বাস করেন।  

সমস্ত শিয়া মুসলমানেরা প্রত্যেক জ্বিলহজ্জ মাসের ১৮ তারিখে গাদীর খুমের ঘটনার স্মরণে পবিত্র ঈদ আল গাদীর পালন করে থাকে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে। এ সময় তাঁরা উপবাস করেন, গোসল অর্থাৎ স্নান-সংস্কারের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ হন এবং সবশেষে ইমাম আল-মেহেদীর স্মৃতিতে ‘দুয়া-নুদ্‌বা’ পাঠ করেন। ‘দুয়া’ কথার অর্থ হল প্রার্থনা আর ‘নুদ্‌বা’ মানে কান্না। ইমামের অর্চনাকালে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে মরমে কাঁদেন সকল শিয়া মুসলমানেরা। এছাড়াও বিশ্বস্ত শিয়াদের মধ্যে খাদ্য বিতরণের চলও রয়েছে এই বিশেষ দিনকে ঘিরে। ইরাকের শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানেরা এই দিনে কারবালা প্রান্তরের উদ্দেশে তীর্থযাত্রা করে থাকেন। আজারবাইজান, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, লেবানন, বাহরিন, সিরিয়ায় এইদিনটি বিশেষ ছুটির দিন হিসেবে গৃহীত হয়েছে। আমেরিকা মহাদেশ কিংবা ইউরোপের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা শিয়া মুসলমানগণ এই বিশেষ দিনটি পালন করে থাকেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মনোরথ দ্বিতীয়া ব্রতকথা নিয়ে জানতে


মনোরথ দ্বিতীয়া

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন