বিবিধ

মধু

মধু হল এক ধরণের গাঢ় মিষ্টি খাদ্য যা সাধারণত মৌমাছি ও কিছু পতঙ্গ দ্বারা তৈরি হয় ও মৌচাকে সঞ্চিত থাকে। মধু অত্যন্ত উপকারী ও ভেষজ গুণ সম্পন্ন। প্রকৃত মধু কখনোই খারাপ হয় না। মধুতে অতিরিক্ত শর্করার উপস্থিতির জন্যে কোন জীবাণু বেশিক্ষণ বাঁচতে পারে না আর জলীয় উপাদান কম থাকায় অন্যান্য শর্করা জাতীয় তরলের মত গেঁজে (Fermentation)যায় না।

মধু মোটামুটি তিনরকম গুনমানের হয় :

) সম্পূর্ণ বদ্ধ(সিল্ড বা ক্যাপড) বা পরিপক্ক মধু - মৌমাছি মধু মজুত করে সারা রাত পাখার বাতাস করে (সেকেন্ডে ২০০বার), মধুতে মজুত অতিরিক্ত জলীয় অংশ বাতিল করে মোম দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়। যাতে বাইরের নোংরা ও জলীয় উপাদান মধুতে না মিশে যেতে পারে। একেই পরিপক্ক মধু বলে। এই মধুর আলাদা প্রক্রিয়াকরণের দরকার হয় না। এই মধুর পুষ্টিগুণ সব চাইতে বেশী। এটাই প্রকৃত মধু বা প্রকৃত 'র' মধু।

২) খোলা (আনসিল্ড) বা অপরিপক্ক মধু - এই মধুতে জলীয় উপাদান প্রচুর পরিমানে থাকে।  খুব তাড়াতাড়ি ব্যবহার না করলে মধু গেঁজে যেতে পারে। তাই এই মধু প্রসেস করেই ব্যবহার করতে হয়। এতে পুষ্টিগুণ কম থাকে। প্রসেস করলে 'র' মধু হিসেবে গণ্য হয় না।

৩) আংশিক বদ্ধ (সেমি সিল্ড) মধু - এই মধু সম্পূর্ণ সিল করা হয়নি। এই মধু 'র' মধু হিসেবে বেশি দিন ব্যবহার করা যায় না। প্রক্রিয়াকরণ করেই ব্যবহার করতে হয়। পুষ্টিগুণ কম।

বাজারের মধু বেশির ভাগ সময়ই আনসিল্ড মধু প্রক্রিয়া করে তৈরী করা হয়। প্রকৃত মধু পেতে হলে স্থানীয় মৌমাছি পালক বা বী-কিপারের থেকে সিল্ড মধুর খোঁজ করতে হবে।

এই দুনিয়ায় ২০,০০০ প্রজাতির মৌমাছি বর্তমান ,যার ভেতরে মাত্র ৪ ধরনের মৌমাছি  প্রায় ৩০০ রকমের মধু সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারে। প্রতিটি মধু স্বাদ গন্ধে আর রঙে পৃথক। এটা নির্ভর করে দেশ, অঞ্চল, প্রক্রিয়াকরণ, পরিস্রাবণ ইত্যাদির উপরে। যদিও বাজারে আমরা  সাধারণত যে মধু বোতল-বন্দী অবস্থায় পাই তার অধিকাংশই একাধিক মধুর মিশ্রণ।নির্দিষ্ট পরিমান তাপ ও নানা যন্ত্রের মাধ্যমে নির্গত মধু তার পুষ্টিগূণও অনেক্ষানি হারিয়ে ফেলে।

আগেই বলা হয়েছে সারা দুনিয়ায় মধুর তিনশো'র বেশি রকমফের পাওয়া যায়। এই মধুগুলোকে নানা ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে । বৈচিত্র্য অনুসারে মধুর চোদ্দ রকম প্রকৃতি হয়। সেগুলি হল-

১)  ব্লসম হানি (Blossom Honey)

২) হানিডিউ হানি (Honeydew Honey )

৩) মোনো ফ্লোরাল (Mono floral)

৪) পলি ফ্লোরাল  (Poly-floral)

৫) কম্ব (Comb)

৬) চাক ভাঙ্গা মধু (Cut Comb Honey)

৭) তরল মধু (Liquid Honey)

৮) পাস্তুরাইজড মধু (Pasteurised honey)

৯)  সেট হানি (Set Honey)

১০)  ক্রিস্টালাইজড মধু (Crystallised Honey)

১১ ) হুইপ্ড মধু (Whipped Honey)

১২) কাঁচা মধু (Raw Honey)

১৩) আলট্রা ফিল্টারড মধু  (Ultra filtered Honey)

১৪) সার্টিফায়েড অরগ্যানিক মধু (Certified Organic Honey)

মধু প্রাকৃতিক ফসল। এই দেশে নানা রাজ্যের নানা রকম ফুলের থেকে মধু হয়। মধু নিয়মিত ও নানা রকমের খাওয়া দরকার, তবে যেকোন একটা মধু দিয়ে শুরু করা যেতে পারে কেননা সব মধুরই স্বাদ, গন্ধ ও বর্ণ আলাদা। মধু খাওয়ার কিছু সাধারণ নিয়ম আছে, যা মানলে উপকার বেশি পাওয়া যায়, যেমন -

  • দিনের যেকোন সময় মধু খাওয়া যায়, তবে মধু নিয়মিত খেতে হবে।
  • সম্পূর্ণ ভরা পেটে মধু না খাওয়াই ভালো, সেক্ষেত্রে খাওয়ার এক ঘন্টা পর খেতে হবে।
  •  বেশি গরম কিছুতে মধু মেশানো উচিত না।
  • মধু চামচে না খেলেই ভালো,  সব চাইতে ভালো হাতে নিয়ে চেটে খাওয়া।
  • দিনে দুবার করে, সকালে বাসিমুখে ও রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে খাওয়া যেতে পারে।
  • মধু খাওয়ার পাশাপাশি বেশি জল ও ফাইবার যুক্ত খাবার খাওয়া দরকার।

মৌমাছির থেকে শুধু মধু পাওয়া যায় না, মধুর সাথে সাথে ফুলের পরাগ,  মৌ আঠা (প্রোপোলিস), মোম, রয়্যাল জেলী ইত্যাদিও থাকে।প্রকৃত মধুর ১ গ্রামে কম করে ২৫০০০ পরাগরেণু থাকে। এই পরাগ যেকোন ফুলের হতে পারে আর তার মধ্যে যে ফুলের পরাগ শতকরা ৫৫ ভাগের বেশি থাকে সাধারণত সেই ফুলের নামে মধুর নাম করণ করা হয়, আর সেই অনুযায়ী তার পুষ্টিগুণও নির্ভর করে। যদি কোন একটি ফুলের পরাগ ৫৫% না থাকে তাহলে তাকে মাল্টি-ফ্লোরাল বা বহুপুষ্প মধু বলে। সব মধুরই উপকারিতা কম বেশি এক তবে বিশেষ বিশেষ মধুর বিশেষ কার্যকারিতাও থাকে যা এখানে তুলে ধরা হল -

  • বাবুল বা বাবলা (Acacia) মধু : রক্তপাত বন্ধ, ব্রঙ্কাইটিস প্রতিরোধ, পরিপাক তন্ত্রের উন্নতি, ছত্রাক সংক্রমণ প্রতিরোধ।
  • আজোয়ান (Ajowan) মধু : হাঁপানি প্রতিরোধে, নাক বন্ধ, মানসিক চাপ কমাতে, পরিপাক তন্ত্রের উন্নতি।
  • বেরি (Berry)মধু : উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, শর্ট টেম্পার সিন্ড্রোম, মানসিক উদ্বেগ, রক্তাল্পতা, অত্যধিক ঘাম, ক্লান্তি, ঘুমের স্বল্পতা, স্থূলতা, অ্যান্টি এজিং।
  • জামুন (Jamun) মধু : ডায়াবেটিস, গলার ব্যাধি, যকৃতের ব্যাধি, পোকার কামড়, মাড়ির রোগ, অ্যান্টি এজিং।
  • ভারতীয় রোজউড (Rosewood) মধু : অতিরিক্ত ঘাম, ক্লান্তি, দুর্বলতা, ফ্যাকাশে ত্বক, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, শ্বাস কষ্ট, মাথা ঘোরা বা ব্যাথা, ঠান্ডা হাত-পা,  ফোঁড়া বা কাটার ধীর নিরাময়, অ্যাসিডিটি।
  • লিচু (Litchi) মধু : হৃদযন্ত্রের সমস্যা, অ্যামনেসিয়া, ব্রণ, ইমিউন সিস্টেম, পোড়া এবং কাটা।
  • সূর্যমুখী (Sun flower) মধু : পেটের সমস্যা হ্রাস, ক্ষত নিরাময়, ঠান্ডা ও ফ্লু,  চুল শক্তিশালী ও বৃদ্ধি, কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়।
  • সরিষা (Mustard)মধু : ক্যান্সার কোষ, ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে।

মধুর প্রচুর পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা থাকলেও আমাদের দেশের মানুষ সারা বছরে মাথা পিছু ১০ গ্রাম মধুও পান করে না - তাই মধু ব্যাবহার নিয়ে নিয়মিত প্রচার ও মধু চাষে উৎসাহ দান প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র


  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Honey
  2. https://bn.wikipedia.org/wiki/ honey
  3. মধু বিশেষজ্ঞ থেকে প্রাপ্ত তথ্য।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!