খেলা

টোকিও ২০২০ অলিম্পিক মেডেল তৈরি হল কীভাবে

টোকিও অলিম্পিক ২০২০ সালের পদক প্রাপ্তির নিরিখে কোন দেশ এগিয়ে আর কোন দেশ পিছিয়ে সে খবর আমরা সবাই রাখছি। রাখছি কোন আ্যথলিট অসামান্য দক্ষতায় ছিনিয়ে নিল সোনা আর কে অকল্পনীয় লড়েও শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জ হারালো। হার জিতের এই গল্পের মাঝে চুপটি করে লুকিয়ে থাকা আসল গল্পটা কি জানেন? কীভাবে তৈরি হল এবারের অলিম্পিক মেডেল (how Tokyo Olympic medals are made)? 

এবারের টোকিও অলিম্পিকের প্রতিটা মেডেলে যেটা আছে সেটা প্রতিটা সাধারণ জাপানীর এক অসামান্য অভাবনীয় অবদান। এবারের অলিম্পিকের সোনা রূপো ও ব্রোঞ্জ মিলিয়ে পাঁচ হাজার মেডেলের প্রতিটা তৈরি হয়েছে জাপানীদের ফেলে দেওয়া, ব্যবহার না করা, খারাপ হয়ে যাওয়া মোবাইল, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, ট্যাব, ক্যামেরা, প্রিন্টার সহ ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেট থেকে।

অলিম্পিকের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই জাপানের অলিম্পিক কমিটি ‘টোকিও মেডেল প্রজেক্ট ২০২০’ নামে একটি প্রকল্প ঘোষণা করে। খেয়াল করবেন অলিম্পিক নয়, অলিম্পিকে পদক পাওয়াও নয়, অলিম্পিকের পদক তৈরিটাকেই পাখির চোখ করে নিল জাপান। সোনার মেডেল সোনায় হবে রূপোর মেডেল রূপোয় এ নিয়ে আবার ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রজেক্ট করে আদিখ্যেতা দেখানোর কি দরকার ভাবছেন তো! ভুলে যাচ্ছেন দেশটার নাম জাপান, এরা ভাঙা মাটির পাত্রকে সোনা দিয়ে জুড়তে পারলে, হিরোশিমায় পরমাণু বোমা পড়ার ঠিক পরদিন ট্রেন চালু করে দিতে পারলে, পৃথিবীকে প্রথম বুলেট ট্রেন উপহার দিতে পারলে মেডেলটাও সোনা রূপোয় বানাতে পারতো। কিন্তু বানালো না। ইচ্ছে করেই বানালো না।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


আরে এই দেশটাই পৃথিবীকে ইলেকট্রনিক্সের অ-আ-ক-খ শিখিয়েছে। ক্যানন, নিকন,সনি, ইয়ামাহা, ক্যাসিও  জন্ম নিয়েছে এ দেশের মাটিতেই। জাপান ঠিক করল তারা অলিম্পিকের মেডেলটাও বানাবে ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেট দিয়ে। যেমন ভাবা তেমন কাজ- জাপানীদের আবার দেরি করা বিষয়টা ঠিক রক্তে নেই। বুলেট ট্রেন স্টেশনে ঢুকতে ২০ সেকেন্ড দেরি করলে পরের দিন জাপানের খবরের কাগজের প্রথম পাতায় রেল কর্তৃপক্ষ ক্ষমা চেয়ে নেয়। সুতরাং জাপান নেমে পড়ল কাজে। জাপানের অলিম্পিক কমিটি ‘টোকিও মেডেল প্রজেক্ট ২০২০’ নামে একটি প্রকল্প ঘোষণা করল ২০১৭ সালের এপ্রিলে যেখানে সমস্ত দেশবাসীর কাছে আবেদন করা হল তাঁরা যেন তাঁদের খারাপ হয়ে যাওয়া, বাতিল করে দেওয়া বা অব্যবহৃত ল্যাপটপ, মোবাইল, স্মার্ট ওয়াচ, ট্যাব, ক্যামেরা কমিটির কাছে জমা দেয়। জমা দেওয়ার সময়সীমা দেওয়া হল মার্চ ২০১৯।

জমা পড়ল অগুনতি মোবাইল। সাথে শয়ে শয়ে ল্যাপটপ, ট্যাব। জাপানের ১৬২১টি পুরসভার নব্বই শতাংশ বাসিন্দাই এই বিশাল কর্মযজ্ঞে যোগদান করল। এরপর জাপানের ‘আ্যক্ট অন প্রমোশন অফ রিসাইক্লিং অফ স্মল ওয়েস্ট ইলেকট্রিকাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট’ আইন অনুসারে স্বীকৃত সংস্থার সাহায্যে জমা পড়া ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটগুলিকে খুলে ফেলা হল। এই অলিম্পিকে বিজয়ীদের দেওয়া প্রতিটা মেডেলের ধাতু সম্পূর্নভাবে এই ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটগুলি থেকে পাওয়া ধাতু থেকে তৈরি। গ্যাজেটগুলি থেকে যেটুকু সোনা রূপো ও ব্রোঞ্জ পাওয়া গেল সেগুলোই মেডেল তৈরিতে ব্যবহার হল। 

১৯১২ সালে স্টকহোম অলিম্পিকের পর খাঁটি সোনার মেডেল দেওয়া অলিম্পিকে বন্ধ হয়ে গেছে। অলিম্পিক কমিটির নিয়ম অনুসারে প্রতিটি সোনার মেডেল তৈরি হয় ৯২.৫ খাঁটি রূপোর সাথে ন্যূনতম ৬ গ্রাম সোনা মিশিয়ে। এই ৬ গ্রাম সোনা নিষ্কাশন করতে প্রায় ৩৫-৪০টি মোবাইল দরকার পড়ে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই জমা পড়া মোবাইল সহ ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটগুলি থেকে কতটা সোনা রূপো পাওয়া গেল?  জাপানের পুরসভায় জমা পড়া ৭৮,৯৮৫ টন ছোট আকারের ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটস এবং সমগ্র জাপান জুড়ে অবস্থিত এন.টি.টি ডোকোমোর দোকানগুলিতে জমা পড়া মোট ৬২ লক্ষ ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে বত্রিশ কেজি সোনা, সাড়ে তিন হাজার কেজি রূপো এবং বাইশশো কেজি মত ব্রোঞ্জ পাওয়া গেল।  মাথায় রাখতে হবে পুরোটাই কেবল বাতিল হওয়া  ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটস থেকে। 

এরপর তৈরি হল মেডেল। আরে দাঁড়ান! এত সহজ নাকি মেডেল তৈরি? মেডেলের ডিজাইন  কেমন হবে সেটা ভাবতে হবে না ! তার জন্যেও জাপানের অলিম্পিক কমিটি আয়োজন করল দেশব্যাপী মেডেল ডিজাইন প্রতিযোগিতা। জমা পড়া ৪০০টি ডিজাইনের মধ্যে থেকে জয়ী হল জুনিচি কাওয়ানিশির ডিজাইনটি।  তৈরি হল যুগান্তকারী সম্পূর্নভাবে  ই- বর্জ্য থেকে তৈরি অলিম্পিকের ইতিহাসের প্রথম মেডেল। এর আগে ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে রূপোর মেডেলের ত্রিশ শতাংশ তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন ফেলে দেওয়া বাতিল হয়ে যাওয়া সামগ্রী থেকে রূপো নিষ্কাশন করে। কিন্তু একটি অলিম্পিকের সমস্ত ক্যাটাগরির সমস্ত মেডেল সম্পূর্নভাবে ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটস থেকে প্রাপ্ত ধাতুর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে এই নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত জাপানই প্রথম করে দেখালো। 

মেডেল বানিয়েই কিন্তু জাপান থেমে থাকলো না। মেডেলের সাথে থাকা রিবনেও জাপান আনল প্রথাগত জাপানী রীতির সাথে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এক অভাবনীয় মিশেল।  জাপানের প্রথাগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহনকারী নকশা হল- নীল সাদা চেক যাকে জাপানীতে ‘ইচিমাৎসু ময়ো’ বলা হয়।  এই নীল সাদা চেক প্রিন্টের সাথে জাপানের ঐতিহ্যবাহী ‘কাসানে নো ইরোমে’ অর্থাৎ কিমোনো পোশাকের স্তর বিন্যাস মিলে তৈরি হল রিবনের নকশা যা জাপানের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের আদর্শকে তুলে ধরেছে। এই নকশাগুলি আবার রাসায়নিকভাবে পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টার ফাইবার যা উৎপাদনের সময় তুলনামূলকভাবে কম কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন করে তা দিয়ে তৈরি হয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে সিলিকন লাইনিং যা স্পর্শ করা মাত্র বুঝিয়ে দেয় মেডেলটি কোন ধাতুতে গড়া।

জাপান কেন অনন্য সেটা বিশ্বকে আরো একবার জানান দিয়ে গেল এই অলিম্পিক।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও