খেলা

অলিম্পিকের অনুপ্রেরণাদায়ী অ্যাথলিটরা

বাংলায় মতি নন্দীর লেখা কোনি উপন্যাসটা পড়েছেন নিশ্চয় বা সিনেমাটাও দেখে থাকবেন। মনে পড়ছে কোচ ক্ষিদ্দার সেই সংলাপগুলি – ‘যন্ত্রণাটাকে বোঝ, ওটাকে কাজে লাগাতে শেখ, ওটাকে হারিয়ে দে…ফাইট কোনি, ফাইট!’? এই ফাইটটাই যেন জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে সকল অ্যাথলিটদের। উপন্যাসের কোনি যেমন নিজের শত দুরবস্থাকে উপেক্ষা করে জিতে নিয়েছিল দক্ষ সাঁতারুর সম্মান, ঠিক তেমনই আজ ছয়জন অলিম্পিক জয়ী অ্যাথলিটদের কথা বলবো যাদের ক্রীড়া-দক্ষতার পাশাপাশি মানসিক জোর আর চরম দুরবস্থার মধ্যে থেকেও সাফল্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্প বিশ্বখ্যাত হয়ে রয়েছে। কখনো অসাড় পা নিয়ে ঘোড়-দৌড় জিতেছেন লিস হার্টেল, কখনো ডিটেনশন ক্যাম্পে থেকে থেকে ভারোত্তোলনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেলেছেন তামিও কোনো, আবার নিজের প্রতিযোগিতার কথা ভুলে গিয়ে বিপদগ্রস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে উদ্ধার করে মানবতার নিদর্শন রেখেছেন লরেন্স লেমিয়াক্স। কখনো শুনেছেন শুধুমাত্র বন্ধুত্বের খাতিরে রৌপ্য পদক আর ব্রোঞ্জ পদক ভেঙে দুটিতেই রূপা আর ব্রোঞ্জ মিশিয়ে পদক বানিয়ে রেখেছেন কেউ? হ্যাঁ, জাপানের দুই অ্যাথলিট এভাবেই ‘বন্ধুত্বের পদক’ লাভ করেছিলেন। আসুন হিসেবী এই পৃথিবীতে হিসেববহির্ভূত যে উদাহরণ অলিম্পিকের অনুপ্রেরণাদায়ী অ্যাথলিটরা(inspirational Olympic athletes) তৈরি করেছেন তারই কিছু নমুনা জেনে নেওয়া যাক।

তামিও কোনো – জাপানি-মার্কিন ভারোত্তোলক তামিও কোনো ওরফে ‘টমি কোনো’কে দিয়েই আমাদের এই অনুপ্রেরণার কাহিনি শুরু হোক। ছোটো থেকেই শ্বাসকষ্ট ছিল তামিওর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় ক্যালিফোর্নিয়ার মরুভূমিতে এক ডিটেনশন ক্যাম্পে জাপানের তামিও কোনো আর তার পরিবারকে বন্দি করে রাখা হয়। প্রায় সাড়ে তিন বছরের প্রবল অত্যাচার সহ্য করেও জীবন অন্য এক আশার আলো খুলে দিয়েছিল তাঁর কাছে। মরুভূমির আবহাওয়ায় ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট কমে আসছিল তামিওর আর সেই ডিটেনশন ক্যাম্পেই ভারোত্তোলন শুরু করেন তিনি। তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ভারোত্তোলন দলের হয়ে প্রতিযোগিতায় যোগ দেওয়া শুরু হয় তাঁর। ১৪৯ পাউণ্ড থেকে ১৯৮ পাউণ্ড ওজন তুলেছেন তিনি সেই সময়। একইসঙ্গে লাইট-ওয়েট, মিড লাইট-হেভিওয়েট আর মিড্‌ল-ওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপে ১৯৫২ সাল থেকে শুরু করে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সব অলিম্পিকেই পদক জিতেছেন তামিও কোনো। শ্বাসকষ্টের কারণে ১০৫ পাউণ্ড ওজন তুলতেই অক্ষম ছিলেন যে তামিও, তিনিই পরে ভারোত্তোলনে সাতটি অলিম্পিক রেকর্ড আর ছাব্বিশটি বিশ্ব-রেকর্ড গড়ে তোলেন। এরপর ভার-উত্তোলনের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন তিনি। ১৯৬৮ সালের মেক্সিকোর গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক এবং ১৯৭২ সালের পশ্চিম জার্মানির অলিম্পিকে ভারোত্তোলকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারোত্তোলন অলিম্পিক দলের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব পান তামিও কোনো। ভাবতে অবাক লাগে, একসময় যে দেশের ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি থেকে অসহনীয় অত্যাচার সহ্য করেছেন তিনি, সেই তামিও কোনো ১৯৭৬ সালের অলিম্পিকের জন্য ঐ দেশের অ্যাথলিটদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। আরো চমক বাকি আছে। ১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় বিখ্যাত জুতো-নির্মাতা সংস্থা অ্যাডিডাস-এর সঙ্গে শুধুমাত্র ভারোত্তোলনের জন্য এক বিশেষ প্রকারের লো-কাট জুতো আবিষ্কার করে ফেলেন তিনি। অ্যাজমার কারণে একসময়ে যে তামিও অশক্ত ছিলেন, দুর্বল ছিলেন কেবল নিজের জেদের জোরে পরে তিনিই হয়ে উঠলেন ভারোত্তোলনের এক পথিকৃৎ।

লিস হার্টেল – পোলিওতে অসাড় হয়ে যাওয়া দু’পা নিয়েই ঘোড়-দৌড়ে রৌপ্য পদক এনেছিলেন লিস হার্টেল। ১৯৪৪ সালে গর্ভবতী থাকাকালীন পোলিওয় আক্রান্ত হয়ে তাঁর দুটি পা একেবারে অকেজো হয়ে পড়ে। শিশুটি নিরাপদে জন্মালেও ঘোড়ায় চড়ার আশা তাঁর একেবারেই নিভে গিয়েছিল বলা যায়। কিন্তু জীবন তো সমুদ্রের মতো – ঢেউয়ের তোড়ে যা ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তার থেকেও অনেক বেশি কিছু ফিরিয়ে দেয় আবার। ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হল পুনরায় ঘোড়ায় চড়া। হাঁটুর নীচের কোনো পেশিই ব্যবহার করতে পারতেন না তিনি। ঘোড়ায় উঠতে আর নামতে সাহায্যের প্রয়োজন হতো তাঁর। কিন্তু তাতেও দমে যাননি লিস হার্টেল। ১৯৫২ সালের অলিম্পিকে ডেনমার্কের হয়ে পুরুষ-প্রধান ঘোড়-দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রৌপ্য পদক জিতে নিলেন লিস। লিস হার্টেল প্রমাণ করেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা স্বপ্ন পূরণে বাধা হতে পারেনা।

টেওফিলো স্টিভেনসন – ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিক। লক্ষ লক্ষ টাকার প্রলোভনকে ছুঁড়ে ফেললেন কিউবার বক্সার টেওফিলো স্টিভেনসন। চূড়ান্ত দক্ষতায় মাত্র তিরিশ সেকেণ্ডে প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে বক্সিংয়ে সোনা জিতেছিলেন তিনি আর তারপর থেকেই বহু ক্রীড়াপ্রেমী উদ্যোগপতিরা ভিড় করতে থাকে তাঁর কাছে। সকলেই চায় যথোপযুক্ত অর্থের বিনিময়ে তিনি অন্য দেশের হয়ে সে দেশের অ্যাথলিটদের প্রশিক্ষণ দিন। কিন্তু কিউবার কমিউনিস্ট বিপ্লবের আদর্শে মাথা স্থির রেখে অন্য দেশে প্রশিক্ষণের কাজে পা বাড়াননি টেওফিলো স্টিভেনসন। ফিরিয়ে দিয়েছেন প্রায় দশ লক্ষ টাকার কাজের প্রলোভন। নিজের দেশের হয়েই বরাবর খেলতে চেয়েছেন তিনি। অবসর নেওয়ার পরে মাসিক মাত্র চারশো ডলারের বিনিময়ে কিউবার তরুণ বক্সারদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি, কিন্তু তবু অর্থের কাছে বিসর্জন দেননি নিজের আদর্শকে। দশ লক্ষ টাকার পরিবর্তে আট লক্ষ কিউবান মানুষের ভালোবাসার স্বাদ যে সত্যই মধুর তা সেদিনই আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন টেওফিলো স্টিভেনসন।

লরেন্স লেমিয়াক্স – নিজের নৌ-চালনা থামিয়ে অন্য দুজন বিপদ্‌গ্রস্ত নৌ-চালককে বাঁচিয়েছিলেন কানাডিয়ান নাবিক লরেন্স লেমিয়াক্স। আর কিছুদূর গেলেই হয়তো রৌপ্য পদকের সম্মান পেতেন তিনি, অলিম্পিকের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রাখতে পারতেন নিজের নাম। কিন্তু না, অন্য দুজন সিঙ্গাপুরী প্রতিদ্বন্দ্বীকে বাঁচাতে গিয়ে আসল প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করা হল না তাঁর। ছয় ফুট উঁচু ঢেউয়ের আঘাতে সিঙ্গাপুরের দুই প্রতিযোগীর একজনের নৌকা তখন প্রায় ডুবে যাচ্ছিল আর অপরজনের নৌকাটি প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরে চলে গিয়েছিল মূল ট্র্যাক থেকে। লেমিয়াক্স প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাঁচানোই প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছিলেন। তাঁর সামনে দুটো রাস্তা ছিল – এক তিনি ঐ প্রতিযোগীদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারতেন এবং বিজয়ীর বরমাল্য তাঁর জন্য অপেক্ষারত ছিল আর দ্বিতীয়ত তিনি জয়কে বড়ো করে না দেখে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকেই প্রাধান্য দিতে পারতেন। এ যেন সেই রবার্ট ফ্রস্টের চির বিখ্যাত কবিতার পংক্তিগুলির মতো –

‘Two roads diverged in a wood, and I

I took the one less travelled by

And that has made all the difference.’

সেই অন্য রাস্তা ধরেই অলিম্পিকের ইতিহাসে নাম উজ্জ্বল হয়ে থাকলো তাঁর। বিপদ্‌গ্রস্ত প্রতিযোগীদের উদ্ধার করে মূল প্রতিযোগিতায় ২৩তম স্থান পেলেও ১৯৮৮ সালের সিওল অলিম্পিকে মানবতার এক চূড়ান্ত নিদর্শন রাখতে পেরেছিলেন তিনি। আর এই কারণেই আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি তাঁকে ‘পিয়ের দে কৌবার্তিন পুরস্কার’-এ ভূষিত করে।

সুহেই নিশিদা এবং সুয়েও ও তিয়েদ: আবার ফিরে যাই সেই ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে। জাপানি পোল ভল্টার সুহেই নিশিদা আর সুয়েও ও তিয়েদ দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধুর গল্প। বন্ধুত্বের চূড়ান্ত নিদর্শন দেখেছিল সেদিনের অলিম্পিক। দুজনকেই জয়লাভের কারণে রৌপ্য পদকে সম্মানিত করা অলিম্পিকে সম্ভব নয় জেনে নিশিদা রৌপ্য পদক গ্রহণ করেন এবং সুয়েও পান ব্রোঞ্জ পদক। তারপর কী করলেন তারা? শুনলে আশ্চর্য হতে হয়, দেশে ফিরে নিজস্ব মণিকারকে দিয়ে তারা সেই দুটি পদক ভেঙে প্রতিটিতে অর্ধেক রূপা আর অর্ধেক ব্রোঞ্জ মিশিয়ে নতুন করে দুটি পদক তৈরি করে নেন যাকে তাঁদের পরিজনেরা নাম দিয়েছেন ‘বন্ধুত্বের পদক’। জাপানের প্রতিটি পরিবার এখন এই দুই বন্ধুর দক্ষতায় গর্ব অনুভব করেন।

সৈয়দ মোল্লেই: সবশেষে বলতে হয় মঙ্গোলিয়ান জুডো লড়াকু সৈয়দ মোল্লেই-এর কথা। ২০১৯ সালের আন্তর্জাতিক জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে ইরানের হয়েই জুডো খেলায় নাম লিখিয়েছিলেন সৈয়দ। কিন্তু ভাগ্যের কী নিদারুণ পরিহাস! প্রতিযোগিতা শুরুর ঠিক আগে ইরানিয়ান ক্রীড়া মন্ত্রী, ইরানের জুডো ফেডারেশন এবং ইরানের অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট তাঁকে বারংবার ফোন করে বলেন যে, এই চ্যাম্পিয়নশিপের সেমি-ফাইনালে তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে হারতে হবে যাতে ফাইনালে ইজরায়েলি জুডো লড়াকু সাগি মুকির সঙ্গে তাঁকে লড়তে না হয়। আমাদের মনে পড়ে যাবে ইরানের সঙ্গে ইজরায়েলের তৎকালীন রাজনৈতিক দ্বৈরথের কথা যার শিকার হয়ে সম্পূর্ণভাবে মানসিক হতাশায় ডুবে গেলেন মোল্লেই। দেশে ফিরতে পারছিলেন না তিনি, ওদিকে খবর আসে তাঁর বাড়িতে আক্রমণের সম্ভাবনার কথা। দেশ থেকে পালিয়ে দুই বছরের ভিসা নিয়ে জার্মানির এক মানসিক হাসপাতালে অনেকদিন লুকিয়ে ছিলেন মোল্লেই। ২০১৯-এর জুডো চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে বাধ্য হয়ে তাঁকে অব্যাহতি নিতে হলেও, সেখানেই সব কিছু শেষ হয়ে যায়নি। মোল্লেই চেয়েছিলেন শুধুমাত্র জুডোয় অংশ নিয়ে একটা চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে, রাজনীতির জটিলতা তাঁকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করেছিল। কিন্তু চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে না পারলেও জীবনের প্রতিটি খেলায় জিতে গিয়েছেন মোল্লেই। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ওসাকা গ্র্যাণ্ড স্ল্যাম-এ আবার যোগ দিলেন মোল্লেই ইরানিয়ান জুডো ফেডারেশনের রিফিউজি দলের পক্ষ থেকে। ততদিনে মঙ্গোলিয়ার নাগরিকত্ব পেয়েছেন তিনি। ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে মঙ্গোলিয়ার হয়ে যোগ দিয়ে জুডোয় রৌপ্য পদক জয় করেছেন মোল্লেই। যে ইজরায়েলি প্রতিপক্ষের কাছে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে একদিন হারতে বলা হয়েছিল, সেই ইজরায়েলকেই সেই পদকটি উৎসর্গ করেছেন তিনি। জীবনের মোড় ঘুরে গেল তাঁর।

শুধু এই ছয়জনই নয়, এরকম কাহিনির শেষ নেই। অলিম্পিকের অনুপ্রেরণাদায়ী এই অ্যাথলিটরা আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা দেন জীবনের পরাজয়ের মুহূর্ত থেকে আবার মূলস্রোতে ফিরে আসতে আর চোখে আঙুল দিয়ে বারংবার প্রমাণ করেন ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।