ইতিহাস

আইজ্যাক নিউটন

সপ্তদশ শতাব্দীর বিস্ময়কর প্রতিভাধর ব্রিটিশ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ আইজ্যাক নিউটন (Isaac Newton) সমগ্র বিশ্বের বিজ্ঞান বিপ্লবের এক অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর আবিষ্কৃত মহাকর্ষ সূত্র, সাদা আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ, নিউটনের গতিসূত্র আধুনিক বিজ্ঞানের স্তম্ভস্বরূপ। আলোকবিজ্ঞান, বলবিজ্ঞান কিংবা জ্যোতির্বিজ্ঞান সবেতেই নিউটনের ছিল অবাধ, অনায়াস দক্ষতা। আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর লেখা ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ বইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।    

আধুনিক বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৬৪৩ সালের ৪ জানুয়ারি (সেই সময়ে প্রচলিত জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ১৬৪২ সালের ২৫ ডিসেম্বর) ইংল্যাণ্ডের লিঙ্কনশায়ারের উলস্‌থ্রপ (Woolsthorpe, Lincolnshire) আইজ্যাক নিউটনের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নামও ছিল আইজ্যাক নিউটন এবং মা ছিলেন হানা অ্যাসকাফ নিউটন। তাঁর বাবা ছিলেন এক সম্পন্ন কৃষক কিন্তু নিউটনের জন্মের তিন মাস আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। অপুষ্ট, দুর্বল অবস্থায় নিউটনের জন্ম হয় ফলে তাঁর বাঁচার আশা ছিল না বললেই চলে কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তিনি দীর্ঘজীবি হন। নিউটনের যখন তিন বছর বয়স তখন তাঁর মা রেভারেণ্ড বার্নবাউশ স্মিথ নামের এক ব্যক্তিকে বিবাহ করেন এবং নিউটনকে তাঁর দিদার দায়িত্বে রেখে আসেন।

নিউটনের প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পন্ন হয় তাঁর দিদার বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ মাইল দূরে গ্র্যান্থাম্‌-এ ফ্রি গ্রামার স্কুলে (মতান্তরে কিংস স্কুল)। কিন্তু ছোটবেলায় পড়াশোনায় তিনি একদমই মনোযোগী ছিলেন না। বারো বছর বয়সে ঐ স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনার থেকে বেশি নানাবিধ যন্ত্রপাতি নির্মাণে মনোনিবেশ করতেন নিউটন। খুব অল্প বয়সেই তিনি বায়ুকল, জলঘড়ি, সূর্যঘড়ি ইত্যাদি তৈরি করে ফেলেন। ১৭ বছর পর্যন্ত এই স্কুলে থাকাকালীন তিনি ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষা শেখেন এবং সাধারণ পাটিগণিতের ধারণা তৈরি করেন। ১৬৬১ সালে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে কাকা রেভ অ্যাসকাফের সুপারিশে নিউটন ভর্তি হন। ১৬৬৪ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি বৃত্তি পান এবং সেখান থেকেই ঐ বৃত্তির সহায়তায় স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন। ১৬৬৫ সালের এপ্রিল মাসে নিউটন স্নাতক উত্তীর্ণ হন এবং ১৬৬৯ সালে নিউটন মাস্টার অফ আর্টস ডিগ্রি লাভ করেন ট্রিনিটি কলেজ থেকে। এই কলেজে পড়াকালীনই তিনি দীর্ঘ এক বছর ধরে দেকার্তের ‘লা জিওমেত্রি’ এবং পরে ইউক্লিডের সনাতন জ্যামিতির চর্চা করেন। সেসময় সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আবর্তন সংক্রান্ত তত্ত্ব নিকোলাস কোপারনিকাস এবং জোহানেস কেপলার এবং পরবর্তীতে গ্যালিলিও সমগ্র বিশ্বে প্রচার করেন। নিউটন এই ধারণা সম্পর্কে অবগত হন। দার্শনিক রেনে দেকার্ত আবার প্রকৃতিকে একটি জটিল, নৈর্ব্যক্তিক এবং জড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এই সময় থেকেই তিনি আধুনিক যুগের মহান দার্শনিকদের দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকেন। তাঁদের বই পড়ে নিউটনের মনে উদিত প্রশ্নগুলি একটি খাতায় নোটসের আকারে টুকে রাখেন যা পরে ‘কোয়েশ্চেন্স কোয়াডাম ফিলোজফিকা’ (Quaestionaes Quaedam Philosophicae) নামে প্রকাশিত হয়। প্রকৃতি-ব্রহ্মাণ্ড-মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর এক বৈপ্লবিক ধারণা তৈরি হয়। স্নাতকে ডিস্টিংশান বা প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ না হলেও, এই প্রচেষ্টায় আইজ্যাক নিউটন গবেষকের মর্যাদা পান এবং পরবর্তী চার বছর উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি লাভ করেন। তিনি এও লক্ষ্য করেন যে ফরাসি দার্শনিক পিয়ের গ্যাসেন্ডি প্রকৃতির রহস্য ব্যাখ্যার জন্য পরমাণুবাদের যান্ত্রিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এই মুহূর্তে নিউটনের মনের উপর একাধারে প্রাকৃতিক দর্শন, যান্ত্রিক দর্শন এবং হার্মেটিক দর্শনের মিলিত প্রভাব পড়তে থাকল।আর এই প্রভাবের ফলে অনুসন্ধিৎসু নিউটনের বিজ্ঞানের চর্চার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু হয়।

১৬৬৮ সালে নিউটন একটি প্রতিফলক টেলিস্কোপ নির্মাণ করেন যা ছিল তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। ১৬৬৯ সালে ট্রিনিটি কলেজের গণিত বিভাগে নিউটন লুকাসীয় অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত হন। আর এই বছরই নিউটন তাঁর গবেষণা এবং দীর্ঘ গণিতচর্চার একটি সারসংক্ষেপ লিখে ফেলেন ‘অন অ্যানালিসিস বাই ইনফাইনাইট সিরিজ’ (On Analysis by Infinite Series)। এই কাজের পাণ্ডুলিপি ধীরে ধীরে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং গণিতবিদ মহলে তিনি পরিচিত হতে থাকেন। ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক জন ব্যারো নিউটনের এই পাণ্ডুলিপিটি লণ্ডনে জন কলিনের কাছে পাঠিয়েছিলেন মতামত চেয়ে। পরবর্তী দুই বছরে নিউটন তাঁর এই গবেষণাকর্মের প্রস্তাবনাটির নাম বদলে রাখেন ‘অন দ্য মেথডস অফ সিরিজ অ্যান্ড ফ্লুক্সিওন্স’ (On the Methods of Series and Fluxions)। আর এই প্রস্তাবনা থেকেই জন্ম হয়েছিল ‘ক্যালকুলাস’ নামের বিখ্যাত নির্ণায়ক পদ্ধতির। ১৬৭০ থেকে ১৬৭২ সালের মধ্যে দীর্ঘ অধ্যবসায়ে আলোকবিজ্ঞানের উপর তিনি একটি গবেষণা প্রবন্ধ লেখেন যার নাম ‘অফ কালারস’। এই প্রবন্ধ থেকেই পরে তাঁর আলোকবিজ্ঞান সংক্রান্ত আবিষ্কারের একমাত্র প্রামাণ্য বই ‘অপটিক্‌স : এ ট্রিটিজ অফ দ্য রিফ্লেকশন্‌স, রিফ্র্যাকশান্‌স, ইনফ্লেকশান্‌স অ্যান্ড কালারস অফ লাইট’ (Opticks: Or, A treatise of the Reflections, Refractions, Inflections and Colours of Light) প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে রয়্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে যেখানে নিউটন প্রথম সূর্যালোকের বিচ্ছুরণ এবং যৌগিক আলোর সাতটি বর্ণালীর কথা বলেন। যদিও এ নিয়ে বিজ্ঞানী রবার্ট হুকের সঙ্গে তাঁর বিতর্ক বাধে। রবার্ট হুক যেখানে আলোর তরঙ্গ ধর্মের কথা বলেন সেখানে নিউটন আলোর কণা ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেছেন। আলোকবিজ্ঞানের ইতিহাসে হুক-নিউটন বিতর্ক একটি স্মরণীয় অধ্যায়।

১৬৬৫-তে সমগ্র ইউরোপ জুড়ে প্লেগ মহামারীর আকার নিলে আইজ্যাক নিউটন কলেজ থেকে তাঁর বাড়িতে ফিরে যান এবং সেখানেই একদিন আশ্চর্যজনকভাবে একটি আপেলকে গাছ থেকে পড়তে দেখে তাঁর মনে গতি এবং আকর্ষণ বল সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা তৈরি হয়। এ থেকেই পরে নিউটন আবিষ্কার করে ফেলেন বিখ্যাত মহাকর্ষ সূত্র। এই ঘটনা বর্তমানে প্রায় কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৬৮৭ সালে দীর্ঘ দেড় বছরের পরিশ্রমের পর নিউটন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফিলোজফি ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ (Philosophiae Naturalis Principia Mathametica) তথা সংক্ষেপে প্রিন্সিপিয়া প্রকাশ করেন। এই বইতেই তিনি বস্তুর গতি সম্পর্কে তিনটি সূত্র উল্লেখ করেন যা ‘নিউটনের গতিসূত্র’ নামে বিখ্যাত আর মহাকর্ষ সূত্রটিও এই বইতেই উল্লিখিত হয়। এই বই প্রকাশে অর্থের যোগান দিয়েছিলেন অপর আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী এডমণ্ড হ্যালি। আইজ্যাক নিউটন প্রথম আবিষ্কার করেন যে দুটি মহাজাগতিক বস্তুর মধ্যেকার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বলের মান তাদের উভয়ের ভরের সমানুপাতিক এবং উভয় বস্তুর অন্তর্বর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। বয়েলের সুত্রের উপর ভিত্তি করে তিনি এই তত্ত্বে উপনীত হন। মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তু, গ্রহ, উপগ্রহ এই সূত্র মেনে চলে। ১৭০৩ সালে নিউটন রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি হন। নিউটনের সঙ্গে জার্মান দার্শনিক ও গণিতবিদ গটফ্রিড লাইবনিৎসের বিতর্ক ও বিরোধ বাধে ক্যালকুলাসকে কেন্দ্র করে। লাইবনিৎসের বক্তব্য ছিল যে তিনি প্রিন্সিপিয়া প্রকাশের আগেই এই ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছিলেন কিন্তু পেটেন্ট পাননি। নিউটন অনেক আগে এটি আবিষ্কার করলেও প্রকাশ করেছেন অনেক পরে। তবুও এই বিতর্ক ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে আছে। তিনি দ্বিপদী উপপাদ্যের একটি সাধারণ রূপ আবিষ্কার করেন যা যেকোনো ঘাতের জন্য প্রযোজ্য হয়। তাছাড়া তিনি ‘দিওফান্তিন সমীকরণ’ প্রয়োগ করার জন্য প্রথম স্থানাঙ্ক জ্যামিতি প্রয়োগ করেন। নিউটন জীবনের শেষদিকে বিজ্ঞানচর্চা ত্যাগ করে রয়্যাল মিন্টের ওয়ার্ডেনের পদে বহাল হন এবং ১৬৯৮ সালে তাঁকে ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস্‌’ পদে নিযুক্ত করা হয়। এই পদে থেকে নিউটন দেশের জাল মুদ্রা প্রস্তুতকারকদের শাস্তিবিধান করেন।

তাঁর লেখা অন্যান্য গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘অফ নেচারস অবভিয়াস ল’স অ্যান্ড প্রসেসেস ইন ভেজিটেশন’ (১৬৭১), ‘অ্যারিথমেটিকা ইউনিভার্সালিস’ (১৭০৭) ইত্যাদি। বিজ্ঞানের পাশাপাশি তিনি অ্যালকেমি বিষয়েও গভীর অধ্যয়ন করেন এবং বাইবেলের অনেক তথ্যের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আবিষ্কার করেন। এ সম্পর্কে তাঁর একটি বই আছে যার নাম ‘অ্যান হিস্টরিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ টু নোটেব্‌ল করাপশন্‌স অফ স্ক্রিপচার’। উইলিয়াম স্টাকলি নিউটনের জীবন অবলম্বনে লেখেন ‘মেমোয়ের্‌স অফ স্যার আইজাক নিউটনস লাইফ’, পরে রয়েল মিন্টে এবং তাঁর সহকারী জন কণ্ডুইট নিউটনের প্রামাণ্য জীবনী রচনা করেন। স্যার স্টিফেন হকিং তাঁর ‘আ ব্রিফ হিস্টরি অফ টাইম’ গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশে নিউটনের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখ করেছেন। আইজ্যাক নিউটন ছিলেন প্রথম বিজ্ঞানী যিনি ১৭০৫ সালে ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন।

১৭২৭ সালের ২০ মার্চ ৮৫ বছর বয়সে স্যার আইজ্যাক নিউটনের মৃত্যু হয়। লণ্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

স্বরচিত রচনাপাঠ প্রতিযোগিতা - নববর্ষ ১৪২৮



সমস্ত রচনাপাঠ শুনতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন