ইতিহাস

কে. জি. রামানাথন

ভারতবর্ষের গণিত চর্চার ইতিহাস খুবই প্রাচীন। সেই কোনকাল থেকে আজ পর্যন্ত গণিতের নানা গলিঘুঁজি আবিষ্কার করে গণিতশাস্ত্রটিকে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন বিশিষ্ট এবং বিশ্ববিখ্যাত কিছু গণিতজ্ঞ। ভারতবর্ষের সেই সমস্ত গণিতবিদের তালিকায় অবশ্যই স্থান পাবেন কোল্লাগুন্টা গোপালাইয়ার রামানাথন (Kollagunta Gopalaiyer Ramanathan) যিনি মূলত কে. জি. রামানাথন নামেই অধিক পরিচিত। গাণিতিক গবেষণা এবং গণিতশিক্ষার উন্নতিতে তাঁর প্রভূত অবদান। মূলত সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণাগুলির জন্যই ভারতজোড়া পরিচিতি তাঁর।

১৯২০ সালের ১৩ নভেম্বর দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদে জন্মগ্রহণ করেন কে.জি. রামানাথন। তাঁর পিতার নাম কোল্লাগুন্টা গোপাল আইয়ার (Kollagunta Gopal Iyer) এবং মাতা অনন্তলক্ষ্মী (Ananthalaxmi)। খুব অল্প বয়সেই নিজের মাকে হারিয়েছিলেন রামানাথন। তাঁর দুটি বোন এবং এক ভাই। রামানাথনের স্ত্রী হলেন জয়লক্ষ্মী রামানাথন। তাঁদের দুই পুত্রের নাম অনন্ত এবং মোহন।

১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রামানাথন বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তারপর মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন এবং সেখানে থেকেই গবেষণার কাজ শুরু করে দেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল সংখ্যাতত্ত্ব (Number theory)। এছাড়াও সেসময় কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় গবেষণা করবার জন্য প্রিন্সটনের ইন্সটিটিউট ফর অ্যাডভান্স স্টাডিতে (Institute for Advanced Study) যাওয়ার পর। সেখানে অধ্যয়নের সঙ্গে সঙ্গে হারম্যান ওয়েলের (Hermann Weyl) সহকারী হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছিলেন রামানাথন। সেখানে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য যখন তিনি গবেষণা শুরু করেন, তাঁর পরামর্শদাতা হিসেবে ছিলেন এমিল আর্টিন (Emil Artin)। তিনি কার্ল সিগেলের (Carl Siegel) গণিত দ্বারা প্রভূত প্রভাবিত হয়েছিলেন। এমনকি প্রিন্সটনে থাকাকালীন তিনি যেসব গবেষণা চালিয়েছেন তার সবকটিই কার্ল সিগালের গণিত দ্বারা প্রভাবিত। প্রিন্সটনে দুবছর রামানাথনের প্রতিবেশী ছিলেন কিংবদন্তী পদার্থবিজ্ঞানী এলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein)। আইনস্টাইনকে কর্ণাটকের বিখ্যাত ত্যাগরাজার (Tyagaraja) গান গেয়ে শোনাতেন রামানাথন।

১৯৪১ সাল থেকে নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে শুরু করেন রামানাথন। তখন থেকেই পরপর বেশ কিছু গবেষণাপত্র বের করেন, সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল, ‘মাল্টিপ্লিকেটিভ অ্যারিথমেটিক ফাঙ্কসানস্’ (Multiplicative Arithmetic Functions, 1943), ‘দ্য সাম অব দ্য ডিভিসার্স অব এন’ (The Sum of the Divisors of n, 1944), ‘সাম অ্যাপ্লিকেশনস অব রামানুজনস ট্রায়াগোনোমেট্রিক সাম সিএম(এন)’ (Some Applications of Ramanujan’s Trigonometrical Sum Cm(n), 1943) ইত্যাদি। প্রিন্সটনে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য তিনি যে গবেষণা করেছিলেন সেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫১ সালে। তাঁর সেই গবেষণাপত্রের নাম ছিল, ‘দ্য থিওরি অব ইউনিটস্ অব কোয়াড্রাটিক অ্যান্ড হার্মিটিয়ান ফর্মস্’ (The Theory of Units of Quadratic and Hermitian Forms)।

এরপর দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কে. এস. চন্দ্রশেখরনের (K. S. Chandrasekharan) সঙ্গে যোগ দিয়ে টাটা ইন্সটিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে (Tata Institute of Fundamental Research বা TIFR) কাজ করতে শুরু করেন ১৯৫১ সাল থেকেই।এর পরবর্তী সময়ে উত্তর আমেরিকার বেশ কিছু জার্নালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘অ্যাবেলিয়ান কোয়াড্রাটিক ফর্মস্’ (Abelian quadratic forms, 1952), ‘ইউনিটস অব কোয়াড্রাটিক ফর্মস্’ (Units of quadratic forms) ইত্যাদি। কিন্তু এরপর থেকে তিনি ভারতীয় জার্নালগুলিতেও নিজের গবেষণা প্রকাশ করতে শুরু করেন। ইন্ডিয়ান ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটির (Indian Mathematical Society) জার্নালে প্রকাশিত সেই গবেষণাপত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল, ‘এ নোট অন সিমপ্লেকটিক কমপ্লিমেন্টস্’ (A Note on Symplectic Complements, 1954), ‘দ্য রিম্যান স্ফেয়ার ইন ম্যাট্রিক্স স্পেসেস্ (The Riemann Sphere in Matrix Spaces, 1955) ইত্যাদি।

সংখ্যাতত্ত্ব বিষয়ে পাঠদানের জন্য কে. জি. রামানাথন টাটা ইন্সটিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে একটি খুবই উচ্চমানের শিক্ষায়তন গড়ে তুলেছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতচর্চার উন্নতিসাধন এবং একটি গাণিতিক সংস্কৃতির প্রসারের জন্য অক্লান্ত প্রয়াস চালিয়ে গিয়েছিলেন রামানাথন এবং সফল হয়েছিলেন।

সংখ্যার বিশ্লেষণাত্মক তত্ত্বের জন্য প্রসিদ্ধ শ্রীনিবাস রামানুজনের দ্বারা রামানাথনের বেশ কিছু গবেষণামূলক প্রবন্ধ খুবই প্রভাবিত হয়েছিল। রামানুজন নিয়ে এতটাই আগ্রহ ছিল রামানাথনের যে তিনি রামানুজনের প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত অনেকগুলি গবেষণাধর্মী কাজ গভীর মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করেছিলেন। রামানুজনের কাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত রামানাথনের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র হল ‘হাইপোজিওম্যাট্রিক সিরিজ অ্যান্ড কনটিনিউড ফ্র্যাকশানস্’ (Hypergeometric series and continued fractions, 1987)।

কে. জি. রামানাথন ইন্ডিয়ান ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং সেখান থেকে প্রকাশিত জার্নালের সম্পাদক হিসেবেও দশ বছরের বেশি সময় কাজ চালিয়েছিলেন। বোম্বে ম্যাথেমেটিক্যাল কলোকিয়ামের (Bombay Mathematical Colloquium) সম্পাদকও হয়েছেন। প্রায় তিরিশ বছর ‘অ্যাক্টা অ্যারেথমেটিকা’র (Acta Arithmetica) সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন তিনি।

তাঁর গণিতচর্চায় এমন অভূতপূর্ব অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন পুরষ্কারে সম্মানিত হয়েছেন নানা সময়ে। যে সমস্ত পুরষ্কার তিনি পেয়েছিলেন তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি হল, শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরষ্কার (১৯৬৫) এবং ‘পদ্মভূষণ’ (১৯৮৩)। এছাড়াও তিনি ভারতীয় বিজ্ঞান একাডেমি (Indian Academy of Sciences) এবং ভারতীয় জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির (Indian National Science Academy) ফেলো ছিলেন তিনি। ‘হোমি ভাবা পদক’ (Homi Bhabha Medal) লাভ করেছিলেন ভারতীয় জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমি থেকেই। তিনি মহারাষ্ট্র বিজ্ঞান একাডেমির (Maharashtra Academy of Sciences) প্রতিষ্ঠাতা ফেলো ছিলেন এবং পেয়েছিলেন জওহরলাল নেহেরু ফেলোশিপ। 

তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি গবেষনাধর্মী কাজ হল, ‘সাম অ্যাপ্লিকেশনস্ অব ক্রোনেকার’স্ লিমিট ফর্মুলা’ (Some Applications of Kronecker’s Limit Formula) এবং ‘অন রামানুজন’স কন্টিনিউড ফ্র্যাকশান (On Ramanujan’s Continued Fraction)।

জীবনের অধিকাংশ সময়েই তিনি অসুস্থ থেকেছেন। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে টাটা ইন্সটিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ থেকে অবসর গ্রহণের পর জীবনের শেষ কয়েকটি বছরে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর একটি সেরিব্রাল সার্জারি হয়েছিল এবং তিনি পারকিনসনস্ (Parkinson’s Disease) নামক এক স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। মুম্বাই শহরে ১৯৯২ সালের ১০ মে এই বিখ্যাত গণিতজ্ঞ কে. জি. রামানাথনের মৃত্যু হয়েছিল।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন