ইতিহাস

কে. এস. মণিলাল

বিংশ শতাব্দীর উদ্ভিদবিদ ও শ্রেণিবিন্যাসবিদদের (Taxonomist) মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট বিজ্ঞানী পদ্মশ্রী কে. এস. মণিলাল (K. S. Manilal)। দীর্ঘ সময় ধরে ল্যাটিন ভাষায় লেখা ‘হর্টাস মালবারিকাস’ (Hortus Malabaricus)-এর মতো দুর্লভ উদ্ভিদবিজ্ঞানের বই মোট বারোটি খণ্ডে মালয়ালম এবং ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে ভারতীয় বিজ্ঞানজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন তিনি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দুনিয়ায় এই মহাকাব্যিক, শ্রমসাধ্য প্রয়াস তাঁকে এনে দিয়েছে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারের সম্মান। তবে শুধুই অনুবাদ নয়, কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক কে. এস. মণিলাল ওষধি গাছ সহ বহু লুপ্তপ্রায় ফুল গাছের সন্ধান করেছেন এবং সেই বিষয়ে গবেষণা করে লিখেছেন প্রায় একশো আটানব্বইটি গবেষণাপত্র। ‘হর্টাস মালাবারিকাস’ বইয়ের ঐতিহাসিক, সামাজিক গুরুত্ব সহ উদ্ভিদবিদ্যা ও ঔষধশাস্ত্রে এর অবদান বিষয়ে ১৫টি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে কে. এস. মণিলাল সত্যই এক বিস্ময়।

ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের কেরালার কোচিনে ১৯৩৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ডক্টর কে. এস. মণিলালের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম কট্টুঙ্গল সুব্রাহ্মণ্যম মণিলাল (Kattungal Subramaniam Manilal)। তাঁর বাবা কট্টুঙ্গল. এ. সুব্রাহ্মণ্যম ছিলেন একজন বিখ্যাত উকিল এবং একজন লেখক যিনি প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সমাজ সংস্কারক সহোদরন আইয়াপ্পার (Sahodaran Ayyapan) জীবনী লিখেছিলেন। কে. এস. মণিলালের মায়ের নাম কে. কে. দেবকী। তাঁদের তৃতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। মণিলালের পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল কেরালার উত্তর পারাভুরে। বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত মণিলাল বাল্যকাল থেকেই উদ্ভিদবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী ছিলেন আর তাই তখন থেকেই ডাচ্ উদ্ভিদবিজ্ঞানী হেনড্রিক ভ্যান হ্রিডের (Hendrik Van Rheede) মালাবার উপকূলের জীববৈচিত্র্য নিয়ে লেখা ‘হর্টাস মালবারিকাস'(Hortus Malabaricus) বইটির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কিশোর বয়স থেকেই অত্যন্ত মেধাবী মণিলাল সমাজবিজ্ঞানেও খুব উৎসাহী ছিলেন। এই বিষয়ে তিনি অসংখ্য বই সংগ্রহ করেন, এমনকি সংবাদপত্রের কাটিংও সংগ্রহ করে রাখতেন মণিলাল।

কোডুঙ্গাল্লুরে গভর্নমেন্ট বয়েজ হাইস্কুলে কে. এস. মণিলালের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। পরে এরনাকুলামের গভর্নমেন্ট এস. আর. ভি. বয়েজ হাইস্কুলে ভর্তি হন তিনি। পরবর্তীকালে এরনাকুলামের মহারাজা কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতক উত্তীর্ণ হন মণিলাল। তারপর মধ্যপ্রদেশের সগর বিশ্ববিদ্যালয় (অধুনা ড. হরিশ সিং গৌড় বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন এবং গবেষণার পরে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

স্নাতকোত্তর অধ্যয়নকালে শিক্ষামূলক ভ্রমণের জন্য দেরাদুনের ‘ইনস্টিটিউট ফর ফরেস্ট রিসার্চ সেন্টার’-এ গিয়ে প্রথমবার তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত ‘হর্টাস মালবারিকাসের’ বইয়ের মূল খণ্ডগুলি দেখতে পান প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে। সেই সময় এই প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট কলেজ’। প্রথম দর্শনেই এই বইটি তাঁর কল্পনাকে জাগ্রত করে তোলে, উদ্ভিদবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ যেন শতগুণে বেড়ে যায়।

১৯৬০ সালে কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে কে. এস. মণিলালের কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি তরুণ উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের নিয়ে দক্ষিণ ভারতের জীববৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ ‘গ্রেটার কোজিকোড’-এর প্রায় ছয়শো বর্গ কি.মি. অঞ্চলে স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজাতির নথিভুক্তকরণ (cataloging) শুরু করেন। ওই অঞ্চলে প্রায় এক হাজার প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদের সন্ধান পান তিনি যেগুলির মধ্যে বেশকিছু উদ্ভিদ প্রথমবার ভারতে পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে এই অনুসন্ধানের উপর ভিত্তি করে বিস্তারিত গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয় যেটিকে এখনও পর্যন্ত ভারতের উদ্ভিদ-গবেষণা ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময় তিনি তাঁর ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে প্রায় চোদ্দোটি নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ আবিষ্কার করেন। এছাড়াও প্রায় বারোশো প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ পুনরুদ্ধার করেন তিনি যেগুলি কেবলমাত্র শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ-এশীয় দেশগুলিতে পাওয়া যেত। সাইলেন্ট ভ্যালিতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনের(Silent Valley Movement) সময় ডক্টর মণিলাল ভারত সরকার দ্বারা গঠিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে সাইলেন্ট ভ্যালি অঞ্চলে প্রায় নয়শো পঞ্চাশ প্রজাতির স্থানীয় উদ্ভিদ আবিষ্কার করে তা নথিভুক্ত করেন এবং সাইলেন্ট ভ্যালিকে জীববৈচিত্র্যের হটস্পট বলে চিহ্নিত করেন। এর ফলে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে বিতর্কিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প প্রতিষ্ঠা রোধ করা সম্ভব হয়। কেরালার অর্কিড প্রজাতিগুলিকে নিয়ে গবেষণা করে প্রায় দুশো পনেরোটি প্রজাতির অর্কিড পুনরুদ্ধার করেছেন কে. এস. মণিলাল। ফুলের উৎস, বিবর্তন এবং ফুলের বিভিন্ন অংশের শরীরবৃত্তীয় ক্রিয়ার গবেষণার ফল তিনি প্রায় পঁয়তাল্লিশটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। কোজিকোডে থাকাকালীন তিনি তেজস্ক্রিয়তা-প্রতিরোধী ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনদের নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এই গবেষণাকালে দুই প্রজাতির সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন আবিষ্কার করেন ড. মণিলাল যেগুলি তীব্র তেজস্ক্রিয়তায় অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। মণিলাল তাঁর সম্পূর্ণ কর্মজীবনে প্রায় একশো আটানব্বইটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।

মণিলালের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিনতম কর্মকাণ্ডটি ছিল ‘হর্টাস মালবারিকাস’ বইটির অনুবাদ। সপ্তদশ শতাব্দীর হেনড্রিক ভ্যান হ্রিডের লেখা ‘হর্টাস মালবারিকাস’ বইটি ভারতের অন্যতম হটস্পট পশ্চিমঘাট পর্বতের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে লেখা অত্যন্ত মূল্যবান একটি বই। বইটি মূলত ল্যাটিন ভাষায় রচিত হওয়ার দরুণ বইটির বিশাল জ্ঞানভান্ডার সমগ্র বিশ্বের কাছে অজ্ঞাত ছিল। অধ্যাপক মণিলাল বইটির ইংরেজি ও মালয়ালাম ভাষায় অনুবাদ করার ফলে বইটি সকলের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তিনি শুধু বইটির অনুবাদই করেননি, তার সঙ্গে বইটিতে উল্লিখিত চার হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ পুনরায় আবিষ্কার ও যাচাই করেছিলেন এবং সেই সঙ্গে নিজের গবেষণায় যোগ করেছিলেন উদ্ভিদগুলির ঔষধি-গুণ। বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রবন্ধের আকারে ১৯৮০ সালে আমস্টারডাম ও দিল্লি থেকে ‘বোটানি অ্যান্ড হিস্ট্রি অফ হর্টাস মালবারিকাস’ (Botany & History of Hortus Malabaricus) নামে প্রকাশিত হয়। ১৯৯৬ সালে বইটির মালয়ালাম অনুবাদ ‘এ স্টাডি অন দ্য রোল অফ ইট্টি অচুদান ইন দ্য কমপাইলেশন অফ হর্টাস মালাবারিকাস’ (A study on the role of Itty Achudan in the compilation of Hortus Malabaricus)’ নামে কোজিকোড থেকে প্রকাশিত হয়।

১৯৯০ সালে উদ্ভিদবিজ্ঞানে আগ্রহী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে কে. এস. মণিলাল প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাঞ্জিওস্পার্ম ট্যাক্সোনোমি’ (Indian Association for Angiosperm Taxonomy বা IAAT)। ডক্টর মণিলালের প্রধান সম্পাদনায় ডাচ্ বিজ্ঞানী এইচ. ভি. হ্রিডি-র নামানুসারে IAAT-এর পক্ষ থেকে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ জার্নাল ‘হ্রিডিয়া’ (Rheedea) প্রকাশ করা শুরু হয়। অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহারে অগ্রগতির জন্য তিনি কালিকট বিশ্ববিদ্যালয় ‘বায়োমাস রিসার্চ সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৯ সালে অধ্যাপক মণিলাল ‘বোটানিক্যাল সোসাইটি অফ ইণ্ডিয়া’র সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।

ডক্টর মণিলাল উদ্ভিদবিদ্যা ও শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যার উপর বেশ কয়েকটি মূল্যবান বই লিখেছিলেন যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ফ্লোরা অফ সাইলেন্ট ভ্যালি ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্টস অফ ইণ্ডিয়া’ (১৯৮৮), ‘ইন্টারপ্রিটেশন অফ ভ্যান হ্রিডি’স হর্টাস মালাবারিকাস’ (১৯৮৮)’, ‘ট্যাক্সোনমি অ্যাণ্ড প্লান্ট কনজারভেশন’ (১৯৯৬) এবং ‘অর্কিড মেমোরিজ: এ ট্রিবিউট টু গুনার সিডেনফাডেন’ (Orchid Memories : A tribute to Gunnar Seidenfaden, ২০০৪) ইত্যাদি। অধ্যাপক মণিলালের দীর্ঘ চল্লিশ বছরের সাধনার ফলে ২০০৩ সালে ‘হর্টাস মালবারিকাস’-এর সম্পূর্ণ বারো খণ্ড ইংরেজিতে প্রকাশ পায় এবং ২০০৮ সালে বইটির সম্পূর্ণ অংশই পুনরায় মালয়ালাম ভাষায় প্রকাশিত হয়।

অধ্যাপক মণিলাল তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে কৃতিত্বের সুবাদে নানা সময়ে বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৯০ সালে ইণ্ডিয়ান বোটানিক্যাল সোসাইটি তাঁকে ‘বিশ্বম্ভরপুরী পদক’ দ্বারা সম্মানিত করে। ১৯৯৮ সালে IAAT থেকে ‘ওয়াই. ডি. ত্যাগি স্বর্ণপদক’ ( Y. D. Tyagi Gold Medal) লাভ করেন কে. এস. মণিলাল। তারপর ২০০৩ সালে ভারত সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে ‘জানকী আম্মাল জাতীয় পুরস্কার’-এ ভূষিত হন তিনি। উদ্ভিদবিদ্যা ও শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যায় অসাধারণ অবদানের জন্য ডক্টর মণিলাল ২০১২ সালে নেদারল্যাণ্ডের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘দ্য অর্ডার অফ অরেঞ্জ-নাসাউ (The Order of Orange-Nassau)’ লাভ করেন। ২০২০ সালে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে অধ্যাপক এবং গবেষক কে. এস. মণিলাল ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার অর্জন করেন।

বর্তমানে স্ত্রী জ্যোৎস্না দেবীর সহিত কোজিকোড়ে বসবাস করেন কে. এস. মণিলাল। কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে নিরন্তর বিজ্ঞানচর্চায় এখনও তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।