ইতিহাস

কৌলীন্য প্রথা

কি ছিল এই "কৌলীন্য প্রথা"?

সম্মান লাভার্থে প্রজারা সৎপথে চলবে, এই উদ্দেশ্যে বাংলার সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন কৌলিন্য প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন। শ্রোত্রিয়দের মধ্যে যাঁরা নবগুণবিশিষ্ট ছিলেন, বল্লাল তাঁদের কুলীন উপাধি দিয়েছিলেন। এই নবগুণগুলো হল : আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থ দর্শন, নিষ্ঠা, শান্তি, তপ ও দান। এগুলি 'কুল লক্ষণ' নামে পরিচিত।

কৌলিন্য প্রথার সৃষ্টি সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন কুলশাস্ত্রে বিভিন্ন মত দেখা যায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামগতি তর্করত্ন প্রভৃতি বিজ্ঞ রাঢ়ীয় পন্ডিতেরা বল্লাল সেন কেই কৌলিন্যের সৃষ্টিকর্তা বলেছেন। অথচ কোন কোন রাঢ়ীয় কুল শাস্ত্রে ধরাধর কর্তৃক রাঢ়ীয় শ্রোত্রিয় মধ্যে কুল মর্যাদা সৃষ্টি দেখা যায়।বাচস্পতি মিশ্র কৃত কুল শাস্ত্রের সাথে বারেন্দ্র কুল শাস্ত্রের কিছু ঐক্য আছে। তবে, বল্লাল সেনকেই কৌলিন্য প্রথা চালু করার মূল হোতা বলে অধিকাংশ মত সমর্থন করে। বল্লাল সেন দ্বারা কৌলীন্য প্রথা সৃষ্টির আসল কারণ কি জানতে হলে এখানে পড়ুন।

 

কুলীন পরামানিক উপাধি প্রাপ্তি - বৈদ্যদের মধ্যে যারা ধার্মিক ও গুণবান এবং কায়স্থদের মধ্যে যারা শ্রোত্রিয়দের পরিচারক-সন্তান তারা কুলীন উপাধি পেয়েছিলেন। এভাবে ঘোষ, বসু, গুহ ও মিত্র বংশীয়রা কায়স্থরা কুলীন হল; তিলী, তাঁতি, কামার, কুমোর প্রভৃতি সৎশূদ্রদের গুণ ও সঙ্গতি দেখে বল্লাল তাদের শ্রেষ্ঠ লোকদের কুলীন করেছিলেন, এরাই মানী বা পরামানিক নামে পরিচিত হয়।

 

রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ - শান্ডিল্য গোত্রীয় বন্ধ্যঘাটিগ্রামবাসী, কাশ্যপ গোত্রীয় চট্টগ্রামবাসী, ভরদ্বাজ গোত্রিয় মুখুটিগ্রামী, সাবর্ণী গোত্রীয় গাঙ্গুলি ও কুন্দলাল গ্রামী এবং বাৎস্য গোত্রীয়, ঘোষাল, কাঞ্জিলাল এবং পুতিতুন্ড এই আট গ্রামীরা রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ।

 

কায়স্থ কুলীন - বঙ্গরাজ দেবপাল গৌড় নগর থেকে কয়েক ঘর কায়স্থ এনে বঙ্গদেশে স্থাপন করেন। তাদের সঙ্গে তিনি বিবাহ আদান প্রদান করে নিজে তাদের সমাজে মিলিত হন। সেই বঙ্গজ কায়স্থরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে বঙ্গজ ও দক্ষিণ রাঢ়ী কায়স্থ বলে পরিগণিত হয়। এদেরকে বল্লাল সেন কৌলিন্য মর্যাদা দেন।

 

রাঢ়ী বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ - বল্লাল সেন কনৌজের ভট্টশালীগ্রাম-নিবাসী শ্রোত্রিয়দের বসবাসের অসুবিধা দূর করার জন্য নিজের প্রকান্ড রাজ্যের নানা স্থানে পাঠিয়ে তাঁদের ভরণ-পোষণের যোগ্য ব্রহ্মত্র দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে একশ ঘর গঙ্গার বাম পারে বরেন্দ্রভূমিতে বাসস্থান পেয়ে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ নামে খ্যাত হন আর ছাপ্পান্ন ঘর গঙ্গার অপর পারে রাঢ়দেশে ব্রহ্মত্র লাভ করে রাঢ়ী ব্রাহ্মণ আখ্যা প্রাপ্ত হন।রাঢ়ী ও বারেন্দ্র বিভাগ ব্রাহ্মণ ছাড়াও বৈদ্য, কায়স্থ ও অধিকাংশ অপর জাতীর মধ্যেও ছিল।

 

কৌলিন্য প্রথার মর্যাদা - কৌলিন্য মর্যাদা বাঙালীদের জীবনাধিক গুরুতর গণ্য ছিল।অনেকে সর্বস্ব বিক্রয় করে কুলমর্যাদা রক্ষা করতেন। কেউ কেউ অশীতিপর বৃদ্ধের সাথে সপ্তবর্ষীয় কন্যার বিবাহ দিয়ে কুল বাঁচাতেন।এমনকী রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের মধ্যে অনেক সময় কুল মর্যাদা রক্ষায় ধর্মশাস্ত্রের বিধান লঙ্ঘিত হত এবং পঞ্চাশ বছর বয়স্কা কুমারীকে দশবর্ষীয় বালকের সাথে নামমাত্র বিবাহ দিয়ে কুলমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হত।পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অবধি সুদীর্ঘ চারশ বছর বল্লালী কুলমর্যাদাই উচ্চ শ্রেণীর বাঙালীদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল।

 

কৌলিন্য পরিবর্তন - বল্লাল নিয়ম করেছিলেন যে, প্রতি ছত্রিশ বছরের শেষে এক এক বার বাছাই হবে, এবং গতে গুণ ও কর্ম অনুযায়ী কুলীন ও অকুলীন নির্বাচিত হবে।সুতরাং কুলমর্যাদা লাভার্থে সবাই ধার্মিক ও গুণবান হতে চেষ্টা করবে। বল্লালের সেই আশা প্রথম প্রথম সফল হলেও লক্ষণ সেন কৃত ব্যবস্থায় তা বংশানুক্রমিক হয়ে গিয়ে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

কৌলীন্য প্রথা তৎকালীন বঙ্গ সমাজে কি প্রভাব ফেলেছিল তা আরও বিশদে জানতে এখানে দেখুন।

 

কৌলীন্য প্রথা বনাম শাস্ত্র ও পুরানঃ বাঙালি সমাজ, ইতঃপূর্বে ছিল নির্ধন; তাদের মধ্যে উঁচু-নিচু বলে কিছু ছিল না। সেন যুগে পৌঁছে বাঙালির মধ্যে দেখা দিল স্পষ্ট দুই বর্ণ-কুলীন ও ইতর। উৎপাদক শ্রমজীবী হল ইতর এবং শ্রমজীবীর উৎপাদন আত্মসাৎকারী হল উচ্চবর্ণ কুলীন। বর্ণ হিসেবে কুলীনের জন্য বরাদ্দ থাকল অধ্যয়ন ও লেখাপড়াভিত্তিক সব পেশা আর নিম্নবর্ণ বা নিচুজাতের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হল কৃষি ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর পেশা। শুধু তাই নয়, অধ্যয়ন ও লেখাপড়া তাদের জন্য করা হল নিষিদ্ধ। কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তন দ্বারা বাঙালি সমাজ স্পষ্ট দুদলে ভাগ হয়ে গেল। অথচ হিন্দু শাস্ত্রে বা ধর্ম গ্রন্থে বর্ণ প্রথা এতটা প্রকট ছিল না। বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা থাকলেও তা জন্মসূত্রে ছিল না - এরকম অনেক উদাহরণ আছে যেখানে একজন অব্রাহ্মণ বংশে জন্ম লাভ করেও পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণ হয়েছেন - এ সম্বন্ধে আরও জানতে এখানে দেখুন।

 

কৌলীন্য প্রথার কুফলব্রাহ্মণেরা কৌলীন্য প্রথার দোহাই দিয়ে সামাজিক সুবিধা আদায় করতে লাগলেন। ক্রমে এই কৌলীন্য প্রথা থেকে সৃষ্টি হল কন্যাকে উচ্চবর্নে বিবাহ দেবার রীতি, যার অবশ্যম্ভাবী ফল হল বহুবিবাহ। এক একজন কুলীন ব্রাহ্মণ বহু কন্যার পাণিগ্রহন করতে লাগলেন। এ ছাড়াও জাত-পাত বৈষম্য ইত্যাদি ক্রমেই সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করেছিল। কৌলীন্য প্রথার কুফল সম্বন্ধে বিশদে জানতে এখানে দেখুন। বাংলায় কৌলিন্য প্রথা কিছু নির্দিষ্ট সামাজিক-রাজনৈতিক লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, আঠারো এবং উনিশ শতকে এসে এর দীর্ঘস্থায়ী রূপ যেমন হয়ে পড়ে বিকৃত তেমনি দুর্বল। এটি সমাজের শুধু ব্যাধিতেই পরিণত হয় নি, বরং এটি বাংলার সমস্ত সামাজিক অবস্থাকে বিকৃত করে তোলে। বিদ্যাসাগরকে এ সামাজিক ব্যাধির সাথে অক্লান্ত সংগ্রাম করে যেতে হয়েছিল।

 

পরিশেষে, মানুষের সৃষ্ট এ জাত ও পদবী বৈষম্য একজন মানুষের সাথে অন্য মানুষের মধ্য দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। এতে হিন্দু সমাজের হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতি। ধর্মান্তরিত হয়েছে অসংখ্য নিম্নশ্রেণী ও বর্ণের হিন্দুরা। রাস্তায় যেমন সকল যানবাহন একই গতিতে চলতে পারে না, তেমনি সমাজের সকল মানুষও সম আর্থিক সচ্ছলতায় চলতে পারে না। তাই সমাজের কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ দারোয়ান, কেউ বা সুইপার। নিজের যোগ্যতার উৎকর্ষ সাধন করতে পারলে একজন কর্মকর্তা যেমন পদন্নোতি পান, তেমনি আমরা নিজ নিজ বর্ণ পরিবর্তন না করেও স্ব স্ব বর্ণে দক্ষতা অর্জন করে উচ্চাসনে বসতে পারি। কোন বর্ণ উঁচু আর কোন বর্ণ নিচু ভগবান শ্রী কৃষ্ণ গীতায় তা কোথায় উল্লেখ করে নি। সুতরাং, একজন মানুষ জন্মসূত্রে নয়; বরং, তার কর্মগুণে স্বীকৃতি লাভ করে।

 

তথ্যসূত্র


  1. অতুল সুর, বাংলার সামাজিক ইতিহাস, কলকাতা, ১৯৭৬।
  2. নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ভারতীয় জাতি বর্ণ প্রথা, কলকাতা, ১৯৮৭।
  3. রমেশচন্দ্র মজুমদার, বঙ্গীয় কুলশাস্ত্র, কলকাতা, ১৯৮৯।
  4. নগেন্দ্রনাথ বসু, বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস, ২ খন্ড, কলকাতা।
  5. বিনয় ঘোষ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
  6. বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস, দুর্গাচন্দ্র সান্যাল, মডেল পাবলিসিং হাউস

১ Comment

1 Comment

  1. Pingback: কৌলীন্য প্রথার কুফল | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!