বিবিধ

খৈরি একটি বাঘের নাম

‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। কিন্তু যদি সেই বন্যই বাড়ির প্রিয়তম শিশুর মতোই বড়ো হয়? যদি তার গা থেকে একেবারে মুছে যায় বন্য হিংসার মাংসল গন্ধ? চিড়িয়াখানায় খাঁচার ভিতরে বাঘের গর্জন, সিংহের দাপুটে হাঁটাচলা দেখে আমরা অনেকেই শিহরিত হই, কিন্তু ভাবুন তো যদি সেই বন্য হিংস্র বাঘটি কারো বাড়িতে পোষা কুকুর বিড়ালের মতো মানুষ হয়, তাহলে সত্যই বিস্মিত হতে হয়। বাঘ আবার পোষ মানে নাকি! হ্যাঁ মানে, মেনেছে। তারপর করুণ নিয়তির ফেরে সামান্য এক বুনো কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। সেই ঘরে পোষা বাঘের আদরের নাম খৈরি (Khairi)। ১৯৭৪-এর অক্টোবর মাসের কোনো এক দিনে সিমলিপাল ফরেস্ট রিজার্ভের ডিরেক্টর সরোজ রাজ চৌধুরীর কাছে সেই বাঘকে ওড়িশার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিল গ্রামবাসীরা, বাঘটি তখনও শিশু। তারপর ইতিহাস তৈরি করে দিল সেই ব্যাঘ্র শাবক খৈরির গৃহস্থ হয়ে ওঠার কাহিনী।

গল্পের শুরু সেই ১৯৭৪ সালে। ৫ অক্টোবর ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার অন্তর্গত সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভের ফিল্ড ডিরেক্টর সরোজ রাজ চৌধুরীর কাছে গ্রামবাসীরা নিয়ে আসে একটি ব্যাঘ্রশাবক। সেই টাইগার রিজার্ভের মূল অঞ্চল থেকে খারিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে খৈরি নদীর ধার থেকে উদ্ধার করে সেই স্ত্রী শাবকটিকে। প্রথমে তারা তিনটি শাবক সহ এক বাঘিনীকে লক্ষ করেছিলেন নদীর ধারে আর সেই সময় ক্যানেস্তারা, ড্রামের শব্দে ভীত বাঘিনী তাঁর দুইটি শাবককে নিয়ে নদীর ওপারে পালিয়ে যেতে সমর্থ হলেও শেষ শাবকটিকে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয় সেই বাঘিনী। ফলে অসহায় শাবকটিকেই উদ্ধার করে এনেছিল গ্রামবাসীরা আর তারপর থেকে দীর্ঘ সাত বছর ধরে নিজের কাছেই পরম যত্নে খৈরিকে বড়ো করে তোলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্যপ্রাণী সংরক্ষক সরোজ রাজ চৌধুরী। খৈরি নদীর ধার থেকে তাকে পাওয়া যায় বলে নদীর নামেই তার নাম রেখেছিলেন তিনি। খৈরি সেই থেকে যোশিপুরে সরোজবাবুর সরকারি বাংলোয় তাঁর পরিবারেরই একজন সদস্য হয়ে ওঠে। সরোজবাবুর খুড়তুতো বোন নীহার নলিনীর সঙ্গেও খৈরির সখ্যতা গড়ে ওঠে। পাঁঠার মাংস আর গুঁড়ো দুধ খেয়ে তাঁদের বিছানার পাশে শুয়েই ঘুমাতো খৈরি, কখনো বা খেলতো তাদের সাথেই। সরোজবাবুর পোষা কুকুর ব্ল্যাকির সঙ্গেই বড়ো হচ্ছিল খৈরি। এমনকি নানা জায়গা থেকে সরোজবাবু বন্য বিড়াল কিংবা হরিণ শাবক উদ্ধার করে নিজের দায়িত্বে লালন-পালন করতেন, খৈরি তাদের সঙ্গেও থাকতে পছন্দ করতো। তিনি লক্ষ করেছেন, হরিণটিকে বা কুকুরকে যখন নীহার খাইয়ে দিতো, সে সময় ঈর্ষান্বিত হতো খৈরি। সরোজ রাজ চৌধুরী খুব কাছ থেকে খৈরির আচার-ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করতেন, বিশেষত বাঘেদের ফেরোমোন নিঃসরণের পদ্ধতি কিংবা বাঘেদের মিলনের সময়কালীন আচরণ ইত্যাদিও পর্যবেক্ষণ করতেন। পরবর্তীকালে খৈরিকে নিয়েই বিখ্যাত বিজ্ঞানী রতনলাল ব্রহ্মচারী ফেরোমোন নিঃসরণ সংক্রান্ত গবেষণা করেছিলেন এবং প্রাণীদের ফেরোমোনে বিশেষ তীব্র সুবাসের কারণ হিসেবে ২-এপি নামের একটি রাসায়নিক যৌগ অণুর উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। খৈরির সঙ্গে পরিচয়ের বহু আগে থেকেই সরোজ রাজ বাঘের পায়ের ছাপ দেখে বাঘগণনার পদ্ধতি চালু করেছিলেন, ২০০৪ সাল পর্যন্ত ভারতে এই পদ্ধতিতেই বাঘ গণনা করা হতো। ১৯৭২ সালে ভারতে প্রথম এই পাগমার্ক মেথডোলজির সাহায্যে বাঘ গণনা করা হয়। তাছাড়া তাঁরই উদ্যোগে ফরেস্ট অফিসারদের বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে আরো দক্ষ করে তুলতে ‘প্রোজেক্ট টাইগার’ নামে একটি প্রকল্প চালু করেছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে এই খৈরিই হয়ে ওঠে সরোজ রাজ চৌধুরীর অতিপ্রিয় বাঘিনী। তবে শুধুই ভালোবাসার খাতিরে খৈরির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খৈরিকে নিয়ে গবেষণার জন্য উপযুক্ত দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন তিনি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবহার সকলই তিনি জানতেন। খৈরিকে নিয়ে তিনি চলে যেতেন জঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশে আর তারপর সেখানে সেই বাঘিনীর আচার-আচরণ নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন সরোজ রাজ। বাঘ তো অনেকেই পোষে, কিন্তু তাঁর মতো এত নিপুণভাবে সমস্ত তথ্য লিপিবদ্ধ করার মানসিকতা অধিকাংশ মানুষেরই থাকে না। বাঘ পোষার পাশাপাশি তিনি খৈরিকে নিজের গবেষণার উপাত্ত হিসেবে স্থির করেছিলেন। এমনকি খৈরি সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণও ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। বিখ্যাত ভারতীয় পক্ষীবিদ সালিম আলির সাহায্যে ও পরামর্শে সরোজ রাজ চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘খৈরি ওয়াইল্ড লাইফ ইন্সটিটিউট’, কিন্তু কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহে ও অবহেলায় এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি। ১৯৪৯ সালে ওড়িশা সরকারের অধীনে ফরেস্ট অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালে তিনিই প্রথম ওয়াইল্ড লাইফ কনসার্ভেশন অফিসার পদে উন্নীত হন। রণথম্বোরের অভয়ারণ্য থেকে গ্রামবাসীদের সরিয়ে পুনর্বাসন প্রকল্পে বিখ্যাত ফতেহ্‌ সিং রাঠোরের তত্ত্বাবধায়ক ও প্রশিক্ষক ছিলেন সরোজ রাজ চৌধুরী। ‘প্রজেক্ট টাইগার’-এর অধীনে রণথম্বোরের জঙ্গলে তাঁরই পরিকল্পনায় ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে গাড়ির শব্দে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবন যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেইভাবে জঙ্গলের ভিতরে রাস্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১৯৮৩ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সরোজ রাজ চৌধুরী ভারতের শ্রেষ্ঠ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত হন। সরোজ রাজের সেই বাংলোয় অন্যান্য আরো পশু-পাখির সঙ্গে একত্রে একটি বিছানায় নীহার নলিনীর পাশে শুয়ে থাকতো খৈরি। শুনলে আশ্চর্য লাগে, সরোজবাবুর সাহচর্যে থাকতে থাকতে সে সত্যই পোষ্য হয়ে উঠেছিল, জঙ্গলের মধ্যে তাকে ছেড়ে দিয়ে আসলেও খৈরি ঠিক বাড়ি ফিরে চলে আসতো। বাড়িটাই যেন তার পছন্দের বাসস্থান হয়ে উঠেছিল। স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও ঠিক এই কারণে খৈরি কখনো শাবক প্রসব করেনি। সরোজবাবু বুঝতে পারতেন যে জঙ্গলে অন্য পুরুষ বাঘের গায়ের গন্ধ পেয়ে খৈরির মধ্যে মিলনের আকাঙ্ক্ষা জাগতো, কিন্তু মানুষের সঙ্গে বড়ো হওয়ার কারণে জঙ্গলের বন্য প্রবৃত্তিগুলি তার মধ্যে একেবারেই বিকশিত হয়নি। ফলে জঙ্গলে ছেড়ে এলেও সে ঠিক বাড়ি চলে আসতো।

কিন্তু ১৯৮১ সালে ঘটে গেল এক করুণ মর্মান্তিক ঘটনা। দিল্লিতে একটি সমাবেশে গিয়েছিলেন সরোজ রাজ চৌধুরী আর ঠিক সেই সময়েই একটি বন্য হিংস্র কুকুর বাংলোর মধ্যে কোনোভাবে ঢুকে পড়ে আর তাকে দেখেই খৈরি উন্মত্ত হয়ে ওঠে। উভয়ের মধ্যে সংঘাত চলাকালীন খৈরির গায়ে কামড় বসিয়ে দেয় কুকুরটা। কুকুরটাকে মেরে ফেললেও ততক্ষণে যা হওয়ার ঘটে গেছে খৈরির দেহে। যথারীতি রেবিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে খৈরি। যন্ত্রণায় ধীরে ধীরে তার চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়। সরোজবাবু যখন সংবাদ শুনে ফিরে আসেন, তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে। রেবিস-প্রতিষেধক দিয়েও তখন কোনো কাজ হবে না। খৈরির সেই অসহ যন্ত্রণা দেখতে না পেরে বাধ্য হয়ে অতিমাত্রায় চেতনানাশক প্রয়োগ করে খৈরিকে যন্ত্রণা থেকে চিরতরে মুক্তি দেন সরোজ রাজ। ১৯৮১ সালে মারা যায় খৈরি। বাংলোর সামনের মাটিতেই কবর দেওয়া হয় খৈরিকে। মাত্র সাতটি বছর মানুষের মাঝে বড়ো হয়ে খৈরি সত্যই তার বন্যতা হারিয়ে ফেলেছিল। সরোজবাবুর কাছে খৈরি ছিল নিজের মেয়ের থেকেও বেশি। খৈরির মৃত্যু তাঁকে যেন সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় দগ্ধ করলো। ঠিক এক বছর পরেই অবসর নেবেন সরোজ রাজ। কিন্তু না, তার এক মাস আগেই অফিসে থাকাকালীন হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন সরোজ রাজ চৌধুরী। অনেকেই মনে করেন, খৈরির চলে যাওয়া তিনি সত্যই মন থেকে মেনে নিতে পারেননি আর সেটাই তাকে মানসিকভাবে অত্যন্ত আহত করেছিল। তাই জীবনের মায়ায় বেশিদিন নিজেকে বেঁধে রাখতে পারেননি তিনি। মনে পড়ে যায় বিখ্যাত আন্তর্জাতিক ছবি ‘দ্য লাইফ অফ পাই’-এর সেই ছোটো ছেলেটির কথা যে অনন্ত সমুদ্রের বুকে একটি নৌকাতে হিংস্র বাঘের সঙ্গে থাকতে থাকতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবশেষে তাকে পোষ মানিয়েছিল, যদিও সে ছবিতে অস্তিত্বের সংগ্রামই ছিল মুখ্য, কিন্তু বাঘ আর মানুষের এমন মেলবন্ধন সরোজ রাজ চৌধুরী আর খৈরির গল্পকেই স্মরণ করায়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।