বিজ্ঞান

দুধে লেবুর রস দিলে দুধ কেটে যায় কেন

 দুধে লেবুর রস দিয়ে দুধ থেকে ছানা করার ঘটনা আমাদের বাঙালী বাড়িতে হামেশাই ঘটে। ছোটবেলা থেকেই আমরা দেখে আসছি মা, ঠাকুমাদের এই এক পদ্ধতিতে দুধ কাটাতে। আজকাল অবশ্য অনেকেই ভিনিগার, সাইট্রিক অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ল্যাকটেট ইত্যাদি ব্যবহার করছেন। কিন্তু লেবুর রস দিলে দুধ কেটে যায় কেন – এটা কোনদিন ভেবে দেখেছেন? না জেনে থাকলে জেনে নিন এখানে।

দুধ কেটে যায় কেন তা বুঝতে একটু দুধের গঠন জেনে নিতে হবে।দুধে প্রায় ৮৮% জল থাকে। আর এই জলে মিশে থাকে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, মিনারেলস ও ভিটামিন। ফ্যাট হিসাবে মূলত ট্রাইগ্লিসারাইড থাকে। প্রোটিনের মধ্যে কেসিনই বেশী থাকে, বাকি কিছুটা অ্যালবুমিন ও গ্লোবিউলিন থাকে। কার্বোহাইড্রেট এর মধ্যে ল্যাকটোজ থাকে। খনিজ উপাদানের মধ্যে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম এবং জল ও তেলে দ্রবীভূত ভিটামিন থাকে। এই উপাদানগুলোর মধ্যে ফ্যাটের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা ও জল মিলে  ইমালসন (emulsion)  তৈরি করে। ইমালসন এক ধরনের দ্রবণ যেখানে দ্রাব কখনও থিতিয়ে পড়ে না। দুগ্ধ প্রোটিন কেসিন এই কোলয়ড দ্রবণে ক্যালসিয়াম-ক্যাসিনেট মিশেলস (calcium-caseinate micelles)  আকারে অবস্থান করে। বাকি উপাদানগুলো যেমন ল্যাকটোজ, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি দ্রবণে দ্রবীভূত থাকে। ফ্যাটে দ্রবীভূত ভিটামিনগুলো ফ্যাট কণার মধ্যে ও জলে দ্রবীভূত ভিটামিনগুলো জলীয় দ্রবণে দ্রবীভূত থাকে। দুধের pH এর মান 6.8। এই pH মানের জন্য ক্যালসিয়াম-ক্যাসিনেট মিশেলসগুলো স্থিতিশীল থাকে। এই ক্যালসিয়াম-ক্যাসিনেট মিশেলসের উপস্থিতির জন্যই দুধের রঙ সাদা হয়। এছাড়া দুধের বাফার বা প্রতিরোধক ধর্ম আছে। এই কেসিনের ছোটো দলগুলো কোনো রকম বাঁধন ছাড়াই ঘুরে বেড়ায়। এরা ঋণাত্মক আধানযুক্ত হওয়ায় পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। ফলে দুধের সর্বত্র একই রঙ ও ঘনত্ব দেখায়।

লেবুতে সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে। এর pH এর মান 3.5 অর্থাৎ তীব্র অম্লধর্মী। লেবুর রস গরম দুধে দিতে থাকলে লেবুর রসের সাথে দুধের রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়। ঠিক পরিমাণ মতো লেবুর রস দিলে  ক্যালসিয়াম-ক্যাসিনেট মিশেলস এর আধান ধর্ম পাল্টে যায় এবং ঋণাত্মক আধান থেকে আধান শূন্য হতে থাকে। এর ফলে কেসিনগুলি আর পরস্পরকে বিকর্ষণ করে না ফলে কেসিন ও বাকি কিছু উপাদান দলা পাকিয়ে জমা হতে থাকে। এই ভাবেই ছানার জন্ম হয়। এই রাসায়নিক বিক্রিয়াটি তাপের উপস্থিতিতে  দ্রুত হয়, সেজন্য দুধ ফোটানোর সময় লেবুর রস দিলে তাড়াতাড়ি দুধ কেটে ছানা তৈরি হয়। ঠান্ডা দুধে লেবুর রস দিলে একই বিক্রিয়া ঘটে কিন্তু তা এতই ধীরে ধীরে ঘটে যে বোঝা যায় না। লেবুর রস ছাড়া অন্যান্য রাসায়নিক দিলেও একই ভাবে ছানা তৈরি হয়। তবে বিভিন্ন রাসায়নিক দিলে ছানার রঙ, স্বাদ ও কোমলতা (softness) আলাদা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।