ইতিহাস

মানভূম ভাষা আন্দোলন ও রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন

স্বাধীনতার পর মানভূম ভাষা আন্দোলন আরও তীব্রতা পায় এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিহার-পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হয়ে ওঠে। তার ফল হয় মানভূম থেকে পুরুলিয়া জেলা সৃষ্টি। এখানে মানভূম ভাষা আন্দোলন ও রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন এর ভূমিকা সম্বন্ধে বিশদে জেনে নেব।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন সংগঠন ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি জানাতে থাকে। এর মধ্যে,  ৬৭ দিন অনশনের পর অন্ধ্রপ্রদেশে রামালু’র মৃত্যু হলে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের দাবিতে গোটা দেশ সোচ্চার হওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয় ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ফজল আলিকে চেয়ারম্যান করে সর্দার পানিক্কর ও হৃদয়নাথ কুন্জরুকে নিয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন বা States Re-organisation Commission গঠন করতে। মানভূম আদি-অকৃত্রিম বাংলাভাষী বাঙালির এবং তার স্থান যে কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই হওয়া উচিত, বিহারে নয়, তা বোঝাতে মানভূম বাঙালি সমিতি, সংযুক্ত প্রগতিশীল ব্লক, মানভূম নাগরিক সঙ্ঘ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি, হিন্দু মহাসভা, জনসঙ্ঘ, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ও আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সীমা কমিশনের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়। লোকসেবক সঙ্ঘের ১২ জন প্রতিনিধি সীমা কমিশনের দুই সদস্য কুন্জরু এবং পানিক্করকে হাজার পৃষ্ঠার স্মারকলিপি ও সাতটি ট্রাঙ্ক ভরতি দলিল দস্তাবেজ ও বিভিন্ন নিদর্শন জমা দেন। ঐ স্মারকলিপি ও অন্যান্য উপকরণ মানভূমের বাংলাভাষা শিল্প-সংস্কৃতি ও শিক্ষার এক অমূল্য দলিল। যাতে স্পষ্ট প্রতিভাত, বাংলা ভাষার উষ্ণ শোণিত পশ্চিমবঙ্গ ও মানভূমের ধমনীতে সমানভাবে বহমান। দামোদর ভিত্তিক অবাস্তব সীমা নির্ধারণে ধানবাদ ও ঝরিয়া মানভূম থেকে কর্তিত হল। সুপারিশ করা হল চাষ, চন্দনকিয়ারি ও পরে চান্ডিল, ইচাগড়, পটমদা মানভূম ছেড়ে ধানবাদ ও সিংভূমে যুক্ত হবে। বিহারি আগ্রাসনে এই অঞ্চলগুলোর বিহারে অন্তর্ভুক্তি-করণে অনুঘটকের কাজ করল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীপন্থের বেসামাল হিন্দি অনুরাগ। সীমা কমিশনের দুই সদস্যের মতদ্বৈতে (হৃদয়নাথ কুন্জরু ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন) এই রায় কখনওই সর্বসম্মত ছিল না। লোকসেবক সঙ্ঘ এবং আরও অনেকেই এই রায়ের বিরুদ্ধাচরণ করে।

মানভূম ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ শ্রী অতুল চন্দ্র ঘোষের সাথে ডা. বিধানচন্দ্র রায় ও অন্যান্যরা। ১৯৫০ এর দশকে আন্দোলন চলাকালীন তোলা ছবি।

মানভূম ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ শ্রী অতুল চন্দ্র ঘোষের সাথে ডা. বিধানচন্দ্র রায় ও অন্যান্যরা।

কংগ্রেস হাইকমান্ড, ডাঃ প্রফুল্ল ঘোষ, সুচেতা কৃপালণী, কৃষ্ণবল্লভ সহায় ও বিহার কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি প্রজাপতি মিশ্র মানভূমে বাঙালি অধ্যুষিত বাংলাভাষী অঞ্চলে হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গোড়া থেকেই ছিলেন নীরব দর্শক। প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বিধানচন্দ্র রায় ও অতুল্য ঘোষ লোকসেবক সঙ্ঘের সঙ্গে কোনওরকম আলোচনা না করে তৎকালীন বিহারি মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংহ ও রাজস্বমন্ত্রী কৃষ্ণবল্লভ সহায়ের সঙ্গে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে বাংলা-বিহার সংযুক্তির প্রস্তাব এনেছিলেন। বাংলা ভাষার লাগাতার অবমাননায় কংগ্রেস ভেঙে ১৯৪৮ সালের ১৪ই জুন ‘পাকবিকড়া’ গ্রামে লোকসেবক সঙ্ঘ জন্ম নিল। ১৯৫২’র সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হয় লোকসেবক সঙ্ঘ (শ্রীশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ভীমচন্দ্র মাহাত, নকুল সহিস, অতুল সিং সর্দার প্রমুখ)। মানভূম ভাষা আন্দোলনের বল্গাহীন চাপে কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হল West Bengal & Bihar Transfer of Territories Act: 1956 তৈরিতে। সীমা কমিশনের সুপারিশকে অগ্রাহ্য করে এই আইনকে বাস্তবায়িত করতে মানভূম জেলাকে পুনরায় তিন টুকরো করলো সরকার। চাষ ও চন্দনকিয়ারি থানা যুক্ত করে জেলা হিসেবে তাকে বিহারে জোড়া হল। দক্ষিণে চান্ডিল-ইচাগড়-পটমদাকে জোড়া হল বিহারের সিংভূমে। অবশিষ্ট ১৬টি থানা নিয়ে তৈরি হল পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা। খণ্ডিত পুরুলিয়া জেলা পশ্চিমবঙ্গে হস্তান্তরের সময় বিহার সরকার বিদ্বেষপূর্ণ ‘পোড়ামাটি নীতি’ অবলম্বন করে। কোর্টের যাবতীয় নথি, থানার অপরাধী তালিকা, কোর্টের আসবাব পুড়িয়ে দেওয়া হয় এমনকী সার্কিট হাউস থেকে ‘কমোডটিও’ খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এখনও চাষ, চন্দনকিয়ারি, ধানবাদ, চান্ডিল বা ইচাগড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হেঁটে বেড়ালে বাংলাভাষার সুমিষ্ট কথোপকথন কানে আসে, আজও সাঁঝে মেয়েরা সাঁঝবাতি জ্বালায়, জাওয়া-বীজ বপনের উৎসব পালন করে (নাচ গান পুজো পার্বণ সবই থাকে) টুসু পাতে (টুসু-র মূর্তি পূজো হয়, নাচ-গান, চতুর্দোলায় চাপিয়ে টুসুর শোভাযাত্রার বিসর্জন বের হয়), গুন গুন করে গায় টুসু গান:

হায় ভালোবাসা

আমার চলে গেল চাইবাসা

তথ্যসূত্র


  1. বর্তমান পত্রিকা, শ্রী মৃন্ময় চন্দ, ৫ ই জানুয়ারি ২০১৮ সাল।
  2. "ভাষা আন্দোলনে মানভূম", নন্দদুলাল আচার্য, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
  3. Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib - Nitish K Sengupta, Page 579।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!