বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে বিশদ আলোচনার অবতারণা করলে যে কয়েকজন রাজনীতিবিদের নাম এসে পড়বেই, তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন মশিউর রহমান (Mashiur Rahman)। তবে জনসাধারণের কাছে তিনি ‘যাদু মিয়া’ নামে বেশি পরিচিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগে, মুজিবুর রহমান নিজেও যখন আলোচনারত তখন মশিউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছিলেন। সর্বদলীয় সরকার গঠনেরও আহ্বান জানান তিনি। ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি—এই সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে মশিউর রহমানের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী পদটি বিলুপ্ত হয়ে গেলে মশিউর রহমান প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদার একজন মন্ত্রী হিসেবে রেল, সড়ক ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। স্বাধীনতার পর এই মশিউর রহমানই বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথ দেখিয়েছিলেন বলে মনে করেন অনেকে।
১৯২৪ সালের ৯ জুলাই ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতের রংপুরে বর্তমানে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার অন্তর্ভুক্ত খগাখড়ি বাড়ি গ্রামে মশিউর রহমানের জন্ম হয়। তাঁর পিতা ওসমান গনি ছিলেন একজন সম্মানীয় ব্যক্তি এবং তাঁর মায়ের নাম আল-হাজ্ব আবিউন নিসা।
নিজের গ্রামেরই খগাখড়ি বাড়ি স্কুল থেকেই মশিউরের প্রাথমিক শিক্ষার সূত্রপাত হয়েছিল। তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। সেখান থেকে তিনি গোপালগঞ্জের করোনেশন হাইস্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। সেই হাইস্কুল থেকে মশিউর আবার রংপুরের ডিমলায় অবস্থিত রাণী বৃন্দারাণী উচ্চ বিদ্যালয়ে চলে যান এবং সেখান থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য মশিউর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছিলেন।
মশিউর রহমান দুইবার বিবাহ করেছিলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী হলেন সাবেরা মশিউর রহমান এবং আরেকজন হলেন আমিনা মশিউর রহমান। মশিউরের পাঁচটি পুত্র এবং ছয়টি কন্যা সন্তান। তাঁর বড় ছেলে শফিকুল গনি স্বপন জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাষ্ট্রপতিত্বের সময় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া মশিউরের বড় মেয়ে মনসুরা মহিউদ্দিন দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অনেক অল্প বয়স থেকেই রাজনীতির অঙ্গনে ঢুকে পড়েছিলেন মশিউর রহমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বার্মায় (বর্তমানে মায়ানমার) গিয়ে আহত সেনাদের সেবার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। আবার ১৯৪০ সালে রংপুরে যখন প্লেগ মহামারীর আকার ধারণ করেছিল তখন তিনি নির্ভীকভাবে সেই পরিস্থিতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এমন মহান চরিত্রের একজন মানুষ হওয়ার জন্যই তাঁর নামে একটি অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে ‘যাদুর চর’।
১৯৪৬ সালে যখন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল চতুর্দিকে, তখন সমাজে এর ভয়ঙ্কর প্রভাব বিষয়ে মশিউর নিজের লেখা একটি মননশীল নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৪০-এর দশকের শেষদিকে তিনি ইয়াংম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব পাকিস্তান সংস্থার পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান ছিলেন। রংপুর ক্রীড়া সংস্থার সম্মানিত সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত মশিউর রহমান রংপুর কনজ্যুমারস কো-অপারেটিভ সোসাইটির নির্বাচিত সম্পাদক ছিলেন।
১৯৫০-এর দশকের শেষদিকে রংপুর বোর্ডের সর্বকনিষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এই পদে মোট দুইবার নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুব লীগ একটি যুব উৎসব কমিটি গঠন করেছিল, তার সভাপতিত্ব করেছিলেন মশিউর। সেই বছরই আবদুল হামিদ খান ভাসানী তাঁকে কাগমারী সম্মেলনের অনুষ্ঠানে আহ্বান জানান, যেখানে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯৬২ সালে মশিউর রহমান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৩ সালে সরকার বিরোধী আন্দোলনের জন্য তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়। ষাটের দশকের শেষদিকে মশিউর ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক পদে বসেন এবং আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে জোরালো দাবি তোলেন। ভাসানীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি জাতীয় পরিষদও ত্যাগ করেছিলেন। ১৯৬৯ সালে লায়েলপুরে কৃষক সম্মেলনে ইয়াহিয়া খানকে ‘গদ্দার’ বলবার অপরাধে মশিউরকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পল্টন ময়দানের একটি জনসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে তিনি সর্বদলীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রতীকী পতাকাও উত্তোলন করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরে আওয়ামী সরকার মশিউরকে গ্রেপ্তার করে কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে ১৯৭৪ সালে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭৪ সালের জুন মাসে আবার তিনি কারারুদ্ধ হন কিন্তু ১৯৭৫ সালে মুক্তি পেয়ে যান।
১৯৭৬ সালে ভারতের জল আগ্রাসনের প্রতিবাদে ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭৬ সালে ভাসানীর মৃত্যুর পর মশিউর ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টির চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তবে গণতন্ত্রের কথা চিন্তা করে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি জিয়াউর রহমানের পাশে এসে দাঁড়ান। ১৯৭৭ সালে প্রগতিশীল-দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তির সমন্বয়ে প্রথমে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ও পরবর্তীকালে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টির কাজ স্থগিত রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনে গুরুদায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে মশিউর ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী) একাংশ নিয়ে জিয়াউর রহমানের পরোক্ষ উদ্যোগে গঠিত জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যোগদান করেন, ফলে ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টির একপ্রকার বিলুপ্তি ঘটে। জোটবদ্ধ দলটির সঙ্গেই আরও কিছু দল জোট বেঁধে তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। মশিউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আহ্বায়ক কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে রংপুর-১ আসনে সফলভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন মশিউর এবং সংসদ সদস্য হন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত হয়ে যায়৷ ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে যখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল যখন তিনি রাষ্ট্রপতি হন তখন মন্ত্রী ব্যবস্থা পুনঃস্থাপিত হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের সময়ে ১৯৭৮ সালের ২৯ জুন মশিউর রহমান প্রধানমন্ত্রীর সমতুল্য পদমর্যাদার একজন সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের রেলপথ, সড়ক ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জিয়াউর রহমান মশিউর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করবার ইচ্ছে পোষণ করতেন কিন্তু ১৯৭৯ সালে মশিউর রহমানের মৃত্যু হলে শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা মনে করে থাকেন যে, মশিউর রহমানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। আজীবন বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন মশিউর রহমান ওরফে যাদু মিয়া।
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে মশিউর রহমানকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। বেশ কিছুদিন কোমায় ছিলেন তিনি, অবশেষে ১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ মাত্র ৫৪ বছর বয়সে এই প্রতিভাবান রাজনীতিবিদ মশিউর রহমানের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে তিনদিন রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়েছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান