ইতিহাস

মাইকেল জ্যাকসন

মাইকেল জ্যাকসন (Michael Jackson) একজন মার্কিন সঙ্গীত এবং নৃত্যশিল্পী যাঁকে একবিংশ শতাব্দীর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত(৩৫ কোটি) গানের অ্যালবামের রেকর্ডের অধিকারী হিসেবে গিনেস বুকেও নাম উঠেছে তাঁর। মাইকেল জ্যাকসনকে পপ সঙ্গীতের ‘রাজা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তাঁর আবিষ্কৃত নতুন নাচের ভঙ্গি ‘মুনওয়াক তাঁকে অমরত্ব প্রদান করেছে। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত ইন্টারনেট পরিষেবা অতিরিক্ত চাপে ভেঙে পড়ে। গুগল তার পরিষেবা তিরিশ মিনিট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠান একসঙ্গে ৩০০ কোটি মানুষ টিভিতে দেখেছিলেন যা ছিল এক নতুন রের্কড। তাঁর মৃত্যুর একযুগ পরেও শতাব্দীর সেরা পারফর্মার হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা সারা পৃথিবী জুড়ে সমানভাবে রয়েছে।

১৯৫৮ সালের ২৯ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা প্রদেশের গ্যারে নামক একটি গ্রামের এক আ্যফ্রো-আমেরিকান পরিবারে মাইকেল জ্যাকসনের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জোসেফ জ্যাকসন ছিলেন একটি ইস্পাত কারখানার শ্রমিক এবং একজন গিটারবাদক। তাঁর মা ক্যাথরিন জ্যাকসন সংসারের কাজের পাশে আংশিক সময়ের কাজ করতেন অর্থসংস্থানের জন্য। খুব ভালো পিয়ানো বাজাতে পারতেন তাঁর মা। তাঁদের দশটি সন্তানের মধ্যে মাইকেল ছিলেন অষ্টম সন্তান। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো সুযোগ হয়নি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁকে অর্থাভাবে কপিকল অপারেটারের কাজ করতে হয়। মাইকেলের ছোটোবেলা খুব একটা সুখকর ছিল না। জোসেফ তাঁর সব ছেলেদের নিয়ে ‘জ্যাকসন ফাইভ’ নামে একটি মিউজিক্যাল গ্রুপ তৈরি করেন যারা ‘মোটাউন’ নামে একটি মিউজিক্যাল কোম্পানির হয়ে বিভিন্ন ক্লাব ও বারগুলিতে সঙ্গীত পরিবেশন করতো। সেখানে মাইকেল মাত্র সাত বছর বয়স থেকে তাঁর বড় ভাইদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন এবং খুব তাড়াতাড়ি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। সঙ্গীতের ভাষা কাগজে লেখা বা পড়ার আগেই মাইকেল সম্পূর্ণটা নিজের গলায় তুলে নিতে পারতেন। এমনই অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন জ্যাকসন। বিখ্যাত রক অ্যাণ্ড রোল শিল্পী প্রিসলি মেরী ছিলেন মাইকেলের আদর্শ।

১৯৬৯ সালে ‘মোটাউন’-এর প্রতিষ্ঠাতা বেরী গর্ডির নজরে আসে ‘জ্যাকসন ফাইভ’ এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি তাঁদের লস অ্যাঞ্জেলেসে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। ১৯৭০ সাল থেকে মাইকেল ভাইদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করতে থাকেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ‘মোটাউন’-এর পক্ষ থেকে ‘জ্যাকসন ফাইভ’-এর হয়ে চারটি একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয় মাইকেলের। ‘গট টু বি দেয়ার’ (১৯৭২) ‘বেন’ (১৯৭২), ‘মিউজিক অ্যাণ্ড মি’ (১৯৭৩) এবং ‘ফরএভার মাইকেল’ (১৯৭৫) – এই অ্যালবামগুলিতে মাইকেলের প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। তাঁর গান সকলের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি বুঝতে পারেন তাঁর এককভাবে সাফল্য পাওয়ার জন্য ভাইদের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে কাজ করা প্রয়োজন। সেইমতো প্রখ্যাত মিউজিক প্রযোজক কুইন্স জোন্সের সহায়তায় মাইকেল তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘অফ দ্য ওয়াল’ প্রকাশ করেছিলেন ১৯৭৯ সালের ১০ আগস্ট। অ্যালবামটি সাড়া জাগানো সাফল্য লাভ করেছিল। দুই কোটি কপি বিক্রি হয় অ্যালবামটির। মাইকেল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং মার্কিন সঙ্গীতজগতের সর্বোচ্চ রয়্যালটি তিনি এই অ্যালবাম থেকে অর্জন করেন। মাইকেলের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘থ্রিলার’ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। এই অ্যালবামটি সারা পৃথিবীতে ১১ কোটি কপি বিক্রি হয় যা সর্বকালের রেকর্ড হয়ে থেকে যায়। শুধু আমেরিকাতেই দু কোটি নব্বই লক্ষ কপি বিক্রি হয়। এই অ্যালবামটি মাইকেল জ্যাকসনকে পপ সঙ্গীতজগতে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে এবং ‘কিং অফ পপ’ নামে পরিচিত হন মাইকেল। ‘থ্রিলার’-এর মধ্যে বিট হিট, বিলি জিন-এর মতো বিশ্ব প্রসিদ্ধ গানগুলি রয়েছে। এরপর শুধুই সাফল্য। ১৯৮৭তে প্রকাশিত ‘ব্যাড’ অ্যালবামের পাঁচটি গান বিলবোর্ডের এক নম্বরে স্হান পায়। ১৯৯১তে মাইকেল জ্যাকসনের ‘ডেঞ্জারাস’ অ্যালবাম মুক্তি পায় যেখানে তিনি ‘নিউ জ্যাক সুইং’ নামে একটি নতুন সংরূপকে পপুলার করে তোলেন। ‘ব্যাড’-এর তিন কোটি ষাট লক্ষ কপি বিক্রি হয় যা জ্যাকসনের সর্বাধিক বিক্রিত দ্বিতীয় অ্যালবাম। ১৯৯৫ সালে ‘হিস্টোরি’ নামে একটি প্রতিবাদী অ্যালবাম প্রকাশ করেন জ্যাকসন যার তিন কোটি তিরিশ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল প্রথম ধাক্কাতেই। ১৯৯৭ সালে ‘ব্লাড অন দ্য ডান্স ফ্লোর : ইষ্টোরি ইন দ্য মিক্স’ নামে মাইকেলের প্রথম রিমিক্স অ্যালবাম প্রকাশ পায়। ২০০১ সালে তিন কোটি মার্কিন ডলার খরচ করে জ্যাকসন প্রকাশ করেন ‘ইনভিসিবল’ নামের সেই বিখ্যাত অ্যালবাম।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


সঙ্গীতের পাশাপাশি একজন নৃত্যশিল্পীও ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। তিনি সামনের দিকে এগোনোর ভঙ্গিমায় ভ্রম করে পিছন দিকে হাঁটার এক অভিনব নৃত্যশৈলী আবিষ্কার করেছিলেন যার নাম দিয়েছিলেন তিনি ‘মুনওয়াকার’। এই নৃত্যশৈলী তাঁকে সারা পৃথিবীতে অমর করে রেখেছে।তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ যিনি মার্কিন টিভিতে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। মার্কিন টিভি অর্থাৎ ‘এম টিভি’র জনপ্রিয়তা শীর্ষে পৌঁছায় মাইকেলের ‘বিট ইন’ গানটি প্রচার করে। মাইকেলের গানের তালে নৃত্যকৌশল পপসঙ্গীত ও ভিডিওর ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছিল। সমগ্র পৃথিবীর সকল নৃত্যশিল্পীদের কাছে আইকন ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। সঙ্গীত আর নৃত্য প্রতিভার আড়ালে সমাজসেবক জ্যাকসন লিউকোমিয়া ও ক্যান্সারের জন্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, শিশু ও দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য তিনি পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার অর্থ প্রদান করেন।

মাইকেল জ্যাকসন তাঁর পঞ্চাশ বছরের জীবনে পেয়েছেন অজস্র সম্মান ও পুরস্কার যা হয়তো কখনোই কোনো শিল্পীরই আজ পর্যন্ত পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। একশোটিরও বেশি পুরস্কারের মধ্যে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৩৯টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড, ১৫টি গ্র্যামি পুরষ্কার, ৬টি ব্রিট পুরষ্কার এবং ২৬টি ‘আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ রয়েছে। এছাড়াও ‘গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার’, দু’বার ‘রক অ্যাণ্ড রোল হল অফ ফেম’ পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। ‘ভোকাল গ্রুপ হল অফ ফেম’, ‘ড্যান্স হল অফ ফেম’, ‘ব্ল্যাক মিউজিক অ্যাণ্ড এন্টারটেইনমেন্ট ওয়াক অফ ফেম’, ‘রিদম অ্যাণ্ড ব্লু মিউজিক হল অফ ফেম’ প্রভৃতি অজস্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন জ্যাকসন। তাঁর ‘থ্রিলার’ অ্যালবামটির জন্য ১৩টি গ্র্যামি পুরস্কারে মনোনীত হলেও পরপর ১৯৮৪, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালে মাইকেল জ্যাকসন মোট আটটি গ্র্যামি পুরস্কার পান। এই অ্যালবামটি ‘গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড’-এ স্হান পেয়েছে সর্বাধিক বিক্রিত অ্যালবাম হিসেবে। ১৯৮০ সালে ‘হলিউড ওয়াক অফ ফেম’, ‘আর্টিস্ট অফ দ্য সেঞ্চুরি’ এবং ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। ১৯৯০ সালে ‘আর্টিস্ট অফ দ্যা ডিকেড’ সম্মান এবং ১৯৯২ সালে ‘পয়েন্ট অফ লাইট অ্যাম্বাসেডার’ সম্মান অর্জন করেন জ্যাকসন। তিনবার আমেরিকার রাষ্ট্রপতির তরফ থেকে হোয়াইট হাউসে সম্মানীয় অতিথি নির্বাচিত হয়েছেন মাইকেল জ্যাকসন।

এছাড়াও সবচেয়ে বেশি অর্থ দান করার জন্য এবং সবচেয়ে বেশি বিক্রীত রের্কডের জন্য মাইকেল জ্যাকসন ‘গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড’ রের্কড গড়েন। তিনিই প্রথম শিল্পী যাঁর বিলবোর্ডে পাঁচটি বিভাগে এক নম্বর স্হান রয়েছে।

এত সাফল্য, বিশ্বজোড়া খ্যাতি সত্ত্বেও সমালোচনা আর রহস্য তাঁকে ঘিরে রেখেছিল আজীবন। ১৯৯০ সাল থেকে তিনি তাঁর জীবনযাপন, ফ্যাশন ও বিভিন্ন ঘটনাবলীর জন্য প্রচারের আলোয় থেকেছেন। কখনও তিনি সমালোচিত হয়েছেন ড্রাগ নেওয়ার জন্য। আবার কখনও শিশুদের উপর যৌন নিগ্রহে অভিযুক্ত হয়েছেন। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রথম অভিযুক্ত হন শিশু নিগ্রহের ঘটনায়। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তিনি এই অভিযোগ থেকে মুক্ত হন। আবার ২০০৫ সালে একই অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু তিনি এবারও নির্দোষ প্রমাণিত হন। এত কিছু সত্ত্বেও তাঁর জনপ্রিয়তায় একটুও ভাটা পড়েনি। তাঁর নাচের ধরণ, পোশাক, চুলের ধরণ বিশ্বের যুবসমাজকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি সকল সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণা ছিলেন। এত খ্যাতি-সম্মান কোথাও মাইকেলকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছিল। বিশৃঙ্খল জীবনযাপন করতেন তিনি – রাতে না ঘুমিয়ে জেগে থাকতেন, কড়া ঘুমের ওষুধও ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। নিজে কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁকে অনেক সময় অসম্মানিত হতে হয়েছে। সেই কারণে তিনি প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে নিজেকে শ্বেতাঙ্গ করে তোলেন আর অভাবিতভাবেই এরপর থেকে চর্মরোগে আক্রান্ত হন মাইকেল জ্যাকসন। বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন দেড়শো বছর। আর সেই কারণে নিজের ক্লোন তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি, অক্সিজেনযুক্ত বিছানায় ঘুমাতেন তিনি আয়ুবৃদ্ধির জন্য। এমনকি সর্বক্ষণের জন্য ডাক্তার নিযুক্ত ছিল তাঁর জন্য যাদের সব ব্যয়ভার মাইকেল বহন করতেন। ১৯৯৭ সালের পর থেকে ব্যক্তিগত জীবনে নানা ঘটনার দরুণ তিনি নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন মঞ্চ থেকে। ২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল তিনি লন্ডনের ‘ওটু এরিনা’ হলে ভক্তদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁর ফিরে আসার কথা জানান। এটাই ছিল শেষবারের মতো তাঁর জনসমক্ষে আগমন।

২০০৯ সালের ২৫ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে এই কিংবদন্তির মৃত্যু হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও