ধর্ম

নবদুর্গা

সনাতন হিন্দু ধর্মে মা দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনী, সর্বপাপহারিণী আনন্দস্বরূপিনী। দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী রূপটিই আমাদের বেশি পরিচিত হলেও দশমহাবিদ্যা রূপের মতো দেবী দুর্গারও ভিন্ন ভিন্ন নয়টি রূপ আছে। এই নয়টি রূপে দেবী দুর্গা সজ্জিতা হন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আর একেই বলা হয় নবদুর্গা । সৃষ্টিকে রক্ষা, তার পালন এবং মঙ্গলকামনায় দেবীর এই নয়টি রূপ সক্রিয় থাকেন সর্বদা। মূলত বসন্তকালে দেবীর পুজোর সময়েই এই নবদুর্গা পূজিতা হন। টানা নয়দিন ধরে এই নয়টি ভিন্ন রূপের পুজো করা হয়। বসন্তকালের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নবদুর্গা র পূজা করা হয় যাকে অনেকে নবরাত্রিও বলে থাকেন। মূলত দেবী পার্বতীর বিভিন্ন বয়সের রূপকে গড়ে তোলা হয়েছে একেকটি নবদুর্গা র রূপকল্প। শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘন্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী – এই নয়টি রূপই হল নবদুর্গা । নানা পুরাণে এই নবদুর্গার প্রতিটি রূপের উৎপত্তি বা তাৎপর্য নিয়ে অনেক কাহিনি প্রচলিত। চলুন সেই কাহিনিগুলি জেনে নেওয়া যাক।

শৈলপুত্রী : নবদুর্গার প্রথম রূপ শৈলপুত্রী হিমালয়ের কন্যা যার অপর নাম পার্বতী। তাঁর সঙ্গেই বিবাহ হয়েছিল শিবের। পার্বতী সে সময় দক্ষরাজের কন্যা ছিলেন। সতী হিসেবে দেহত্যাগের পরে পুনর্জন্ম লাভ করে তিনি শৈলপুত্রী রূপে আবির্ভূতা হন। শৈলপুত্রী হলেন সেই কন্যা যিনি একইসঙ্গে তাঁর পরিবারকে আর স্বামীকে সুখী-সমৃদ্ধিশালী করে তুলতে পারেন। গৌরবর্ণা শৈলপুত্রীর বাহন একটি সাদা ষাঁড়, তাঁর দুটি হাতের একটিতে ত্রিশূল এবং অপর হাতে রয়েছে পদ্ম।

ব্রহ্মচারিণী: নবদুর্গার দ্বিতীয় রূপ ব্রহ্মচারিণী আসলে পার্বতীর এক যোগিনী রূপ। শিবকে স্বামী রূপে পাওয়ার জন্যে কঠোর সাধনায় রত হয়েছিলেন। নারদের পরামর্শেই দেবী পার্বতী এই ব্রহ্মচারিণীর বেশে শিবের ধ্যানভঙ্গ ও তাঁকে তুষ্ট করার জন্য তপস্যা করেছিলেন। পুরাণ মতে দীর্ঘ তিন হাজার বছর কেবলমাত্র একটি করে বেলপাতা খেয়েই তিনি জীবনধারন করেছিলেন আর তাই তিনি পুরাণে ‘অপর্ণা’ নামে খ্যাত হন। অবশেষে ব্রহ্মার বরেই দেবী পার্বতী শিবকে পতিরূপে লাভ করেন। তাঁর দুই হাতের একটিতে কমণ্ডলু আর অন্যটিতে গোলাপফুল। গলায় তাঁর শুকনো রুদ্রাক্ষের মালা শোভিত। শৈলপুত্রীর মতো তিনি সুদৃশ্য অলঙ্কারশোভিতা নন।

চন্দ্রঘন্টা: দেবী চন্দ্রঘন্টা নবদুর্গার তৃতীয় রূপ যিনি যোদ্ধার বেশে সিংহের উপর অধিষ্ঠিতা এবং তাঁর দশটি হাতের আটটি হাত অস্ত্রশোভিত এবং বাকি দুটি হাতে তিনি বরাভয় মুদ্রা প্রদর্শন করেন। ধনুর্বাণ, গদা, ত্রিশূল, পদ্ম, জপমালা প্রভৃতি অস্ত্রে সজ্জিত থাকেন দেবী চন্দ্রঘন্টা। কমণ্ডলুপুরাণের কাহিনি অনুসারে, চন্দ্রদেবের শোভা দেখে মুগ্ধ হয়ে শিব তাঁকে নিজের মস্তকে ধারণ করতে চাইলে চন্দ্রদেব অর্ধচন্দ্রের রূপে শিবের রুক্ষ চুলের আর জটার মাঝে এসে শোভা পান। তাই অনেকে শিবকে চন্দ্রশেখর বলে থাকেন। চন্দ্রের শোভা লাভের পর শিব নিজেকে নতুন বেশে সজ্জিত করেন এবং পার্বতীকেও নতুনভাবে সাজিয়ে তোলেন। আর এই কারণেই দেবীকে চন্দ্রঘন্টা নামে অভিহিত করা হয়।

কুষ্মাণ্ডা: নবদুর্গার চতুর্থ রূপ দেবী কুষ্মাণ্ডা। এই রূপে দেবী পার্বতী বুঝতে পারেন যে তিনিই মহাশক্তিস্বরূপা। শিবের সঙ্গে বিবাহ হওয়ার পরে তিনি বুঝতে পারেন যে এই সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডকে তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করেন আর তিনিই সৌরজগতের নিয়ন্তা। ‘কুষ্মাণ্ড’ কথার অর্থ হল কুমুদ ফুল। দেবী কুমুদ ফুলে সজ্জিত হতে ভালোবাসেন বলে তাঁর এরূপ নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয়। দশভূজা দেবী কুষ্মাণ্ডার ছয় হাতে থাকে অস্ত্র আর বাকি চার হাতে থাকে গোলাপ ও পদ্ম। হাস্যোজ্জ্বল সুবর্ণকান্তি দেবী বাঘের উপরে অধিষ্ঠিতা।

স্কন্দমাতা: নবদুর্গার পঞ্চম রূপের মধ্যে পড়ে স্কন্দমাতা যিনি সিংহবাহনা এবং কার্তিকের মাতা রূপে পূজিতা। কার্তিকের অপর এক নাম পাওয়া যায় পুরাণে, তা হল – স্কন্দ। আর তাই দেবী স্কন্দমাতার প্রতিমায় শিশু কার্তিককে লক্ষ করা যায়। পুরাণকাহিনিতে বলা হয় কার্তিকেয়র জন্মের সময় আকাশের ছয়টি কৃত্তিকা নক্ষত্র শিব ও পার্বতীর মিলিত ঔরস যখন মাটিতে পড়ে ছয়টি খণ্ডে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সে সময় তৈরি হয় ছয়টি শিশু। শিব এই ছয়টি শিশুকে একত্রে সংস্থাপন করলে ছয়টি কৃত্তিকা নক্ষত্র তাঁকে ধারণ করে। ছয়টি শিশুকে একত্রিত করার ফলে পার্বতীর পুত্রের ছয়টি মাথা দেখা দেয় এবং তাঁর নাম হয়েছিল তখন ষড়মুখ স্কন্দ। এই কারণেই দেবীর নাম স্কন্দমাতা। এই রূপের মধ্য দিয়ে আসলে পার্বতী মাতৃভাবের প্রকাশ ঘটে। সুবর্ণকান্তি ত্রিনয়নী দেবী স্কন্দমাতার চারটি হাত এবং সারা গায়ে অল্পবিস্তর অলঙ্কারশোভিত।

কাত্যায়নী: দেবী কাত্যায়নী পার্বতীর ষষ্ঠ রূপ। মহিষাসুর বধের জন্য দেবতারা যখন মহামায়ার শরণাপন্ন হন, সেই সময়েই মহাশক্তির অংশ রূপে দেবী পার্বতীর কাত্যায়নী রূপের জন্ম হয়। ঋষি কাত্যায়নের কন্যা বলে তাঁর নাম কাত্যায়নী। দশ হাতে দশটি অস্ত্র নিয়ে দেবী যখন নিধন করেন মহিষাসুরকে, তখনই কাত্যায়নীর জন্ম। যদিও কাত্যায়নী দেবীর চারটি হাত। বহুবিধ অলঙ্কারে শোভিতা দেবী হিংস্র সিংহের উপরে অধিষ্ঠিতা।

কালরাত্রি: নবদুর্গার সপ্তম রূপ কালরাত্রি। সর্বনাশী রাত্রিকে যিনি দূর করেন তিনিই কালরাত্রি, ঘোর প্রলয়ে তিনিই সব ধ্বংস করেন, সমস্ত বিপদের সময় সবকিছুকে বিনাশ করেন এই ভয়ংকর বীভৎসরূপিনী দেবী। তিন হাতে অস্ত্র নিয়ে দেবী খোলা চুলে ভয়াল দর্শনে প্রকট হন। গাধার পিঠে চেপে মুণ্ডমালা গলায় নিয়ে ধ্বংসের দেবী হিসেবে আবির্ভূতা হন দেবী কালরাত্রি।

মহাগৌরী: দেবী মহাগৌরী নবদুর্গার অষ্টম রূপ। কালীমূর্তি থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে মানস সরোবরে স্নান করে তিনি ঘন কৃষ্ণবর্ণ থেকে উজ্জ্বল বর্ণের চাঁদের মতো শোভিত হন। শ্বেতশুভ্র বসন পরিহিত দেবীর হাতে থাকে ডমরু এবং তাঁর বাহন থাকে ষাঁড়। চতুর্ভুজা দেবী মহাগৌরী পার্বতীর শান্ত-সমাহিত রূপে হালকা রঙের উজ্জ্বল অলঙ্কারে সজ্জিত হন।

সিংহবাহিনী: সবশেষে নবদুর্গার নবম রূপ সিদ্ধিদাত্রী দেবী সিংহবাহিনী এবং চারটি হাতেই তিনি বরাভয় দেন ভক্তদের। সাংসারিক সুখ সমৃদ্ধির কারণ দেবী পার্বতীকে পুরাণ অনুসারে মহাদেব ‘সিদ্ধিদাত্রী’ রূপে পুজো করেছিলেন। আর সেই পুজোয় সিদ্ধিলাভের পরে শিব অর্ধনারীশ্বর রূপ ধারণ করেন। দেবী পার্বতীর এটি চরম অবস্থা যেখানে তিনি নিজেকে প্রকৃতই মহাশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। জীবনের প্রধান উৎস দেবী সিদ্ধিদাত্রী এবং একাধারে তিনি শিক্ষাদাত্রী, জ্ঞানদাত্রী। পদ্মাসনে অধিষ্ঠিতা দেবী এখানে চতুর্ভূজা।

এই নবদুর্গার প্রত্যেক রূপে দেবী আসলে পূজিতা হন নবরাত্রির প্রত্যেক দিন। ক্রম অনুসারে প্রতিদিন একেক রূপে দেবীকে পুজো করা হয়। বাসন্তী পুজোকে কেন্দ্র করে মূলত নবদুর্গার পূজা-উপচার আজও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত আছে।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ব্রত নিয়ে শুনুন



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন