ইতিহাস

রতন টাটা

ভারতের এক অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় শিল্পপতি এবং টাটা সন্স কোম্পানির পূর্বতন চেয়ারম্যান রতন টাটা (Ratan Tata)। ১৯৯০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি টাটা গ্রুপেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। জামশেদজি টাটার তৈরি করা টাটা কোম্পানিতে প্রথমে একজন সামান্য চুল্লি পরিবহনকারী ও রক্ষণাবেক্ষণকারীর পদে চাকরিতে ঢুকে অবিশ্বাস্যভাবে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হন তিনি এবং সকলের বিরূপ সমালোচনাকে কাঁধে নিয়েও টাটা গ্রুপের ব্যবসাকে শুধু ভারতের মধ্যেই নয় বিশ্বের প্রায় একশোটি দেশে ছড়িয়ে দেন। নিজের মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে কোম্পানিকে সাফল্য এনে দেন রতন টাটা যার ফলে প্রভূত বৈদেশিক রাজস্ব অর্জন করে টাটা গ্রুপ। একদিকে গাড়ি নির্মাণ, পণ্য পরিষেবা, তথ্য ও প্রযুক্তি, সঞ্চয় প্রকল্প সর্বত্র টাটা গ্রুপের যে একাধিপত্য তার মূলে ছিলেন রতন টাটা। অবসর নেওয়ার সময়ে তাঁর সঞ্চিত সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। ২০০০ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কারে ভূষিত করেন এবং ২০০৮ সালে তিনি অর্জন করেন ‘পদ্মবিভূষণ’ পুরস্কার। শুধুই ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, নানা সময়ে জনহিতকর কাজেও তাঁর উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।

১৯৩৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর বম্বেতে রতন টাটার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নাভাল টাটা। জানা যায়, জামশেদজি টাটার কনিষ্ঠ পুত্র স্যার রতনজি টাটার কোনো সন্তানাদি না থাকায় তিনি নাভাল টাটাকে দত্তক নেন। নাভাল টাটা দুটি বিবাহ করেন। প্রথম স্ত্রী সোনুর সন্তান রতন টাটা। রতন টাটার দশ বছর বয়স যখন, তাঁর বাবা নাভাল টাটা আরেক সুইস-ভারতীয় মহিলা সিমোন টাটাকে বিবাহ করে পরিবার ছেড়ে চলে যান। রতন টাটার ঠাঁই হয় প্রথমে জে. এন. প্রিতিত পার্সি নামের এক অনাথ আশ্রমে এবং পরে তাঁর দিদা নবতাজবাঈ টাটা রতন টাটা, তাঁর ভাই জিমি এবং তাঁর মায়ের দায়ভার গ্রহণ করেন। সেই থেকে বাল্য ও কৈশোর দিদার অভিভাবকত্বেই বড়ো হন রতন টাটা।

রতন টাটার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় চ্যাম্পিয়ন স্কুলে এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পরে তিনি ভর্তি হন বম্বের ক্যাথিড্রাল অ্যাণ্ড জন ক্যানন স্কুলে। এরপরে সিমলার বিশপ কটন স্কুলেও পড়াশোনা করেছেন তিনি। নিউ ইয়র্কের রিভারডেল কাণ্ট্রি স্কুল থেকে ১৯৫৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন রতন টাটা। পরে ১৯৫৯ সালে নিউ ইয়র্কেরই কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্য ও কাঠামো প্রকৌশলী (Architecture and Structural Engineering) বিষয়ে স্নাতক পাশ করেন। তারপরে পড়াশোনার গতিপথ বদলে যায় তাঁর। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুল থেকে অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে একটি সীমিত সময়ের কোর্স সম্পন্ন করেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


আমেরিকার ‘জোনস অ্যাণ্ড ইমনস’ নামের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে কাজের মধ্য দিয়েই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে ১৯৬১ সালে টাটা গ্রুপের অধীনে টাটা স্টিলের কারখানায় সামান্য এক ব্লাস্ট ফার্নেস তত্ত্বাবধায়কের পদে চাকরি করতে শুরু করেন তিনি । এছাড়া কোম্পানিতে লাইমস্টোন নিষ্কাশনের কাজটিও তদারকির দায়িত্ব ছিল তাঁর উপরে। দীর্ঘ দশ বছর ধরে পরিশ্রম করে অধ্যবসায়ের সঙ্গে সামান্য এক কর্মচারী থেকে রতন টাটা কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের পদে আসীন হন। জামশেদজি টাটা তাঁকেই ১৯৯১ সালে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত করেন। নিজের একার চেষ্টাতে রতন টাটা টাটা গ্রুপের অধীনেই ‘ন্যাশনাল রেডিও অ্যাণ্ড ইলেক্ট্রনিক্স’ অর্থাৎ ‘নেলকো’ সংস্থাকে দাঁড় করান। কিন্তু আর্থিক মন্দার কারণে সেই সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। টাটা গ্রুপে তখনও কাজ করছিলেন রতন টাটা। আর জামশেদজি টাটার অবসরকালীন সময়ে পাওয়া এই চেয়ারম্যানের দায়িত্বে কোম্পানির অন্য সকলেই তাঁর উপর রুষ্ট ছিলেন। রতন টাটার উপরে কারো বিশেষ ভরসা ছিল না। প্রবল বিরোধিতার মোকাবিলা করতে প্রথমেই রতন টাটা কোম্পানিতে চাকরি করার একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা ধার্য করেন যার ফলে প্রবীণ অফিসাররা অনেকেই অবসর গ্রহণ করেন। এর পাশাপাশি টাটা গ্রুপের সকল কোম্পানিকে নির্দেশ দেন তিনি যাতে তারা তাদের লাভের একাংশ কোম্পানির শ্রীবৃদ্ধির জন্য লগ্নি করে। দীর্ঘ ২১ বছর এই কোম্পানির চেয়ারম্যানের পদে থেকে টাটা গ্রুপকের চল্লিশ গুণ বড়ো করে তোলেন রতন টাটা। তাঁর আমলেই টাটা মোটরসের থেকে বিশ্বখ্যাত গাড়ির ব্র্যাণ্ড জাগুয়ার অ্যাণ্ড রোভার-কে অধিগ্রহণ করা হয় যার ফলে বিশ্বের বাজারে টাটা কোম্পানির গাড়ির একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে টাটা স্টিল কোম্পানি ‘কোরাস’ নামে একটি সংস্থাকেও অধিগ্রহণ করে। ক্রমেই আন্তর্জাতিক কোম্পানি হয়ে ওঠে টাটা গ্রুপ। বিশ্বের প্রায় ছয়টি মহাদেশের মোট ১০০টি দেশে টাটা নিজের ব্যবসাকে বিস্তৃত করে তুলেছে রতন টাটা দক্ষ পরিচালনায় ও মেধায়। মূলত সাতটি ভাগে টাটা গ্রুপের ব্যবসাকে পরিচালনা করেন রতন টাটা – তথ্য-প্রযুক্তি, ব্যাঙ্কিং, ইলেক্ট্রনিক্স, রাসায়নিক দ্রব্য, পণ্যদ্রব্য, বস্ত্রবয়ন ইত্যাদি। জামশেদজি টাটা মাত্র তিরিশ হাজার টাকা নিয়ে যে ব্যবসা শুরু করেছিলেন রতন টাটা সেই ব্যবসাকেই দশ কোটি ডলারের মূল্যে নিয়ে যান দক্ষ হাতে। ভারতের বুকে সবথেকে বড়ো আউটসোর্সিং কোম্পানি হিসেবে টাটাকে প্রতিষ্ঠিত করেন রতন টাটা। ১৯৯৮ সালে তাঁর নেতৃত্বে টাটা কোম্পানি প্রথম বিশ্বের বাজারে নিয়ে আসে ‘টাটা ইণ্ডিকা’ নামের একটি নতুন গাড়ির মডেল যা মাত্র দু বছরের মধ্যেই ভারতের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে টাটা স্টিলের লণ্ডনের শাখাও দাঁড় করিয়েছেন রতন টাটা যার ফলে ভারতের পাশাপাশি লণ্ডনের ইস্পাতের বাজারটিও দখল করে টাটা গ্রুপ। টাটা মোটরসের অনেক যন্ত্রাংশ এবং টাইটান ঘড়ির আধুনিক মডেলের অনেক উন্নতিসাধন করেন তিনি। ১৯৯১ সালে তিনি যখন চেয়ারম্যান হন, সেই সময় মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবিধে পুরোমাত্রায় গ্রহণ করেই এই সংস্থার লাভের পরিমাণ এক লপ্তে ৫০ গুণ বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হন তিনি। ২০১২ সালে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যানের পদ থেকে অবসর নেন তিনি। কিন্তু অন্যান্য বহু অফিসার ও ভারতীয় শিল্পপতিদের অনুরোধে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে আসীন ছিলেন রতন টাটা। ভারতের ই-কর্মাস ওয়েবসাইট স্ন্যাপডিল, চা বিক্রেতা ‘টি বক্স’-এ নিজের উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করেন তিনি। ‘টাটা টি’ তাঁর নেতৃত্বেই ‘টেটলি’ সংস্থাকে অধিগ্রহণ করে। শোনা যায়, একবার জার্মানির এক রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে খাবার নষ্ট করায় তাঁকে ৫০ ইউরো জরিমানা দিতে হয়। তাঁর জীবনের অন্যতম ব্যর্থতার মধ্যে অন্যতম হল ‘ন্যানো’ প্রকল্প। প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুরে কৃষকদের থেকে ন্যানো কারখানা করার জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে এক রাজনৈতিক তরজায় পড়ে সমালোচিত হন রতন টাটা। কারখানা তৈরির জমি না দেওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। পরে গুজরাতে কারখানা বসিয়ে ন্যানো গাড়ি বাজারে আনলেও তা সফলতা পায় না। কম খরচে উপলব্ধ এই গাড়ির পরিষেবা ভারতীয়রা নিতে চায়নি।

শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই নয়, বহু জনহিতকর কাজেও তিনি সবসময় পাশে থেকছেন। ২০১০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলে একটি এক্সিকিউটিভ সেন্টার গড়ে তোলার জন্য রতন টাটা ৫ কোটি ডলার দান করেন। তাঁরই নামে এই প্রেক্ষাগৃহের নাম দেওয়া হয় ‘টাটা হল’। তাঁর অধীনস্থ সংস্থা টাটা কনসাল্টেন্সি সার্ভিস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ণেগী মেলন বিশ্ববিদ্যালয়কে অটোমোবাইল বিষয়ে গবেষণার জন্য ৩ কোটি ডলার দান করে। ‘আইআইটি’ ভারতের বুকে তথ্য-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক প্রতিষ্ঠান যেখানে মানুষের সাধ্যের মধ্যে প্রযুক্তিগত পণ্য নির্মাণের লক্ষ্যে রতন টাটার নির্দেশে টাটা গ্রুপ এই প্রতিষ্ঠানকে ৯৫ কোটি টাকা দান করে।

ভারতের ‘ন্যাশনাল ম্যানুফ্যাকচারিং কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল’-এর সদস্য তিনি । তাছাড়া আমেরিকার ‘অ্যালোকা আইএনসি’ এবং ‘মণ্ডিলেজ ইন্টারন্যাশনাল’-এর বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের সদস্যপদ রয়েছে তাঁর। স্থাপত্যকীর্তির দুনিয়ার সবথেকে সম্মানজনক পুরস্কার ‘প্রিজকার আর্কিটেকচারাল প্রাইজ’ অর্জন করেন রতন টাটা। ২০০০ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কারে ভূষিত করেন এবং ২০০৮ সালে তিনি অর্জন করেন ‘পদ্মবিভূষণ’ পুরস্কার। তাছাড়া বিজনেস অফ পীস্‌ এবং এশিয়ান বিজনেস পুরস্কারও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।

অবসর গ্রহণের সময় তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ কোটি ডলার।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও