ধর্ম

রথযাত্রা

হিন্দুধর্মের অন্যতম বিখ্যাত উৎসব হল রথযাত্রা। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে আয়োজিত এই উৎসবটির কেন্দ্রস্থল ওড়িশা রাজ্যের পুরী শহরটি হলেও পশ্চিমবঙ্গেও এই রথযাত্রা যথেষ্ট জাঁকজমক সহকারে অনুষ্ঠিত হয়।

রথযাত্রা আসলে হিন্দু দেবতা জগন্নাথ, বলরাম  ও সুভদ্রার তিনটি সুসজ্জিত রথে চেপে মাসির বাড়ি যাত্রাকে বোঝায়। পুরীতে এই রথযাত্রা(Rath-yatra) দেখতে সারা পৃথিবী থেকে পর্যটকরা ভিড় করেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের আগমনে এই রথযাত্রার শুরু হয়  জগন্নাথ, বলরাম  ও সুভদ্রার প্রায় ২ কিমি দূরে অবস্থিত গুন্ডিচা মন্দিরে (যা  জগন্নাথের ‘মাসির বাড়ি ‘ হিসেবে খ্যাত) যাওয়াকে কেন্দ্র করে এবং  সাতদিন পর মাসির বাড়ি থেকে জগন্নাথের ‘মৌসিমা মন্দিরে’ তাঁর প্রিয় ‘পোড়া-পিঠা’ খেয়ে আবার বাড়ির পথে  ফিরে আসার মাধ্যমে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে, যা ‘উল্টোরথ’ হিসেবে পরিচিত ।

এখন প্রশ্ন হল কবে এবং কিভাবেই বা এই রথযাত্রা শুরু হল? ওড়িশার প্রাচীন দুই পুঁথি  ‘উৎকলখণ্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’-তে  রথযাত্রার জন্মবৃত্তান্তের যে ইতিহাস পাওয়া যায় তা থেকে জানা যায় রথযাত্রার শুরু প্রায় সত্যযুগে।কৃষ্ণের মৃত্যুর পর দ্বারকার সমুদ্রতীরে মৃতদেহ পোড়াবার সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সত্‍‌কার কার্য অসমাপ্ত থেকে যায়। ওই অর্ধদগ্ধ দেহাংশ সমুদ্রের জলে ভাসতে ভাসতে পশ্চিম উপকূল থেকে পূর্ব উপকূলে কলিঙ্গ রাজ্য(ওড়িশা) এসে পৌঁছয়।কলিঙ্গের তখন নাম ছিল মালবদেশ।  ওই অঞ্চলে বসবাসকারী এক দল শবর তাদের নেতা বিশ্বাবসুর নেতৃত্বে গভীর জঙ্গলে মন্দির নির্মাণ করে ওই দেহাংশকে ‘নীলমাধব’ দেবতাজ্ঞানে পুজো করতে আরম্ভ করে। নীলমাধবের খ্যাতি শুনে প্রাচীন অবন্তী নগরীর বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন তা অধিগ্রহণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। বিশ্বাবসুর কাছে পরাজিত ইন্দ্রদ্যুম্ন তখন বিষ্ণুর প্রার্থনা আরম্ভ করেন একদিন বিষ্ণু তাঁর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের  স্বপ্নে হাজির হয়ে রাজাকে বলেন যে পুরীর সমুদ্রতটে একটা কাঠের টুকরো ভেসে এসেছে।ভেসে আসা সেই কাঠের টুকরো দিয়ে তাঁর মূর্তি তৈরি করুক রাজা । স্বপ্নাদেশ পেয়ে রাজা মূর্তি তৈরির জন্য রাজা একজন উপযুক্ত কাঠের শিল্পীর সন্ধান করতে থাকেন।অবশেষে  এক রহস্যময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাষ্ঠশিল্পীর  খোঁজ পান রাজা। সেই  বৃদ্ধ শিল্পী মূর্তি  তৈরি করে দেবার প্রতিশ্রুতি দেন রাজাকে এবং সঙ্গে এও বলেন  মূর্তি তৈরীর সময়  কেউ যেন তাঁর কাজে বাধা না দেন। বন্ধ দরজার আড়ালে শুরু হয় কাজ। এদিকে রাজা  কাজের অগ্রগতির  ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রতিদিন তিনি বন্ধ দরজার কাছে যেতেন এবং শুনতে পেতেন ভিতর থেকে খোদাইয়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। ৬-৭ দিন বাদে যখন রাজা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন এমন সময় আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। অত্যুৎসাহী রাজা কৌতুহল সংবরণ করতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন। দেখেন মূর্তি তখনও অর্ধসমাপ্ত এবং কাষ্ঠশিল্পী উধাও। এই রহস্যময় কাষ্ঠশিল্পী ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। মূর্তির হাত পা কিছুই তখনও তৈরি হয়নি দেখে রাজা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কাজে বাধাদানের জন্য অনুতাপ করতে থাকেন। তখন দেবর্ষি নারদ তাঁর সম্মুখে আবির্ভূত হন। নারদ রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তি পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ।পরবর্তিকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।

রথযাত্রায় তিন বিগ্রহের জন্য তৈরি হয় তিনটি পৃথক রথ।প্রাচীন রাজ্য দশপল্ল থেকে গাছ কেটে গাছের কাঠ ভাসিয়ে দেওয়া হয় মহানদীর জলে, ভাসতে ভাসতে সেগুলি পৌঁছয় পুরীতে।সেই কাঠ দিয়ে তৈরি হয় রথ।  জগন্নাথের রথের নাম নান্দীঘোষ বা  কপিধ্বজ বা গরুড়ধ্বজ। রথে জগন্নাথের সঙ্গী হন মদনমোহন। নান্দীঘোষের উচ্চতা ৪৫ ফুট।চাকার সংখ্যা ১৬টি। ৮৩২টি কাঠের টুকরো দিয়ে গড়া হয় এই রথ সাজানো হয় মূলত লাল ও হলুদ কাপড়ে।জগন্নাথের রথ নান্দীঘোষের সারথির নাম দারুকা।রথের মাথায় থাকা পতাকার নাম ত্রৈলোক্যমোহিনী। এই রথের সামনে চারটি ঘোড়া থাকে যাদের নাম- শঙ্খ, বলাহক, শ্বেতা, ও হরিদাশ্ব । জগন্নাথের রথের দড়ি বা রশিটির নাম ‘শঙ্খচূড়া নাগুনি’। জগন্নাথের রথে আরও নয় দেবতা  অধিষ্ঠান করেন, যাঁরা হলেন- গোবর্ধন, কৃষ্ণ, নরসিংহ, রাম, নারায়ণ, হনুমান, রুদ্র, বরাহ, ত্রিবিক্রম। জগন্নাথের রথে একজন রক্ষীও থাকে যার  নাম গরুড়।

বলরামের রথের নাম-তালধ্বজ বা  হলধ্বজ বা লাঙ্গলধ্বজ। রথে বলরামের সঙ্গী হন রামকৃষ্ণ। তালধ্বজের উচ্চতা ৪৪ ফুট।চাকার সংখ্যা ১৪টি। ৭৬৩টি কাঠের টুকরো দিয়ে গড়া  এই রথ সাজানো হয় মূলত লাল ও সবুজ কাপড়ে।।বলরামের রথের দড়ি বা রশিটির নাম ‘বাসুকি নাগ’।তালধ্বজের সারথির নাম মাতালি।রক্ষীর নাম বাসুদেব।রথের মাথায় পতাকার নাম উন্যানী।বলরামের রথেও নয়টি  দেবতা থাকেন যাঁরা  হলেন-  কার্তিক, গণেশ, সর্বমঙ্গলা, মৃত্যুঞ্জয়, মুক্তেশ্বর, প্রলম্বরী, হলায়ুধ, নতম্বর, শেষদেব ।তালধ্বজেও থাকে চারটি ঘোড়া যাদের নাম- তীব্র, ঘোর, দীর্ঘশ্রম, ও স্বর্ণলাভ ।

সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন বা দেবদলন বা পদ্মধ্বজ ।রথে সুভদ্রার সঙ্গী  হন সুদর্শনা ।দর্পদলনের  উচ্চতা ৪৩ ফুটফুট।চাকার সংখ্যা ১২টি। ৫৯৩টি কাঠের টুকরো দিয়ে গড়া  এই রথ সাজানো হয় মূলত লাল এবং কালো কাপড়ে।।দর্পদলনের রথের দড়ি বা রশিটির নাম ‘স্বর্ণচূড়া নাগুনি’।দর্পদলনের সারথির নাম অর্জুন।রথের মাথায় পতাকার নাম নদম্বিকা।সুভদ্রার রথে নয় জন  দেবী অধিষ্ঠান করেন – এঁদের মধ্যে আছেন চণ্ডী, চামুণ্ডা, বনদুর্গা, শুলিদুর্গা, শ্যামাকালী, মঙ্গলা, বিমলা।দর্পদলনেও থাকে চারটি ঘোড়া- রচিকা, মচিকা, জিতা, অপরাজিতা। সুভদ্রার রথে একজন রক্ষীও থাকে যার  নাম – জয়দুর্গা।

তথ্যসুত্র


  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Ratha-Yatra
  2. https://books.google.co.in/ratha-yatra
  3. https://books.google.co.in/books/ratha-yatra
  4. Das, Basanta Kumar (2009). "Lord Jagannath Symbol of National Integration" (PDF). Orissa Review. Retrieved 10 December 2012. The term Jagannath etymologically means the Lord of the Universe
  5. Geib, R.: Die Indradyumna – Legend, Ein Beitrag zur Geschichte des Jagannath –Kultes, Wiesbaden 1965.
  6. http://www.neelkanthdhaam.org/skpu-2.html
  7. https://ghanada1.wordpress.com/
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/
  9. https://blogs.eisamay.indiatimes.com/gautambasumullick/rathyatra-of-odisha-and-bengal/
  10. https://www.anandabazar.com/state/heritage-of-ratha-yatra-in-bengal-dgtl-1.427997
  11. https://www.anandabazar.com/district/purulia-birbhum-bankura/traditional-rathyatra-of-rasapal-palace-held-after-two-hundred-years-at-bankura-raipur-block-1.178967?ref=rath-topics-topic-stry
  12. https://www.anandabazar.com/editorial/jahar-sarkar-writes-about-democratic-rath-1.182131

 
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

To Top
error: Content is protected !!