সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পুজো

সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পুজো

তখনও কলকাতা নগর কলকাতা হয়নি। গোবিন্দপুর, সুতানুটি আর কলকাতা এই তিন গ্রামের স্বত্ব তখন কিনে নিয়েছেন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি। সময়টা ১৬৯৮ সাল। কার থেকে কিনলেন এই তিনটি গ্রাম? কলকাতার ইতিহাসে তাঁর নাম আজও খোদিত হয়ে আছে, সেই সাবর্ণ রায়চৌধুরী আর সেই বংশেরই লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরীর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলকাতার বিখ্যাত বনেদি পুজোর ইতিহাস যা সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পুজো নামে ইতিহাসে খ্যাত।

রবীন্দ্রনাথের ‘বৌ-ঠাকুরানীর হাট’ উপন্যাস তো অনেকেরই পড়া আছে। উপন্যাসের পরস্পর বিবদমান প্রতাপাদিত্য আর বসন্তরায়ের কথা মনে আছে নিশ্চয়? সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পুজোর ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে সেই বারো ভুঁইয়াদের ধূসর অতীতে। কলকাতার অনতিদূরে যশোহর এস্টেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত বসন্তরায় এবং বিক্রমাদিত্য তখন বাংলার মাটিতে শাসন করছেন বলা চলে। বিক্রমাদিত্যের দুই পুত্রের মধ্যে প্রতাপাদিত্য এবং লক্ষ্মীকান্ত দুই ভিন্ন মেরুর মানুষ ছিলেন। যশোর এস্টেটের মহামন্ত্রী লক্ষ্মীকান্তের সঙ্গে বসন্ত রায়ের বেশ সখ্যতা ছিল। বিক্রমাদিত্য মারা গেলে সম্পত্তির বন্টনে এস্টেটের পূর্বদিকের দায়ভার পান প্রতাপাদিত্য এবং পশ্চিমদিক পান লক্ষ্মীকান্ত। কিন্তু প্রতাপাদিত্যের নির্লজ্জ অমানুষিতা এবং স্বৈরাচারী শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো এস্টেটের প্রজারা। বসন্তরায়কে হত্যা করেন সেই প্রতাপাদিত্য। আর এরপরে প্রতাপের উৎপীড়ন দমনের জন্য আকবরের নির্দেশে মানসিংহ আসেন বাংলায়। যুদ্ধে প্রতাপ পরাজিত হন। ফলে প্রতাপের অংশের দায়ভার তখন গিয়ে পড়ে ভাই লক্ষ্মীকান্তের উপর। প্রথমে লক্ষ্মীকান্ত বসন্তরায়ের তত্ত্বাবধানে কাজ করতেন বলে তাঁর পদবি ছিল ‘মজুমদার’। পরবর্তীকালে মানসিংহের কাছ থেকে ১৬০৮ সালে হালিশহরের আটটি পরগণার নিষ্কর জমিদারির স্বত্ব লাভ করেন লক্ষ্মীকান্ত এবং সেইসঙ্গে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে পান ‘রায়’ ও ‘চৌধুরী’ উপাধি। সেই থেকেই লক্ষ্মীকান্তের পদবি হিসেবে রায়চৌধুরী ব্যবহৃত হতে থাকে। সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বংশের প্রথম পুরুষ তিনিই। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, সাবর্ণ কথাটি এলো কেন? আসলে এই বংশের মানুষরা সাবর্ণ গোত্রীয় বলে বংশের নামকরণে সাবর্ণ নামটি চলে এসেছে।

কলকাতার বড়িশাতে লক্ষ্মীকান্ত প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। ১৬১০ সালে প্রথম শিউলি ফুলের বৃন্তসম বর্ণের দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন লক্ষ্মীকান্ত। তখন ছিল আটচালার মণ্ডপ, কাঠের থামের উপরে ছাউনি দেওয়া থাকতো হোগলা পাতায়। ধীরে ধীরে ষোলোটি থামের একটি নাটমন্দির এর পাশেই গড়ে ওঠে। এই বাড়ির গণেশের মূর্তি লাল বর্ণের এবং অসুরের গায়ের রঙ সবুজ। দেবী মূর্তির একদিকে দেখা যায় রামচন্দ্ররূপী রঘুবীরকে আর অন্যদিকে দেখা যায় শিবকে। এটাই এই বাড়ির দেবীমূর্তির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বড়িশার আটচালায় প্রধান পুজো হলেও সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের পূজা ছড়িয়ে আছে আরো আটটি বাড়িতে। আটচালা বাড়ি, বড়বাড়ি, মাঝের বাড়ি, কালীকিঙ্কর ভবন, বেনাকী বাড়ি, বিরাটি ও নিমতার পাঠানপুর ভবন মিলিয়ে এই পুজো হয়ে থাকে। একেক বাড়িতে একেকরকম আয়োজন চলে। বড়িশার প্রাচীন আটচালায় আজ আর নাটমন্দিরের সেই জৌলুশ নেই। ছাদ ভেঙে পড়ে গিয়ে মাত্র দশটি থাম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে কোনোমতে টিকে আছে। তবু তারই মধ্যে অতীতের গন্ধ খেলে বেড়ায়। ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী’ মতে এখানে দেবীর পূজা হয়ে থাকে। বংশপরম্পরায় পুজো চলে আসছে, আর সেই পরম্পরাবাহিত হয়ে লক্ষ্মীকান্তের পৌত্র বিদ্যাধর রায়চৌধুরীর সময়ে এসে সাবর্ণদের দুর্গাপুজো শাক্ত, শৈব আর বৈষ্ণবদের সমন্বয়স্থল হয়ে ওঠে। আর এর দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে আনাচে কানাচে। পুজোর চালচিত্রে দেবী দুর্গার দশমহাবিদ্যারূপের উপস্থিতি শাক্তমতের পরিচয় দেয়। বড়োবাড়ি, মেজবাড়ি আর নিমতার বাড়ির সিংহের মুখের গড়ন হয় ঘোড়ার মতো যা বৈষ্ণব শাস্ত্রের বর্ণনার অনুসারী। অন্য বাড়িগুলিতে কিন্তু সিংহের মুখে এই বদল দেখা যায় না। বলাই বাহুল্য প্রাচীনকালের জমিদারবাড়ি, সাবেক বনেদি বাড়ির অন্দরে ঢুকলেই রাধাকৃষ্ণের মন্দির, শিবের মন্দির এবং মাঝে মাঝে জৈন মন্দির, কালীমন্দিরের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় যা কিনা তাদের ধর্মসমন্বয়ের মানসিকতার পরিচায়ক।

পুজোর পদ্ধতিতেও অন্যান্য বনেদি পুজোকে হার মানিয়ে দেয় সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পুজো । একেক বাড়িতে একেক রীতি। আটচালা বাড়িতে ষষ্ঠীর দিন তেরো আগেই রাধাগোবিন্দ মন্দিরে দেবীর আবাহন শুরু হয়ে, তিন বেলা ভোগ দানের ব্যবস্থা হয়। এই ভোগ আবার তিন বেলা তিনরকম – সকালে ফলাহার করেন দেবী, দুপুরে অন্নভোগ হয় তাঁর জন্য আর রাতে থাকে লুচি। পঞ্চমী তিথি পড়লে পঞ্চদেবতাকে স্মরণ করে নেওয়া হয় এখানে। এই পঞ্চদেবতা হলেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, গণেশ ও শান্তি। মহালয়ার পরেরদিন বসানো পঞ্চঘট থেকে মাটি নিয়ে সপ্তমীর দিন পুজোর প্রারম্ভে দেবীর সামনে মূল ঘট বসানো হয়। ষষ্ঠীর দিন অন্য বাড়ির পুজো শুরু হলেও বড়িশার আটচালাতে পুজো শুরু হয় নবমীর দিন। আর নবমীর দিন নিমতা ও বিরাটির পাঠানপুর ভবনে কুমারী পুজো করা হয়। পুজোর অঙ্গ হিসেবে একটি বিশেষ রীতি অষ্টমী ও নবমী তিথিতে পালন করা হয় এখানে যাকে বলে ‘মাসভক্ত বলি’। এই রীতি অনুসারে ১৮০টি খুড়িতে মাসকলাই আর দই নেওয়া হয় পুজোর জন্যে। অপদেবতাকে সন্তুষ্ট করতেই এই উপচারের আয়োজন বলে জানা যায়। আগে এখানে পশুবলি হলেও বহু বছর যাবৎ তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একমাত্র নিমতা বাড়ি ছাড়া অন্যান্য সকল বাড়িতে আশ্চর্যজনকভাবে পুজোর প্রতিদিন আমিষভোগ রান্না করা হয়। সাদা ভাত, পোলাও, খিচুড়ি, শুক্তো, মুগডাল, মোচাঘন্ট, লাউ ইত্যাদি রাঁধা হয় দেবীর ভোগে আর সঙ্গে থাকে রুই, ভেটকি, পার্শে, ইলিশ, বাটা ইত্যাদি হরেক কিসিমের মাছ। সন্ধিপুজোতে বেশ মজার একটি উপচার পালিত হয় সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পুজো য় – খিচুড়ি রাঁধা হয় আর তার সঙ্গে থাকে ল্যাটামাছ এবং কাচকলা পোড়া। নবমীর দিন রাত্রে বাড়ির মহিলারা একযোগে কচুশাক, কইমাছ, খেসারি ডাল, চালতার ঝোল রেঁধে রাখেন যা পান্তাভাতের সঙ্গে দশমীর দিন ভোগ হিসেবে অর্পণ করা হয় দেবীকে। তারপর বাবুঘাটে বিসর্জনের পর বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে সাবর্ণবাড়ির আটচালা। নাটমন্দিরের প্রাচীন থামগুলিতে শুধু বেজে চলে প্রাচীনকালের আদিগঙ্গায় বিসর্জনের সময়কার মানুষের উল্লাসধ্বনি, কাঁধে চেপে দেবীর বিসর্জনের স্মৃতিময় অতীতের সুর।

বিভিন্ন বনেদী বাড়ির পূজা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

One comment

আপনার মতামত জানান