বিবিধ

শিবরাম চক্রবর্তীর জীবনযাপন

শিবরাম চক্রবর্তীর জীবনযাপন তাঁর লেখার মতই সরল সাধাসিধে। সেই অসাধারণ জীবনের কিছু ঘটনা এখানে তুলে ধরা হল।

১৩৪ মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মেসে কোটি কোটি ছারপোকা অধ্যুষিত ‘তক্তারামে’ ফিনাইল সুরক্ষিত তেলচিটে তোষকের উপর শুয়ে, ‘শুক্তারাম’ ভক্ষণ করে আরামদায়ক জীবনযাপন করা মালদহের সেই শ্রী শিবরাম চক্রবর্তীর জন্মদিন ১৯০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর। যিনি বিয়ে ছাড়া বাকি সব কিছুই করেছেন। যেমন হয়েছিলেন সম্পাদকও। কিভাবে? যুগান্তর তখন দেউলিয়া। মাত্র ৫০০ টাকায় স্বত্ব কিনে ফেললেন। তিনি হলেন সম্পাদক। দেদার লিখতে থাকলেন ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে। গ্রেফতারি পরয়োনা জারি হল। পুলিশ এসেছে মেসে। খবরও পেয়েই শিবরাম মিষ্টির দোকানে ঢুকে ২০টা রসগোল্লার অর্ডার দিয়ে দিলেন। জেলে গেলে কতদিন মিষ্টি জুটবে না কপালে কে জানে! পকেটে কিন্তু একটা পয়সাও নেই। যেই পুলিশ গ্রেফতার করল মিষ্টিওয়ালাও ভয়ে আর টাকা চাইল না। জেলের ভিতর দুটো কম্বল দেওয়া হয়েছিল। যা জেলের সম্পত্তি। কিন্তু তা বগলে নিয়ে কিছুদিন বাদেই দিব্বি বেড়িয়ে এলেন জেল থেকে। জিগ্যেস করলে অম্লান বদনে বললেন, “জেলরই তো বললেন, আপনার নিজের যা জিনিস আছে তা নিয়ে যেতে পারেন।’’ ওই দুটো কম্বলই সারা জীবন পেতে শুয়েছিলেন মুক্তারামবাবুর মেসে। জেল থেকে বেরিয়ে প্রথমেই এলেন সেই মিষ্টির দোকানে। সেই ২০টা রসগোল্লার টাকাটা শোধ করতে। কিন্তু তাঁকে দেখেই সেই মিষ্টির দোকানদার চিৎকার করে উঠলেন – ‘টাকা চাই না। দয়া করে বোম মারবেন না! আপনার যত মিষ্টি লাগে খান। পয়সা লাগবে না।’ উল্টে আরও ২০টা রাজভোগ খাওয়ালেন। শিবরাম কিন্তু দ্বিতীয়দিন আর ওই মিষ্টির দোকানে যাননি। লিখলেন – ‘ধারের ধার বেশি না ধরাই ভাল।’
১৩৪ মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটের একটি ছোট্ট মেসঘরের নির্জন কক্ষ। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে সেই কক্ষে থেকেছিলেন। কক্ষের দেওয়ালটাই ছিল বেহিসেবী শিবরামের হিসাবের খাতা। সারা দেওয়াল জুড়ে হিসাব। শিবরাম লিখছেন, ‘অমুককে টাকা দিলাম। সে কৃতজ্ঞচিত্তে বলল, শিবরাম ভায়া আমাকে তুমি চিরঋণী করলে।’ বলাবাহুল্য সে আর কোনদিনই শিবরামের ঋণ শোধ করত না। আর শিবরাম লিখলেন, ‘সত্যিই তুমি আমার কাছে চিরঋণী হয়েই রইলে।’ দেওয়ালে অজস্র নাম-ঠিকানা ফোন নম্বর নেয় কিছু বললে শিবরামের অকাট্য যুক্তি, ‘খাতা হারিয়ে গেলেও দেওয়াল হারানোর কোনও সুযোগ নেই।

একবার দিনদুপুরে ধুপকাঠি বিক্রেতা হয়ে এক চোর ঢুকল শিবরামের মেসের ঘরে। কোনও কালেই তালা দেন না! চোর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছুই পেল না।’ সন্ধেবেলা শিবরাম ঘরে ঢুকে দেখে জামাকাপড়, লেখার কাগজপত্র, কম্বল-বালিশ সব তছনছ। আর তক্তপোশের ওপর রাখা একটি দশটাকার নোট এবং এক প্যাকেট ধূপকাঠি আর একটি চিঠি। চিঠিতে লেখা, ‘ভাই তোমার ঘরে চুরি করতে এসে দেখলাম তোমার অবস্থা আমার থেকেও খারাপ। কাজকম্ম বোধহয় কিছুই কর না। এই দশটা টাকা রেখে গেলাম। এই টাকায় এই কোম্পানির ধূপকাঠি কিনে ফেরি কর। এইভাবে কত দিন চলবে? আমার পরামর্শ মানলে জীবনে উন্নতি করবে।’

একদিন এক লেখক মেসে এসেছেন। শিবরামবাবুর তাঁর সঙ্গে একটা সভায় যাওয়ার কথা। লেখককে বললেন, আমার এই তক্তাপোশে পা তুলে বস। কারণ এর তলায় কী কী জন্তু জানোয়ার আছে তা আমি জানি না। ঘাঁটাইনি কোনও দিন। সাপও থাকতে পারে। আমি আমার ড্রেসিং রুম থেকে আসছি। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ড্রেসিংরুমটা কোথায়? বললেন, ওই যে রাস্তার ওপারে যে লন্ড্রিটা রয়েছে ওইটা। আমি ওখানে গিয়ে আমার এই ধুতি আর পাঞ্জাবিটা ছেড়ে দেব। আর যেটা কেচে রেখেছে সেটা পরে চলে আসব। দুটো সেট। কোনও ঝামেলা নেই। বাক্সপ্যাঁটরা নেই। বুঝলে, একেই বলে আপনি আর কোপনি। জীবনটাকে হালকা কর। রেল কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখেছ? ট্রাভেল লাইট।
অন্যরা হয়তো ভাবতেন তিনি খুব কষ্টে আছেন কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন ‘ফার্স্টক্লাস’। আর তা কতটা সত্য তা এই পোস্টের শেষের অনুচ্ছেদই বলে দেবে। একবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে গিয়ে কিছু যুবক বলল, শিবরামবাবু ফুটপাতে শুয়ে আছেন। ব্যাপারটা কি বোঝা যাচ্ছে না। সুনীল সদলবলে হাজির। এসে দেখলেন শিবরাম ধুতি পাঞ্জাবি পরে সটান শুয়ে আছেন ফুটপাতে। সুনীল জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে শরীর খারাপ? শিবরামের বক্তব্য, “ না না। ফার্স্টক্লাস আছি। আসলে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হল ফুটপাতে শুয়ে আকাশটাকে কেমন দেখতে লাগে একবার তা দেখাই যাক।”

সেদিন প্রবল জ্বর। দুর্বল শরীরে বাথরুমে মুখ থুবড়ে পড়লেন। ভর্তি করা হল হাসপাতালে। ১৯৮০ সালের ২৮ আগস্ট। ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করলেন ‘এখন কেমন লাগছে?’ জড়ানো কণ্ঠে শিবরামবাবু বললেন – ‘ফার্স্টক্লাস’! এটাই ছিল তাঁর শেষ কথা। তার পাঁচ মিনিট পরেই সবাইকে কাঁদিয়ে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন হাসির রাজা।

তথ্যসূত্র


তথ্যটি সংবাদ/সামাজিক মাধ্যমে প্রাপ্ত, সববাংলায় এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করে দেখেনি।
Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।