ধর্ম

সালকিয়ার শীতলা মাতার স্নানযাত্রা

উত্তর হাওড়ার একটি শতাব্দী প্রাচীন জনপদ হল সালকিয়া।সালকিয়ার সবথেকে প্রসিদ্ধ মন্দির বড় শীতলা মাতার মন্দির। সালকিয়ায় বড়, মেজ, সেজ এবং ছোট শীতলা মাতার মন্দির রয়েছে। প্রতি বছর মাঘ মাসের মাঘি পূর্ণিমার দিনে  ছয় বোন সহকারে শীতলা মাতার স্নানযাত্রা বের হয়। সালকিয়ার বুকে ঘটা সবথেকে প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ ধর্মীয় শোভাযাত্রা হল এই শীতলা মাতার স্নান যাত্রা। এই শোভাযাত্রা উপলক্ষে সালকিয়া এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে লাখ লাখ পুণ্যার্থীর সমাগমে সরগরম হয়ে ওঠে এই দিন সমগ্র সালকিয়া।

স্নান যাত্রার দিনে সব শীতলা মাতাদের মন্দির থেকে সাজানো পালকিতে করে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় একমাত্র  ছোট শীতলা মাতা ছাড়া।ছোট  শীতলা মাতাকে মন্দির থেকে বের করা হয় না।স্নান যাত্রার দিনে ছোট শীতলা মাতার সঙ্গে দেখা করানোর জন্যে অন্যান্য শীতলা মাতাদের  ছোট শীতলা মাতার মন্দিরে আনা হয়।ছোট শীতলা মাতাকে মন্দিরের বাইরে বের না করার বিষয়ে বেশ কিছু প্রচলিত গল্প আছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী –  ছোট  শীতলা মাতা কে মন্দির থেকে বাইরে বের করে নিয়ে গেলে মাতা নাকি হারিয়ে যান। একবার  মাতা নিজের সহদরা বোনেদের সঙ্গে  স্নান করতে গেছিলেন সেখানে  ওনাকে কেউ দেখে নিয়েছিল আর তারপর থেকেই মনে করা হয় ওনাকে মন্দির থেকে বাইরে বের করে নিয়ে যাত্তয়া বন্ধ হয়ে যায় । এখন স্নান যাত্রার দিনে ছোট শীতলা মাতার ঘট গঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঘটে গঙ্গাজল ভরে মন্দিরে তা প্রতিস্থাপিত করা হয়।পুরোনো ঘটটিকে স্নানযাত্রার পর থেকে আট দিন রাখা হয়, তারপর সেই ঘটের জল গঙ্গাতে প্রবাহিত করা হয়। স্নানযাত্রার দিনে মাতাকে গোমূত্র দিয়ে শুদ্ধিকরণ করা হয়ে থাকে।শুধু মাত্র এই দিনে মাতাকে স্পর্শ করার অনুমতি মেলে। সারা রাত মাতার পুজো হয়ে থাকে।পরের দিন হয়“ষোল আনা পুজো”।শীতলা মাতার সাত বোনের মূর্তির কোনোটি কাঠ নির্মিত, কেউ  আবার হাঁড়িতে আঁকা।একমাত্র কয়েল বাগানের কয়েলেশ্বরী মা শীতলার মূর্তিটি পাথরের। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই শীতলা মাতা আসলে কে? কোথায়ই  বা এনার উদ্ভব? স্কন্দপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অনুযায়ী  দেবী শীতলার উদ্ভব যজ্ঞের আগুন থেকে।আবার অন্য একটি সূত্র অনুযায়ী দেবী দুর্গা কাত্যায়ন মুনির ছোট মেয়ে হয়ে জন্ম নেন এবং এই শীতলা মাতা আসলে দেবী দুর্গারই আরেক রূপ।শীতলার জন্ম প্রসঙ্গে আরও দুটি কাহিনি প্রচলিত আছে।একটি কাহিনি মতে  রাজা পুষ্পদন্তের পালিতা কন্যা হিসাবে শীতলার জন্ম হয়।দেবীর এই রূপ  শ্যামবর্ণ। নহুষ রাজার পুত্রেষ্টি যজ্ঞ থেকে জন্ম নেওয়া শীতলা কৃষ্ণবর্ণ এবং ভগবতী অংশে যে শীতলার দেখা পাওয়া যায়  সেখানে দেবী রক্তবর্ণা।ব্রহ্মার কন্যা এবং কার্ত্তিকেয়ের স্ত্রী হিসেবেও শীতলার উল্লেখ পাওয়া যায়।

দেবী শীতলার সহচর হল জ্বরাসুর। শিবের উষ্ণ ঘাম  থেকে জন্ম হয় এই জ্বরাসুরের। শীতলার উল্লেখ এমনকী বৌদ্ধধর্মেও পাওয়া যায়,সেখানে দেবী রোগব্যাধির প্রধান দেবী পর্ণ-শর্বরীর সঙ্গী।শীতলা ও শীতলামঙ্গল নিয়ে বাংলায় গবেষণা করেছেন তারাশিস মুখোপাধ্যায়, পুষ্প অধিকারী, পঞ্চানন মণ্ডল, ত্রিপুরা বসু, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, অমলেন্দু ভট্টাচার্য, দ্বিজ হরিদেব, কবি জগন্নাথ, কবি বল্লভ, কৃষ্ণরাম দাস প্রমুখরা।দেবী শীতলা ভারতবর্ষে পূজিত হন প্রধানত গুটিবসন্তের দেবী হিসেবে।আয়ুর্বেদ মতে এই গুটি বসন্তের আরেক নাম মসূরিকা। জে জেড হলওয়েল, জন মুর,সি এইচ বাক প্রভৃতি ঐতিহাসিকদের গবেষণায় আমরা জানতে পারি ‘শীতলা বা মাতা হলেন সাত বোনের এক গোষ্ঠীর নেত্রী, এই সাত দেবীই মহামারী ঘটিয়ে থাকেন এবং তাঁকে নিয়মিত তুষ্ট করা নারী ও শিশুদের দায়িত্ব।’শীতলার সঙ্গে এই সময় পুজো পান কলেরা বা ওলাউঠার দেবী ওলাদেবী, চর্মরোগের দেবী ঘেঁটু, রক্তের সংক্রমণ জনিত রোগের দেবী রক্তদেবী।

দেবী শীতলার বাহন হল গাধা। এ কথা প্রচলিত আছে যে অন্যান্য তথাকথিত 'কুলীন' দেবীরা ভাল ভাল বাহন দখল করে নেওয়ার ফলে দেবী শীতলার ভাগ্যে কেবল গাধাই জোটে।আবার বাহন হিসেবে গাধা নির্বাচনের একটি বৈজ্ঞানিক দিকও আছে বলে মনে করা হয়।আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, গাধার দুধ বসন্ত রোগ প্রতিরোধ করে বলেই ওই বাহন নির্দিষ্ট হয়েছে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকায় এর সমর্থন রয়েছে।ডা. খগেন্দ্রনাথ বসু লিখেছেন, ‘বসন্ত রোগে গর্দ্দভী-দুগ্ধ বিশেষ হিতকরী এবং প্রতিষেধক।... সমস্ত জন্তুর বসন্ত রোগ হইতে পারে, কিন্তু গর্দ্দভের কখনও হইতে শুনা যায় না।’ (বসন্ত ও হাম চিকিৎসা, চতুর্থ সং, ১৩৬৫ বঙ্গাব্দ)।

কেবল ফাল্গুনেই যে শীতলা পূজা হয় এমন মোটেও ভাবার কারণ নেই।এই দেবীর পূজা সারা চৈত্র মাস  জুড়ে মঙ্গল ও শনিবার পূজা হয়। হাওড়া-সহ দক্ষিণবঙ্গের অনেক জেলায় প্রধানত চৈত্র মাসে হয়ে থাকে।হাওড়ার শ্যামপুরের শিবগঞ্জ গ্রামে এই পূজা একমাস ধরে খুব ধুমধামের সাথে হয়ে থাকে। কলকাতার বেলগাছিয়ায় শ্রীশীতলা মন্দিরের পূজা হয় সারা চৈত্র মাস।তবে ভারতের অনেক অঞ্চলেই মাঘের দ্বিতীয় পক্ষে শীতলা ষষ্ঠী পালিত হয়ে থাকে।পঞ্জাব সহ বেশ কিছু অঞ্চলে জ্যৈষ্ঠের সপ্তম দিনটি শীতলা পুজোর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়, গুজরাতে আবার এ পুজো হয় শ্রাবণ মাসে। শীতলা পুজোয় ঠান্ডা খেতে হয়, আগুন জ্বলে না। শীতলার প্রকৃত রূপ  কেমন সেটা কিন্তু অঞ্চলভেদে একেকরকম।এ কথা মনে করা হয়ে থাকে অনার্যরা শীতলা হিসেবে পাথরখণ্ড বা কলসির পুজো করে থাকত যেমন, তেমন  বহু জায়গা রয়েছে যেখানে শীতলা পূজিত হয়েছেন একটি কালো পাথর রূপে।ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে অবশ্য  শীতলার রক্তাম্বরা  রূপের কথা আছে যেখানে তার বাহন ময়ূর,এক হাতে ধরা থাকে একটি মোরগ। অবশ্য অঞ্চলভেদে  রূপেরও তারতম্য আছে।গোটা দেশে শীতলাই সম্ভবত একমাত্র দেবী যিনি একটি নামেই সর্বত্র  পূজিত হন।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!