ইতিহাস

সুধীর চক্রবর্তী

একাধারে অধ্যাপক, লেখক, গবেষক এবং লোকসংস্কৃতির বিশেষজ্ঞ সুধীর চক্রবর্তী (Sudhir Chakraborty)’বাংলার লোকসংস্কৃতির মুখ’। তিনি  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজের মতো বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত ছিলেন। মূলত বাংলার লোকসংস্কৃতিকেন্দ্রিক গবেষণায় তিনি বাংলার বাউল কথা ও হারিয়ে যাওয়া সম্প্রদায়কে গুরুত্বপূর্ণ স্হান দিয়েছেন। প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি সংগ্রহ করে এনেছেন অজস্র লোকগান। লোকসংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং বাংলা আধুনিক গান নিয়ে লেখা তাঁর বইগুলি সুচিন্তক এবং দার্শনিক সুধীর চক্রবর্তীকে পাঠকের সামনে তুলে ধরে। ২০০২ সালে তাঁর লেখা ‘বাউল ফকির কথা’ বইটির জন্য ‘আনন্দ পুরস্কার’ ও ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কারে সম্মানিত হন সুধীর চক্রবর্তী। আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন লোকসংস্কৃতির কথক তিনি।

১৯৩৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর হাওড়া জেলার শিবপুরে সুধীর চক্রবর্তীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রমাপ্রসাদ চক্রবর্তী এবং মায়ের নাম বীণাপানি চক্রবর্তী। সুধীর চক্রবর্তী তাঁর বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার জাপানি বোমাঙ্কতের কারণে কলকাতা ছেড়ে নদীয়া জেলায় এসে বসতি গড়ে তোলে। প্রথমে দিগনগরে এবং পরে কৃষ্ণনগরে ছিলেন সুধীর চক্রবর্তী এবং তাঁর পরিবার। কৃষ্ণনগরে থাকাকালীন তাঁর আশেপাশের পরিবেশ তাঁকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর পাড়া-পড়শিরা ছিলেন বিভিন্ন জাতি ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। তাঁদের জীবনযাপনের ধরন ছোট্ট সুধীরের মধ্যে বৈচিত্র্যের সন্ধান এনে দিয়েছিল যা পরবর্তীকালে তাঁর জীবনে প্রভাব বিস্তার করে। অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছোটোবেলার নানা সংস্কৃতিই তাঁকে মানুষের জীবনযাপন নিয়ে গবেষণার প্রেরণা দিয়েছিল। কলকাতা ও কৃষ্ণনগর এই দুই জায়গাতেই তাঁর বাসস্থান ছিল বলে নিজেকে তিনি  মজা করে ‘কৃষ্ণকলি’ বলে পরিচয় দিতেন।

ছোটোবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন। দিগনগরে এসে তিনি ভর্তি হন আসার প্রাইমারি স্কুলে। এরপর ১৯৪২ সালে ভর্তি হন কৃষ্ণনগরে দেবনাথ স্কুলে। এই স্কুল থেকেই ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি এবং তারপরে ভর্তি হন কৃষ্ণনগর কলেজে। এখান থেকে স্নাতক হওয়ার পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি হন। এখানেই বাংলা বিভাগে তিনি সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে যিনি পরবর্তীতে বিখ্যাত অভিনেতা হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হয়ে লোকধর্ম, লালন, বাংলা কাব্যগীতি, সংস্কৃতি-নৃতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন সুধীর চক্রবর্তী।

১৯৫৬ সাল থেকে তিনি অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন বরিষার বিবেকেনন্দ কলেজে। সারাজীবন নিষ্ঠাভরে গভীর প্রাজ্ঞ মননে তিনি অধ্যাপনার কাজ করে গিয়েছেন। ১৯৬০ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ানোর সুযোগ পেয়েও তিনি কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন। এই কলেজে দীর্ঘদিন তিনি অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৯৯ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যুক্ত ছিলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যাময়ে তুলনামূলক সাহিত্যে দু’বছর এবং হাবড়া শ্রীচৈতন্য কলেজে স্নাতকোত্তর বাংলা বিভাগে অতিথি অধ্যাপক ছিলেন সুধীর চক্রবর্তী। এছাড়াও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টার ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’-এ কিছুদিন অতিথি অধ্যাপক পদে আসীন ছিলেন তিনি।

সুধীর চক্রবর্তীর কর্মজীবন বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রসারিত। তাঁর ভালোবাসার বিষয়ের মধ্যে ছিল গ্রাম্যজীবন ও গান। ছোটোবেলা থেকেই জীবনের পারিপার্শ্বিক ঘটনা ও মানুষজন প্রভাব বিস্তার করেছিল তাঁর মননে। পরবর্তীতে সেই প্রভাবই তাঁকে লোকসংস্কৃতির বিষয়ে আগ্রহী করে তোলে। তিনি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেরিয়ে বাংলার লোকসংস্কৃতি ও কর্তাভজা, সাহেবধর্মী, বলরামধর্মী সম্প্রদায়ের মতো লুপ্তপ্রায় গোষ্ঠীর হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি নিয়ে তিরিশ বছর ধরে গবেষণা করে প্রভূত তথ্য সংগ্রহ করেন এবং তার উপরে আশিটিরও বেশি বই লেখেন যে গ্রন্থগুলি বাংলার লোকসংস্কৃতিকে জানার ও বোঝার জন্য আদর্শ গ্রন্থ। সেই কারণেই তাঁর গ্রন্থে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, সমাজ, সংস্কৃতি ও দেশকালের কথা আমরা দেখতে পাই। তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত হয় কৃষ্ণনগরে কলেজজীবনে থাকাকালীন। সুধীর চক্রবর্তীর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ‘পথে যেতে যেতে’। এরপর জীবনানন্দ দাশের উপরে লেখা প্রবন্ধ ‘হোমশিখা’ প্রকাশিত হয়। ‘দেশ’ পত্রিকায় তিনি পঞ্চাশটিরও বেশি প্রবন্ধ লিখেছেন। প্রবন্ধকে তিনি গুরুগম্ভীর খোলসের আবরণ থেকে মুক্ত করে সরল ও লাবণ্যময় ভাষায় এক নতুন রূপ দিয়েছিলেন। লোকসংস্কৃতি ছাড়াও তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ রায়। তাঁর লেখা বইগুলির মধ্যে বেশ কিছু বই রবীন্দ্রনাথের গান ও আধুনিক বাংলা গান নিয়ে লেখা।

সুধীর চক্রবর্তীর সমস্ত রচনাগুলিকে মূলত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমভাগ হল বাউল, ফকির, গৌণধর্ম এবং লোকায়ত ধারার সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে পর্যালোচনা। এই বিষয়ে তাঁর লেখা গবেষণামূলক গ্রন্থগুলি হল ‘ব্রাত্য লোকায়ত লালন’ (১৯৯২), ‘বাউল ফকির কথা’ (২০০১), ‘বাংলার গৌণধর্ম : সাহেবধনী ও বলাহাড়ী (২০০৩), ‘উৎসবে মেলায় ইতিহাসে’ (২০০৪) ইত্যাদি। এর মধ্যে ‘ব্রাত্য লোকায়ত লালন’ বইটি লালন ফকিরকে নিয়ে লেখা তাঁর একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। লালন গবেষকদের কাছে এটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ। বাংলার লোকায়ত দর্শন ও সংস্কৃতি জানা কিংবা বোঝার জন্য এই গ্রন্থগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ভাগে বাংলা গানের ধারাকে নিয়ে তাঁর অনুভব ও বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থগুলি রয়েছে। শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতের অজানা অনেক তথ্য নয়, বাংলা গানের নানান ধারার সঙ্গে বাঙালি পাঠককে তিনি পরিচিত করিয়েছেন। আধুনিক গান ও ভারতীয় গানের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বহু অজানা তথ্য খুঁজে বের করেছেন। এই পর্বের গ্রন্থগুলির মধ্যে ‘নির্জন এককের গান রবীন্দ্রসংগীত’ (১৯৯২), ‘রবীন্দ্রনাথ অনেকান্ত'(২০১০), ‘এলেম নতুন দেশে’ (২০১৯) প্রভৃতি গ্রন্থগুলি উল্লেখযোগ্য। তৃতীয় পর্বের রচনায় এসেছে বাংলা গানের বিভিন্ন ধারা ও তাঁদের সৃষ্টির ইতিহাস। এই পর্বের গ্রন্থগুলির মধ্যে  ‘আধুনিক বাংলা গান’ (১৯৮৭), ‘বাংলা দেহতত্ত্বের গান’ (১৯৯০), ‘জনপদাবলী : হইবাদী লোকায়ত মানবমুখী বাংলা গানের সংকলন’ (২০০১), ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি সমগ্র’ (২০০৮), ‘বাংলা ফিল্মের গান ও সত্যজিৎ রায়’ (১৯৯৪),  ‘শতগানের গানমেলা’ (২০১৭), ‘একশো গানের মর্মকথা’ (২০১৯)  প্রভৃতি উল্লেখ্যযোগ্য। শেষ দুটি গ্রন্থে তিনি বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিসহ দুশোটি বিভিন্ন গানের নির্মাণের প্রেক্ষাপট বর্ণনার সঙ্গে এই গানগুলির সুন্দর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখা ও নিঁখুত পর্যবেক্ষণ সহকারে সহাবস্হান করেছে। চতুর্থ পর্বে রয়েছে তাঁর সাহিত্যবিযয়ক গ্রন্থগুলি যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘সাহিত্যের লোকায়ত পাঠ’ (২০১৩), ‘পঞ্চগ্রামের কড়চা’ (১৯৯৫), ‘কৃষ্ণনাগরিকের কত কথা’ (২০১৭) ইত্যাদি। এই গ্রন্থগুলিতে তিনি গ্রাম ও জনজীবনকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাহিত্যের বিবরণ দিয়েছেন। ‘একান্ত আপন’ এবং ‘দ্বিরালাপ – নির্বাচিত সাক্ষাৎকার’ (২০১৫) এই দুটি গ্রন্থে মূলত সুধীর চক্রবর্তী ব্যক্তিজীবনের কথা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘গভীর নির্জন পথে’ যেখানে তিনি বাউল সম্প্রদায়ের জীবন ও সংস্কৃতিকে এক অন্য আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। শেষ এবং পঞ্চমভাগে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ও গ্রন্থগুলিকে রাখা হয়। তিনি দীর্ঘ বারো বছর বাংলা সংস্কৃতির বাহক লিটল ম্যাগাজিন ‘ধ্রুবপদ’ সম্পাদনা করেছেন। এই পত্রিকার সমস্ত বিযয়গুলি নিজেই দেখাশোনা করতেন তিনি। সম্পাদনা, বিষয় ও লেখক নির্বাচন, প্রুফ দেখা থেকে শুরু করে পরিমার্জন ও পূনর্লিখনের কাজগুলি একাই সম্পন্ন করতেন সুধীর চক্রবর্তী। নতুন লেখকদের তিনি সুযোগ দিতেন। নিজে কেবলমাত্র ‘আত্মপক্ষ’ বিভাগে লিখতেন। কিন্তু নিজেই একসময় এই পত্রিকা সম্পাদনা বন্ধ করে দেন তিনি। এছাড়াও তিনি ‘বাংলার বাউল ফকির’, ‘বুদ্ধিজীবির নোটবই’, ‘যৌনতা ও সংস্কৃতি’, ‘গবেষণার অন্তরমহল’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলি সম্পাদনা করেন।

সুধীর চক্রবর্তী লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৯৩ সালে ‘শিরোমণি পুরস্কার’, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৫ সালে ‘আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন’ পুরস্কার, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে ‘নরসিংদাস পুরস্কার’-এ ভূষিত হন সুধীর চক্রবর্তী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘সরোজিনী বসু স্বর্ণপদক’ পুরস্কারে সম্মানিত করে ২০০২ সালে। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে তিনি ‘সুকুমার সেন স্বর্ণপদক’ লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। ‘বাউল ফকির কথা’ গ্রন্থের জন্য ২০০২ সালে ‘আনন্দ’ পুরস্কার পান তিনি এবং ঐ একই গ্রন্থের জন্য তিনি ২০০৪ সালে ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সুধীর চক্রবর্তীর মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।