ইতিহাস

বৈদ্যনাথ মিশ্র

বৈদ্যনাথ মিশ্র (Vaidyanath Mishra) একজন খ্যাতনামা হিন্দি এবং মৈথিলী কবি যিনি নাগার্জুন নামে বেশি পরিচিত ছিলেন৷ কেবল কবিতাই নয় তিনি ছোটোগল্প, জীবনী এবং ভ্রমণ বৃত্তান্ত রচনাও করেছেন৷ তিনি ‘জনকবি’ নামেও খ্যাত। মৈথিলী ভাষার সবথেকে শক্তিশালী কবি বলা হয় তাঁকে।

১৯১১ সালের ৩০ জুন বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার তারাউনি গ্রামে বৈদ্যনাথ মিশ্রর জন্ম হয়৷ দ্বারভাঙ্গা জেলায় জন্ম হলেও তাঁর ছোটবেলার বেশীরভাগ সময় মধুবনী জেলায় কেটেছে৷ পরবর্তী সময়ে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলে তাঁর নাম হয় নাগার্জুন৷ তাঁর বয়স যখন মাত্র তিন বছর তখন তাঁর মায়ের মৃত্যু ঘটে৷

বৈদ্যনাথ মিশ্রের প্রাথমিক পড়াশোনা স্থানীয় বিদ্যালয়েই হয়েছিল৷ ছোটো থেকেই মেধাবী হওয়ার কারণে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পেয়েছিলেন৷ তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা ভবঘুরে হয়ে পড়েন। ফলে ছোট বইদ্য তাঁর দিকে বিশেষ নজর দেন নি, আত্মীয় স্বজনদের দেখাশোনায় তিনি বড় হয়ে ওঠেন৷ তিনি খুব কম সময়ের মধ্যেই প্রাকৃত, পালি ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন৷ তারপর বৈদ্যনাথ মিশ্র প্রথমে বারানসী ও তারপর কলকাতায় গিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন৷ পড়াশোনা করতে করতেই তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করে দিয়েছিলেন৷ মৈথিল তাঁর মাতৃ ভাষা হলেও তিনি হিন্দি, সংস্কৃত এর পাশাপাশি বাংলা লিখতে ও পড়তে পারতেন৷

বৈদ্যনাথ মিশ্রর কর্মজীবন বলতে তাঁর সাহিত্যজীবনের কথাই বোঝায়৷ ১৯৩০ এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি ‘যাত্রী’ ছদ্মনামে মৈথিলি কবিতা লিখে তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু করেন। ১৯৩০ এর মাঝামাঝি সময়ে তিনি হিন্দি ভাষায় কবিতা লেখা শুরু করেন৷ সেই সময় পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে তাঁর প্রথম স্থায়ী চাকরির জন্য তাঁকে উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে যেতে হয়৷ তিনি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের প্রতি গভীরভাবে অাকৃষ্ট হয়েছিলেন৷ বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে বৌদ্ধ লিপি পাঠের উদ্দেশ্যে শ্রীলঙ্কার কেলানিয়ায় বৌদ্ধ বিহার ভ্রমনে যান এবং ১৯৩৫ সালে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে ঐ মঠে প্রবেশ করে বৌদ্ধ লিপি পাঠ করেন তিনি৷ তাঁর গুরু রাহুল সাংকৃত্যায়নও একই ভাবে এই মঠে এসেই বৌদ্ধ লিপি পাঠ করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের পর তিনি নাগার্জুন নামটি গ্রহণ করেন৷ বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের পাশাপাশি তিনি লেনিনবাদ এবং মার্কসবাদও পড়েছিলেন৷ ১৯৩৮ সালে ভারতে ফিরে আসার আগে প্রখ্যাত কৃষক নেতা কিষাণ সভার প্রতিষ্ঠাতা সহজনানন্দ সরস্বতীর আয়োজিত ‘সামার স্কুল অফ পলিটিক্স’-এ যোগদান করেন তিনি। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন প্রান্তরে তিনি ঘুরেছিলেন৷ তিনি স্বাধীনতার আগে ও পরে বহু গণ-জাগরণ আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে বিহারে ঘটে যাওয়া কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ আদালত তাঁকে কারাগারে বন্দী করেছিলেন। স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জরুরী অবস্থাকালীন সময়ে তিনি জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এগারো মাস জেল খাটেন। লেনিনবাদ ও মার্কসবাদ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

তাঁর কবিতার বিষয় ছিল বৈচিত্র্যময়৷ তিনি প্রায়ই সমসাময়িক সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখেছেন৷ তাঁর লেখা বিখ্যাত কবিতা ‘বাদল কো গিরতে দেখা হ্যায়’। এছাড়া ‘মন্ত্রা কবিতা;, ‘আও রানী হম ধোয়েগি পাল্কি’ কবিতাদি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর প্রতি ব্যঙ্গ করে লেখা হয়েছে৷ চিরাচরিত বিষয়গুলি থেকে সরে গিয়ে অন্যরকম কবিতা রচনা করেছিলেন তিনি৷ তুলসী দাসের পর নাগার্জুন হলেন এমন একজন কবি যিনি কাব্যকে সমাজের সর্বস্তরে বিচরণ করিয়েছিলেন৷

বৈদ্যনাথ মিশ্র মৈথিলী ভাষায় ‘পত্রাহীন নগ্ন গাছ’ নামক ঐতিহাসিক কবিতার বই লেখার জন্য ১৯৬৯ সালে সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন৷ উত্তর প্রদেশের সরকার তাঁকে ‘ভারত ভারতী অ্যওয়ার্ড’ -এ ভূষিত করেন৷ ১৯৯৪ সালে আজীবন কৃতিত্বের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য একাডেমি ফেলোশিপ দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করা হয়।

বৈদ্যনাথ মিশ্রের লেখা আরও কিছু কবিতা হল, ‘কাল ওর আজ’, ‘হাজার হাজার বাহো ওয়ালী’, ‘রত্নাগর্ভা’, ‘ভুল যাও পুরানে স্বপ্নে’, ‘ফসল’, ‘আকালনওর উসকে বাদ’৷ তাঁর লিখিত উপন্যাসগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘রথী নাথ কি চাচি’, ‘জামানিয়া কা বাবা’, ‘ইমারতিয়া’, ‘অভিনন্দন’। মৈথিলী ভাষায় রচিত তাঁর কবিতা সংকলন ‘চিত্রা’। তাঁর রচিত উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘পপারো’, ‘নভতুরিয়া’ ইত্যাদি।

বৈদ্যনাথ মিশ্রর ১৯৯৮ সালের ৫ নভেম্বর মৃত্যু হয়৷

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।