ইতিহাস

বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং

শ্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং(Vishwanath Pratap Singh) ভারতের অন্যতম রাজনৈতিক নেতা এবং সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। তিনি ভি পি সিং নামেও পরিচিত। তবে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার্যকাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর জন্য তিনি ‘মন্ডল কমিশন’ বাস্তবায়িত  করার কথা ঘোষণা করেছিলেন।

১৯৩১ সালের ২৫ জুন ভারতের এলাহাবাদের বেলান নদীর তীরে দইয়া অঞ্চলে রাজপুর জমিদারের বাড়িতে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান। মন্ডার রাজা গোপাল সিং তাঁকে দত্তক নিয়েছিলেন। উত্তরাধিকারী হিসেবে মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি মন্ডার রাজা হয়েছিলেন।

বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং দেরাদুনের কর্নেল ব্রাউন কেমব্রিজ (Colonel Brown Cambridge School) স্কুল থেকে পড়াশুনা করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলাবিদ্যা এবং আইনে স্নাতক হন এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্গুসন কলেজ থেকে তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন।

বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এলাহাবাদের কোরাওতে ‘গোপাল বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  ১৯৪৭-১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন বারাণসী কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের  ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি ছিলেন।  ১৯৫৭ সালে তিনি সক্রিয়ভাবে ভূ-দান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং এলাহাবাদের পাশনা গ্রামের একটি উর্বর কৃষিক্ষেত্র উৎসর্গ করেন।

রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিকে তিনি ছিলেন অখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য (১৯৬৯-১৯৭১)। ঐ সময় (১৯৬৯-১৯৭১) তিনি উত্তরপ্রদেশ বিধানসভারও  সদস্য ছিলেন।  ১৯৭১-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত লোকসভার সাংসদ হিসেবে কাজ করেন তিনি। এরপর ১৯৭৪ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাণিজ্য উপমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৬ সালের নভেম্বর মাস থেকে পরের বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছিলেন। ১৯৮০  সালের ৩ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত লোকসভার সাংসদ ছিলেন। এরপর তিনি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হন।‌ ১৯৮০ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৮২ সালের ২৮ জুন পর্যন্ত তিনি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন। ১৯৮০-১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তর প্রদেশের বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন। এরপর ১৯৮১-১৯৮৩ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত তিনি উত্তর প্রদেশ বিধানসভার সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি বেশ কিছুদিন কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে কেন্দ্রীয় সরবরাহ দপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।  ১৯৮৩ সালের ১৬ জুলাই তিনি রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এর পরের বছর তিনি উত্তর প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ওই বছরই অর্থাৎ ১৯৮৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। অর্থমন্ত্রী পদে থাকাকালীন তিনি সোনা পাচারে নিয়ন্ত্রণ এনেছিলেন। এই সময় তিনি সোনার উপর ধার্য কর কিছুটা কমিয়ে ছিলেন। এছাড়াও অর্থ দপ্তরের এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টোরেটের হাতে বাড়তি ক্ষমতা দিয়েছিলেন যাতে কর ফাঁকি দেওয়া কমে। এমনকি এজন্য তিনি ধীরুভাই আম্বানি, অমিতাভ বচ্চন সহ বহু নামীদামি ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই সমস্ত শিল্পপতিদের অনেকেই কংগ্রেসকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করেছিলেন। ফলে নেতৃত্বের চাপে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। 

বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং ছিলেন ভারতের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পূর্বসূরি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রাজীব গান্ধী। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং রাজীব গান্ধী সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় থেকেই গান্ধী সরকারের সমালোচক ছিলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে বফোর্স কেলেঙ্কারির অভিযোগ এনেছিলেন। এই ঘটনায় রাজীব গান্ধীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছিল। ফলে তিনি বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংকে মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। পরে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য পদের সঙ্গে লোকসভার সদস্য পদও ত্যাগ করেন।‌

এরপর বিশ্বনাথ প্রতাপ অরুণ নেহেরু ও আরিফ মোহাম্মদের সাথে জনমোর্চা দল গঠন করেন। এলাহাবাদ লোকসভা উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার সংসদে ফিরেছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালের ১১ অক্টোবর জনতা দল গঠিত হয়। এই জনতা দলে জনমোর্চা, জনতা পার্টি, লোকদল, সমাজবাদী কংগ্রেস প্রভৃতি দল সামিল হয়। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এই দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। জনতা দলের উদ্যোগে বিভিন্ন আঞ্চলিক দল, যথা‌ – তেলেগু দেশম, অসম গণ পরিষদ ইত্যাদি নিয়ে জাতীয় মোর্চা গঠন করা হয়। এর আহ্বায়ক, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং, এন টি রামারাও এবং পি উপেন্দ্র।  ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং ভারতের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ‘মন্ডল কমিশন রিপোর্ট’ বাস্তবায়িত করার কথা ঘোষণা করেন। এই রিপোর্টে OBC (Other Backward Classes) দের কর্মক্ষেত্রে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়ে রাম জন্মভূমি বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় এবং এই বিতর্কের ফলে অযোধ্যায় গন্ডগোল শুরু হয়। এগুলি ছাড়াও তাঁর সরকার আরো অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল। এইসময় কাশ্মীরের তৎকালীন হোম মিনিস্টার মুফতি মোহাম্মদ সৈয়দ, যিনি কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তাঁর কন্যাকে কাশ্মীরী সৈন্যরা অপহরণ করে। ফলে তাঁর সরকার অপহরণকারীদের প্রস্তাব মেনে নিয়ে ধৃতদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার ফলে তাঁর সরকার প্রচন্ড সমালোচনার মুখে পড়ে। ১৯৯০ সালে জনতা দল ভেঙে যায় এবং বিজেপি সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে। ফলে এই সরকার ভেঙে যায় এবং ৭ নভেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কার্যকালের মেয়াদ ছিল ১৯৮৯ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভোটে হেরে যান।  ১৯৯৬ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং রাজস্থানের রাজকন্যা সীতা কুমারীকে বিয়ে করেন ১৯৫৫ সালের ২৫ জুন। তাঁদের দুটি পুত্র সন্তান আছে। তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট এবং অপরজন ডাক্তার। 

১৯৯৮ সালে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহের বোনম্যারো ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং তিনি  জনসমক্ষে আসা‌ বন্ধ করে দেন। ২০০৩ সালে সুস্থ হওয়ার পর পুনরায় তিনি জনসমক্ষে বেরোতে শুরু করেন। ২০০৬ সালে তিনি জনমোর্চা দলের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেন। এই দলের সভাপতি হন অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ রাজ বব্বর।‌ কিন্তু পরের বছর নির্বাচনে হেরে গেলে রাজ বব্বর জনমোর্চা দল ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দেন। এরপর তাঁর বড় ছেলে অজেয় সিং দলের হাল ধরেন। অবশেষে ২০০৮ সালের ২৭ নভেম্বর দিল্লির অ্যাপোলো হসপিটালে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।