ইতিহাস

ভোটার কার্ড

ভারতীয় ভোটার আইডি কার্ড (Voter ID Card) বা সচিত্র নির্বাচক পরিচয় পত্র (Electors Photo Identity Card, EPIC)  ভারতীয় নির্বাচন কমিশন দ্বারা জারি করা ১৮ বছর বা তার বেশী বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের জন্য একটি সচিত্র পরিচয় পত্র যা প্রাথমিকভাবে ভারতীয় নাগরিকদের দেশের পুর, রাজ্য ও জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি পরিচয় প্রমাণ হিসাবে কাজ করে। এই পরিচয় পত্র মোবাইল সিম কার্ড কেনা বা পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার সময় সাধারণ পরিচয় পত্র, ঠিকানা এবং বয়সের প্রমাণ হিসাবেও কাজ করে। সড়কপথে বা আকাশপথে নেপাল এবং ভুটান ভ্রমণের সময় পর্যটন নথি (Travel Document)  হিসাবেও গ্রাহ্য হয়ে থাকে । ১৯৯৩ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার টি এন এন সেশানের সময়কালে প্রথম সচিত্র নির্বাচক পরিচয় পত্র বা ভোটার কার্ড সারাদেশে পরিচয় পত্র হিসেবে চালু হয়।

১৯৯৩ সালে প্রথম ছবি সহ ভোটার কার্ডের প্রচলন শুরু হলেও ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনের পর সারা দেশে পশ্চিমবঙ্গ সরকারই প্রথম নির্বাচক তালিকা (voters list) থেকে নকল ভোটারদের নির্মূল করতে এবং সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সচিত্র ভোটার কার্ডের ধারনাটি  উত্থাপন করেছিল। কলকাতা এবং লাগোয়া শহরতলির প্রতিটি আসনের প্রতিটি ভোটারদের জন্য সচিত্র পরিচয় পত্রের প্রস্তাব এনেছিল।  তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক (Chief Election Commissioner) সুকুমার সেন এই প্রস্তাবের প্রতি ভীষণ উৎসাহী ছিলেন এবং প্রাথমিকভাবে এই প্রস্তাবটির কার্যকারিতা ও প্রস্তাব রূপায়নে আনুমানিক ব্যয় কত হতে পারে তা দেখার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে কলকাতার দুটি বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনে সচিত্র ভোটার কার্ডের ব্যবহারিক প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।

সচিত্র ভোটার কার্ডের ধারনাটির মূল বক্তব্য ছিল কোনও ভোটারকে তার ছবি বহনকারী একটি পরিচয় পত্র  সরবরাহ করা এবং তার একটি অনুলিপি(copy) নির্বাচন কমিশনের অফিসে রেখে দেওয়া যা নির্বাচনের সময় ব্যবহার করা। অবশেষে নির্বাচন কমিশন ঠিক করে ১৯৬১ সালে দক্ষিণ পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্রে আসন্ন উপনির্বাচনে এই সচিত্র ভোটার কার্ডের ব্যবহার চালু করা হবে।  তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার কে ভি কে সুন্দরাম ১৯৬২ সালের সাধারণ নির্বাচনের বিষয়ে তাঁর প্রতিবেদনে এই সচিত্র ভোটার কার্ডের প্রথম ব্যবহারের কথা স্মরণ করে লিখেছিলেন সারা ভারত জুড়ে এমনকি কেবল কলকাতাতেও সচিত্র ভোটার কার্ডের ব্যবহার পর্যাপ্ত এবং সাফল্যের সঙ্গে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।  কেবল কলকাতাতেই এই সচিত্র ভোটার কার্ড কলকাতার ৩,৪২০০০ ভোটারের মধ্যে কেবল ২,১৩৬০০ জনকে দেওয়া গেছিল এবং খরচ হয়েছিল প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা।

 সচিত্র ভোটার কার্ডের ধারণাটি শেষ পর্যন্ত কমিশন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল।  বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের দিকটি যেমন কমিশনকে এই প্রকল্প থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছিল তেমনি অধিকাংশ মহিলা ভোটারদের নিজের ছবি পুরুষ বা মহিলা কোন ফটোগ্রাফারের সামনেই তুলতে দেওয়াতে আপত্তিও একটি বড় কারন ছিল। এছাড়াও একটি বড় অংশের ভোটারদের সকাল থেকে সন্ধ্যে কোন সময়েই ছবি তোলার জন্য তাদের বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া কমিশন  কলকাতা উপনির্বাচন থেকে এই শিক্ষা নিয়েছিল যে সঠিক এবং সার্থকভাবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করতে গেলে কলকাতা ও হাওড়া মিলিয়ে পাঁচটি আসনেই করতে হবে এই পাঁচটি আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা কুড়ি লক্ষেরও বেশি। শেষ পর্যন্ত এক প্রকার বাধ্য হয়েই কমিশন এই সচিত্র ভোটার কার্ডের ধারণাটি ত্যাগ করে।

শুরুর দিনগুলিতে ভোটার কার্ড ল্যামিনেট করা সাধারণ কাগজের ওপর কালো কালিতে ছাপা হত। ২০১৫ সাল থেকে ভারত সরকার এ.টি। এম কার্ডের মত পিভিসি রঙিন কার্ড ছাপানো শুরু করে। ভোটার কার্ডের সামনে ভোটারের নাম, তাঁর বেছে নেওয়া কোনও আত্মীয়ের নাম (যেমন তাঁর বাবা বা মা) এবং ভোটারের পরিচয়জ্ঞাপক নম্বর সহ ভোটারের ছবি থাকে। কার্ডের পিছনে ভোটারের বাড়ির ঠিকানাটি তাঁর নির্বাচনী নিবন্ধকরণ কর্মকর্তার স্বাক্ষর সহ ছাপা থাকে। এর সাথে কার্ডের পিছনে ভোটারের নির্বাচনী জেলা এবং তাঁর বিধানসভা কেন্দ্রের কথা উল্লেখ থাকে। সাম্প্রতিক পিভিসি কার্ডে একটি ‘পার্ট নম্বর’ রয়েছে যা ভোটার এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের ভোটারদের তাদের ভোটার তালিকায় শনাক্ত করতে সাহায্য করে।  

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন