বিজ্ঞান

আমাদের কখনো কখনো একঘেয়ে লাগে কেন

একটানা ঘরবন্দী জীবনে একঘেয়ে লাগে – সে স্বাভাবিক। স্কুলে পড়ার সময় পাঠ্যবই, বিশেষ করে অপছন্দের বিষয় অনেকেরই একঘেয়ে লাগে। রোজকার গতে বাঁধা জীবন একঘেয়ে হয়ে আসে অনেকেরই।আবার অনেক সময় পছন্দের কাজও সাময়িক ভাবে একঘেয়ে লাগে। কিন্তু কেন? আমাদের কখনো কখনো একঘেয়ে লাগে কেন? যদি জেনে না থাকেন তাহলে জেনে নিন এবং একঘেয়েমি কাটিয়ে ফেলুন আসল কারণ খুঁজে নিয়ে।

একঘেয়েেমি বা বোরডোম (boredom) এর পিছনে কাজ করে এক সূক্ষ্ম মনোবৈজ্ঞানিক ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। একঘেয়েমি হল একপ্রকার অপ্রীতিকর মানসিক অবস্থা – যখন কোন ব্যক্তি ব্যাপকভাবে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা কাজে আগ্রহ ও মনোযোগ হারায় তখন তাকে একঘেয়ে বা বোর হওয়া বলে।প্রত্যেকের জীবনে বিভিন্ন সময় নানা ভাবে একঘেয়েমি আসে। বিজ্ঞানীরা সমীক্ষা করে দেখেছেন মহিলাদের তুলনায় পুরুষরা বেশি একঘেয়েমির শিকার হন। একঘেয়েমির সাথে জড়িয়ে আছে একাকীত্ব, রাগ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও আবেগ। শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব একঘেয়েমি বাড়িয়ে দেয়। একঘেয়েমি আসে মূলত মানসিক অবসাদ থেকে। কোনো কর্মভার বা অভিজ্ঞতা যদি আগে থেকেই নিশ্চিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক হয়, তাহলে তা একঘেয়েমি ডেকে আনে। কোনো কাজের গতির সাথে ব্যক্তির দক্ষতা মিশে গেলে এবং কাজটির উদ্দেশ্য পরিস্কার বোঝা গেল একঘেয়েমি সহজে আসে না । আবার কাজ দীর্ঘদিন ধরে করলেও যদি প্রতিক্রিয়া (feedback) না আসে তবে সেই কাজ একঘেয়েমির কারণ হয়। ঝুঁকিমুক্ত ও চিরাচরিত কাজ একদিকে যেমন অনেকের পছন্দের তেমনি নতুন ও উৎসাহব্যঞ্জক কাজ অনেকে পছন্দ করেন।সেক্ষেত্রে মনোযোগের অভাব একঘেয়েমির প্রত্যক্ষ কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাদের আত্ম-সচেতনতা কম, নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে পারেন না, বিশেষত যারা এ.ডি.এইচ.ডি (attention deficit hyperactivity disorder) এ ভুগছেন তাদের একঘেয়েমির সমস্যা বেশি।

বাহ্যিক উদ্দীপকের উপর বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল হলে আত্ম-পরিতৃপ্তি করার ক্ষমতা কমে ফলে একঘেয়েমি আসে। কিশোর বয়সে স্ব-শাসনের অধিকার কম থাকায় ইচ্ছেপূরণ ও স্বাধীনতার সুযোগ কম হয় তাই কম বয়সে একঘেয়েমি বেশি দেখা যায়।আবার অনেক গবেষক মনে করছেন একঘেয়েমি আধুনিক জীবনের বিলাসিতা। ফরাসি বিপ্লবের আগে একঘেয়েমি নিয়ে চর্চা হত না। প্রাচীনকালে গুহাবাসী মানুষগুলো জীবন যাপনের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত থাকত তাই তাদের একঘেয়েমীর সুযোগ ছিল না। 

একঘেয়েমি

বর্তমান গবেষণায় জানা গেছে যাদের মস্তিষ্কে ডোপামাইনের মাত্রা স্বাভাবিক ভাবেই কম তারা বেশি একঘেয়েমির শিকার হন। ডোপামাইন এক ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার। স্নায়ুতন্ত্র বিভিন্ন স্নায়ু কোষের মধ্যে বার্তা আদান প্রদান করতে ডোপামাইন ব্যবহার করে।তাই একে রাসায়নিক বার্তাবহও বলা হয়।

যখন আমরা খুব আনন্দে থাকি ও উৎসাহ বোধ করি ডোপামাইন মস্তিষ্কে ওই বিশেষ অনুভূতি বয়ে নিয়ে যায়। যারা প্রায় একঘেয়েমিতে ভোগেন তাদের ডোপামাইনের মাত্রা যথেষ্ঠ কম। এক্ষেত্রে বাইরের উদ্দীপক যথাযথ উদ্দীপনা না দিতে পারলে নিউরোট্রান্সমিটার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করতে পারে না ফলে মন ভালো হয় না। আমাদের মস্তিষ্ক তার কার্যকলাপ ও প্রাপ্ত প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে অনুপ্রেরণা (motivation) পায়।আনন্দদায়ক নতুনত্ব (novelty) মস্তিষ্ককে ডোপমাইন পুরস্কার হিসেবে দেয়। প্রিয়জনের সাথে টেক্সট বিনিময়ের সময় নোটিফিকেশন এলে, এই বাহ্যিক উত্তেজনার জন্য মস্তিকে ডোপামাইন বার্তা দেয় মোবাইল দেখার। দেখে উত্তর দিলে মস্তিস্কে প্রতিসংকেত যায় কাজটা ঠিক সময়মত হয়েছে। এই ধরনের নিউরোকেমিক্যাল পুরস্কার মস্তিস্ক না পেলেই আসে একঘেয়েমি। আমাদের চিন্তা করা, সেইমত কাজ করা। কাজ করে তৃপ্তি পাওয়া। এই পুরো ব্যাপারটাতে মনোযোগ ও মেজাজ প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ডোপামাইন। অর্থাৎ আমাদের মাঝে মাঝে একঘেয়েমি আসার পিছনে ডোপামাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।