বিজ্ঞান

জ্বর হলে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে গেলেও শীত করে কেন

জ্বর হলে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে গেলেও শীত করে কেন

জ্বর হলে আমরা অনেকে ভাবি আমাদের নিশ্চয় কোনো রোগ হয়েছে। কিন্তু জ্বর আসলে কোনো রোগ নয়, রোগের উপসর্গ মাত্র। দেহে যখন রোগজীবাণুর অনুপ্রবেশ ঘটে তখন দেহের প্রতিরক্ষা তন্ত্রটি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। দেহ অভ্যন্তরস্থ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক যন্ত্রটি আবার এই সময় দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়িয়ে এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সুতরাং, বলা যায় অনুপ্রবিষ্ট রোগজীবাণুকে যদি মূল কারণ হিসাবে ধরা হয়, তবে জ্বর হল তারই ফলাফল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে এদিকে শীতে কাঁপছি এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই হয়। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! শীতল ও উষ্ণ অনুভূতি একই সঙ্গে অনুভব করি আমরা। তাহলে আসুন জেনে নেওয়া যাক, জ্বর হলে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে গেলেও শীত করে কেন।

প্রথম যে বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে সেটি হল আমাদের দেহে কোনো রোগ সংক্রমণ হলে অর্থাৎ দেহে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদির মতো মাইক্রো অর্গানিজমের (micro-organism) অনুপ্রবেশ ঘটলে তারা মানবদেহের সাধারণ তাপমাত্রায় বেঁচে থাকলেও তার থেকে উচ্চ তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে না। মানবদেহের তাপমাত্রা বয়স, দিনের সময়, কাজকর্মের ধরন ইত্যাদির সাথে সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে। তবে মানবদেহের তাপমাত্রা সাধারণত ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট ধরা হয়। ৯৭-৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যেই সুস্থ-সবল মানুষের দেহের তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করে। শরীরের তাপমাত্রা যখন নরমাল সেট পয়েন্টের থেকে বেশি হয়, সেই অবস্থাকে আমরা জ্বর বলে থাকি। জ্বর অর্থাৎ ফিভারের আর এক নাম পাইরেক্সিয়া (Pyrexia)। এখন এই যে সেট পয়েন্টের কথা বলা হল, চলুন জেনে নেওয়া যাক সেটি কী? সেট পয়েন্ট হল সেই মাত্রা (Level) যেখানে দেহ তার তাপমাত্রাকে স্থির অর্থাৎ ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট রাখতে পারে। এর থেকে বেশি তাপমাত্রায় মাইক্রো-অর্গানিজমগুলি বেঁচে থাকতে পারে না। দেখা যায়, দেহের সাধারণ তাপমাত্রা এক থেকে দুই ডিগ্রি বৃদ্ধিতেই বেশিরভাগ অনুপ্রবেশকারী জীবাণু মারা যায়। এই কাজটি করে আমাদের দেহে উপস্থিত অনাক্রম্যতা তন্ত্র (Immune System) যা আসলে রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা । এটি একপ্রকার দেহের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যা দেহে কোনো ক্ষতিকারক পদার্থ প্রবেশ করলে দেহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে সেগুলির বিস্তারের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয় যার ফলে সেগুলি আর সংখ্যায় বাড়তে পারে না।

আমাদের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের (Hypothalamus) মাধ্যমে। হাইপোথ্যালামাস দেহের বর্তমান তাপমাত্রা পরীক্ষা করে এবং দেহের সাধারণ তাপমাত্রার সঙ্গে তুলনা করে। যদি দেহের বর্তমান তাপমাত্রা (Current Temparature) সাধারণ তাপমাত্রার (Normal Temparature) থেকে কম হয় তাহলে হাইপোথ্যালামাস নির্দেশ দেয় দেহের তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য। দেহের তাপমাত্রা বলতে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের ও অত্যাবশকীয় আভ্যন্তরীণ অংশগুলির তাপমাত্রাকে বোঝানো হয়।

আমাদের শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকলেও আমাদের শীত করতে থাকে। এটি আসলে সাধারণ শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। শরীরে জীবাণু সংক্রমণ হলে আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস ওই জীবাণুর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দেহের অভ্যন্তরীণ ইন্সুলেটরকে নির্দেশ দেয় শরীরের তাপমাত্রাকে বৃদ্ধি করার জন্য অর্থাৎ নরমাল সেট পয়েন্টের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা তৈরি করতে । শরীরের বাকি অংশ তখন চেষ্টা করে ওই নির্দিষ্ট তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাপমাত্রা বর্ধিত করতে। হঠাৎ তাপমাত্রার এই পরিবর্তনের সঙ্গে দেহ পাল্লা দিতে পারে না। এই সেট পয়েন্ট যখন বেড়ে যায় তখন পেশি সংকোচন শুরু হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের জন্য পেশির সংকোচন এবং কাঁপুনি শুরু হয়। তাই সেই সময় আমাদের শীত লাগতে শুরু করে। জ্বরের সময় সাইটোকাইন (Cytokine) ও প্রোস্টাগ্লান্ডিন (Prostaglandin) শরীরের প্রদাহ জনিত প্রতিক্রিয়ার (Inflamatory Response) ফলে নিঃসৃত হয়। সাইটোকাইন আসলে প্রোটিন, পেপটাইড, গ্লাইকোপ্রোটিনের গ্রুপ যা মানুষের অনাক্রম্যতা তন্ত্রের বিশেষ কোষ থেকে নিঃসৃত হয়। প্রোস্টাগ্লান্ডিন হল লিপিডের গ্রুপ যা শরীরের জরুরি প্রয়োজনে নিঃসৃত হয়। সাইটোকাইন ও প্রোস্টাগ্লান্ডিন মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের তাপমাত্রার সেট পয়েন্ট বৃদ্ধি করে। এই বর্ধিত সেট পয়েন্ট অনুযায়ী তখন দেহের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় পাইরেক্সিয়া (Pyrexia) বলে। যতক্ষণ না পর্যন্ত দেহের তাপমাত্রা নতুন সেট পয়েন্টে পৌঁছায় ততক্ষন পর্যন্ত রোগীর শীত করতে থাকে। নতুন সেট পয়েন্টে দেহের সামগ্রিক তাপমাত্রা পৌঁছে গেলেই রোগীর আর শীত করে না।

মাইক্রো অর্গানিজমের অনুপ্রবেশে দেহের ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতায় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু দেহের তাপমাত্রা সেই হারে বৃদ্ধি পায় না। তাপমাত্রার বৃদ্ধির এই বৈষম্যের কারণেই জ্বর হলে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে গেলেও শীত করে এবং হাইপোথ্যালামাসের নিয়ন্ত্রণে যখন দুটি তাপমাত্রাই একটা সাম্যে (Equillibrium) চলে আসে তখন আর শীতের অনুভূতি থাকে না।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়