খেলা

২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিকে রাশিয়াকে আর ও সি বলা হচ্ছে কেন

আর ও সি

২০২১ সালের ২৩ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে অলিম্পিক। চলবে ৮ আগস্ট, ২০২১ পর্যন্ত। প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হওয়ার রীতিতে গত বছর ছেদ ফেলেছে প্রাণঘাতী কোভিড। ফলে মূল প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে যা স্থগিত হয়েছিল এতদিন এবং অবশেষে ২৩ জুলাই এর শুভ সূচনা হয়েছে। মোট দুশো ছয়টি দেশ এ বছর অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করলেও একমাত্র রাশিয়ার ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ করা গেছে। রাশিয়াকে ২০২১ সালের অলিম্পিকে বলা হচ্ছে আর ও সি (ROC)। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক এই আরওসি কথার তাৎপর্য কি আর কেনই বা রাশিয়াকে এমন নিয়মের অধীনস্থ হতে হল?

আর ও সি (ROC)-র পুরো কথা হল – রাশিয়ান অলিম্পিক কমিটি। ২০২১ সালের অলিম্পিকে অন্যান্য দেশের বহু অ্যাথলিটের পাশাপাশি রাশিয়ার মোট তিনশো পঁয়ত্রিশ জন প্রতিযোগী অংশ নিয়েছেন কিন্তু আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির নিয়মে রাশিয়ান প্রতিযোগীরা কেউ নিজের দেশের নাম, পতাকা ব্যবহার করতে পারবেন না, এমনকি তারা জাতীয় সঙ্গীতও গাইতে পারবেন না। প্রতিযোগিতায় তাদের প্রাপ্ত পদক সবই রাশিয়ান অলিম্পিক কমিটির নামে নথিভুক্ত হবে এবং রাশিয়ার পতাকার থেকে আলাদা একটি পতাকা ব্যবহৃত হবে সরকারিভাবে। ঐতিহাসিকভাবে ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিচিত রাশিয়ার উপর নেমে আসা নিষেধাজ্ঞার কারণেই এই বিশেষ নিয়মের অবতারণা।

২০১৯ সালে ‘ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সি’ চার বছরের জন্য রাশিয়ার উপর সমস্তপ্রকার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এমনকি এই নিষেধাজ্ঞা অনুসারে টোকিও অলিম্পিকের পাশাপাশি ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপেও অংশ নিতে পারবে না রাশিয়া। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ডোপিং-এর অভিযোগ উঠে আসায় সে কারণেই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যদিও বহুদিন ধরেই তদন্তকারীরা এবং কিছু বিরোধী গোষ্ঠী রাশিয়ার বিরুদ্ধে ডোপিং কাণ্ডের অভিযোগ এনেছিল বারবার। ২০১৮ সালে বহু তদন্তের পরে ‘ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সি’ জানায় যে রাশিয়া যদি মস্কো ল্যাবরেটরিকে তাঁদের অ্যাথলিটদের সমস্ত তথ্য দেয় ডোপিং তদন্তের জন্য তবে তাঁদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে আর এর ফলেই জানা যাবে আসলে কতজন অ্যাথলিট প্রতিযোগিতায় অসততা করেছেন। কিন্তু রাশিয়া সেই সময় সেই তথ্যের হেরফের  ঘটানোয় রাশিয়ার উপর চার বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। তাহলে ঠিক কখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে উঠলো ডোপিংয়ের অভিযোগ? চলুন জেনে নিই।

প্রথম ২০১৪ সালে অ্যাথলিট ইউলিয়া স্টেপানোভা এবং তাঁর স্বামী ‘রাশিয়ান অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সি’র পূর্বতন কর্মচারী ভিটালি উভয়ে একটি তথ্যচিত্রে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত একটি সুপরিকল্পিত ডোপিংয়ের কথা বলেন। তারপর ২০১৬ সাল নাগাদ ‘রাশিয়ান অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সি’র প্রাক্তন প্রধান গ্রেগরি রশেনকভও একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী ২০১৪ সালের সোশিতে শীতকালীন অলিম্পিকের সময় অ্যা ন্টি ডোপিং এজেন্সির ল্যাবরেটরি থেকে একটি গোপন ছিদ্র দিয়ে অ্যাথলিটদের সমস্ত প্রস্রাবের নমুনা বদলে দেওয়া হয়েছিল রাশিয়ান গোয়েন্দা বিভাগ এবং দেশের নিজস্ব ডোপিং-বিরোধী সংগঠনের তত্ত্বাবধানে। ক্রীড়া ইতিহাসে যেন বিশাল বোমা বিস্ফোরণ হয়ে গেল গ্রেগরির মন্তব্যে। আর তারপরই আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি, ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সি একত্রে বহু তদন্ত করতে শুরু করে। এর ফলে তদন্ত চলাকালীন রাশিয়ান অ্যান্টি ডোপিং এজেন্সির স্বীকৃতিতে স্থগিতাদেশ জারি করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর রাশিয়ার একশো এগারো জন অ্যাথলিটকে রিও অলিম্পিক থেকে বহিষ্কার করা হয়। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথমে ২০১৮ সালের দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়োজিত শীতকালীন অলিম্পিকে রাশিয়ার যোগদান বাতিল করে দেওয়া হলেও পরে আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থার তরফে বিশেষ বিধানে রাশিয়ার একশো আটষট্টি জন অ্যাথলিটকে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হলেও রাশিয়ান অলিম্পিক কমিটির যোগদানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এমনকি এও বলা হয় রাশিয়ার পতাকা কখনোই ব্যবহার করা যাবে না প্রতিযোগিতায়, তাছাড়া রাশিয়ার নিজস্ব ইউনিফর্ম বাতিল করে সাধারণ একটি পোশাক ধার্য করা হয়। ২০২০ সালে কোর্ট অফ আর্বিট্রেশন অফ স্পোর্টস চার বছরের এই নিষেধাজ্ঞাকে কমিয়ে দু বছর করে এবং জানায় ২০২২ সালে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় রাশিয়া অংশ নিতে পারবে না। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২০ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক, ২০২১ সালের প্যারা-অলিম্পিক, বেজিং শীতকালীন অলিম্পিক এবং ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপেও অংশ নিতে পারবে না রাশিয়া। এই সব ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলিতে রাশিয়ান কোনো অ্যাথলিট নির্বাচিত হলে দেশের নামের বদলে একটি নিরপেক্ষ নাম ব্যবহার করা হবে।

তবে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হচ্ছে না কারণ তিনশো পঁয়ত্রিশ জন রাশিয়ান অ্যাথলিট ২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করছে, তবে তা ‘রাশিয়ান অলিম্পিক কমিটি’র নামে যাকে ‘আরওসি’ বলা হচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞার বলে রাশিয়ান অ্যাথলিটদের নিজের দেশের নাম, পতাকা এমনকি জাতীয় সঙ্গীতও ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না প্রতিযোগিতায়। এছাড়াও উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রতিযোগীদের ইউনিফর্ম, জুতো বা অন্য কোথাও যেন আর ও সি র সম্পূর্ণ নাম লেখা না থাকে আর তা থাকলে পাশে অবশ্যই নিরপেক্ষ প্রতিযোগী কথাটার উল্লেখ থাকা দরকার। তবে প্রতিযোগীদের পোশাকে রাশিয়ান পতাকার রঙ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি।

তিনশো পঁয়ত্রিশ জন রাশিয়ান প্রতিযোগীর উপরে তাই এখন চাপ ক্রমশ বাড়ছে। তাঁদেরকে যে প্রমাণ করতেই হবে ডোপিংয়ের মতো ঘৃণ্য কাজে তারা যুক্ত ছিল না, কখনো যুক্ত থাকেনি। যদিও এর মাঝে তদন্ত থেমে থাকছে না।  


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়