buxa-fort

ডুয়ার্স ডায়রি ।। সপ্তম পর্ব ।। বক্সা ফোর্টের মাথায়


৩০শে মে,বেলা ১১.১৫: বক্সা ফোর্ট

প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। সঙ্গে তেমন মেঘ গর্জন। এক একটা বাজ পড়ছে আর গোটা বক্সা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে বাজ পড়তে দেখার অভিজ্ঞতাটা অনেকটা খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে বাজ পড়া দেখার মত। তবে এখানে আরো একটা অতিরিক্ত ঝুঁকি আছে, সেটা হল ধস নামার ঝুঁকি। বক্সা ফোর্ট থেকে বেরিয়ে কিছুদূরে  দ্রুকপাদের একটা শক্তপোক্ত বাড়িতে বসে এই ডায়রি লিখছি। দ্রুকপা হল মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের একটি শাখা যারা প্রধানত তিব্বত, নেপাল, ভুটান ও উত্তর ভারতে ছড়িয়ে আছে। বক্সা ফোর্টের পাশেও এদের বসতি আছে।এখানে যত বাড়ি সব দেখছি ভারী ভারী গ্রানাইট পাথরে তৈরী। বৃষ্টি প্রায় পনেরো মিনিট হল একটানা হয়ে চলেছে। বক্সা ফোর্ট দেখার সময়েই মেঘ ডাকছিল। রুবাই বাজ পড়া শুনেই নেমে যেতে যাচ্ছিল,বাহাদুরদা বারণ করল যে এই সময় পাহাড় দিয়ে নেমে যাওয়া ঠিক হবে না। পাহাড়ে ধস নামার প্রচুর  সম্ভাবনা। অগত্যা বসে আছি আমরা এখানে।

বাহাদুরদা দূরে একটা ভুটানি লোকের সাথে বসে আরা পান করছে। আরা হল ভুটানি মদ, ভাত পচিয়ে তৈরী হয়।

চিত্রগ্রহণ – লেখক

আমরা যখন বক্সা ফোর্ট এসে পৌঁছলাম, তখন সবে বৃষ্টি চালু হয়েছে। দু-একটা ফোঁটা, কিন্তু আস্তে আস্তে যে জোরে আসবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বাহাদুরদা আকাশ দেখেই বলল, “এ এখন অনেকক্ষণ চলবে।”
আমরা তাড়াতাড়ি এগিয়ে চললাম বক্সা ফোর্টের গেটের দিকে। পাহাড়ের উঁচুতে এখানে এসে মনটা অন্যরকম হয়ে গেল। এতটা সবুজ আর সুন্দর জায়গাটা দুচোখ দিয়ে শুধু যেন দেখতেই ইচ্ছা করে। আমরা ছবি তুললাম কয়েকটা। তারপর প্রবেশ করলাম আমাদের সেই বক্সা ফোর্টে।

বক্সা দুর্গের ইতিহাস নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে. ১৬৬১ সাল নাগাদ তৎকালীন বাংলার দোর্দন্ডপ্রতাপ সুবেদার মীরজুমলা, যিনি কিনা আওরঙ্গজেবের গভর্নর ছিলেন, তিনি আক্রমণ করলে কোচবিহারের রাজা প্রাণনারায়ন এই বক্সা ফোর্টে লুকিয়ে ছিলেন। বক্সা দুর্গ প্রধানত তৈরী করে ভুটানিরা ডুয়ার্সে আক্রমন চালানোর জন্য। এই দুর্গটি সেই সময় ‘জং’ নাম পরিচিত ছিল। ১৭৭৩ সালে এই দুর্গটি প্রথমবারের জন্য ব্রিটিশ দের চোখে পরে এবং ১৮৬৫ সালে দ্বিতীয় ভুটান যুদ্ধের শেষে সিনচুলা চুক্তির মাধ্যমে এই দুর্গ পাকাপাকি ভাবে ইংরেজরা অধিগ্রহণ করে। দুর্গটি প্রথমে বাঁশের তৈরী ছিল, ইংরেজরা পরে এটিকে পাথরের দুর্গে রূপ দেয়। এই বক্সা ফোর্ট সাধারণত ইংরেজ সেনা ছাউনি হিসেবে ব্যবহার হত। পরবর্তী কালে সেনা ছাউনি উঠে গিয়ে এখানে তৈরী হয় উচ্চ নিরাপত্তাযুক্ত জেলখানা ও ডিটেনশন ক্যাম্প, কুখ্যাতির দিক থেকে যা আন্দামানের সেলুলার জেলের পরেই। বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী এই বক্সা ফোর্টে ১৯৪৭ সাল অবধি বন্দী ছিলেন।

রুবাই দেখি এক জায়গায় বসে পড়েছে। আমি এগিয়ে গেলাম ওর কাছে, “কি হয়েছে?”
“আমাদের পুরনো ইতিহাস।” রুবাই বলল, “ভাবতেও কেমন লাগে এখন আমরা অ্যাডভেঞ্চারের জন্য এখানে এসেছি।”
ঠিক কথাই। আমাদের সেই অতীত এখন  লতা, পাতা আর আগাছায় ভরা এক ভগ্নাবশেষ শুধু। বাহাদুরদা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাদের জায়গাটা দেখাল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখন বেশ মোটা হয়ে উঠেছে।

“এবার যেতে হবে”, বাহাদুরদা বলল।
নেমে আসবার সময় বৃষ্টিটা বেশ জোরে চালু হল। আমাদের তখন ফেরবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে বাহাদুরদা কাছের একটা দ্রুকপাদের বাড়ি নিয়ে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বৃষ্টি অসম্ভব রূপ নিল।

আপাতত লেখা বন্ধ করছি। বৃষ্টির এই ভয়াবহতাকে একটু উপভোগ করা যাক।


আপনার মতামত জানান