প্রবন্ধ-নিবন্ধ

রোজার ইফতারে খেজুর রাখা আবশ্যক কেন?

লেখকঃ মিজানুর রহমান সেখ 

সারা বিশ্বজুড়ে করোনা আতঙ্কের মধ্যেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা পালন করে চলেছেন পবিত্র রমজান মাস। যারা রোজা রাখেন, তারা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করেন না। এক কথায় নির্জলা উপবাস। মুসলিমরা বিশ্বাস করেন স্বেচ্ছা নিয়ন্ত্রণ আর বেশি সময় ধরে প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে মুসলমানরা এ মাসে নতুন করে আত্মশুদ্ধি অর্জন করেন। সারাদিন পানাহার ত্যাগ করে সূর্যাস্তে ইফতারে নানা খাদ্যের সমাহার রোজাদারকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও শক্তি যোগায়। ইফতারের শুরুতেই খেজুর ও জল দিয়ে রোজা খোলার রেওয়াজ বিশ্বের প্রায় সর্বত্র। কিন্তু ‘খালিপেটে জল ও ভরা পেটে ফল’ এই প্রচলিত ধারণার সাথে অনেকটাই কি বেমানান এই খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু? বিষয়টি যদিও সুন্নত হিসেবেই মুসলিমরা পালন করে থাকেন কিন্তু এর পিছনে আছে বেশ বলিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকথা। আসুন আমরা জেনে নিই কেন প্রতিদিন ইফতারে খেজুর রাখা হয়।

পবিত্র কোরআন শরীফে প্রায় কুড়ি বারেরও বেশি এই খেজুরের উল্লেখ আছে। পুষ্টিবিদদের মতে খেজুর একটা দারুন উপকারী ফল। বিশেষ করে রোজাদারের জন্য এই খেজুর বল ও শক্তি দায়ক টনিক হিসাবে কাজ করে। সারা দিন রোজা রাখার ফলে পেট খালি থাকে, তাই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায়, যা ইতফারের সময় পূরণ করতে হয়। আর খেজুর সেটি দ্রুত পূরণে সাহায্য করে। পুষ্টিবিদদের মতে 100 গ্রাম খেজুরে প্রায় 75 গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে এবং 277 ক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। খেজুরে প্রচুর শর্করা ছাড়াও ফাইবার,ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট, খনিজ উপাদান (মিনারেলস) ও তাজা অবস্থায় থাকে ভিটামিন সি ও পাওয়া যায়। সামান্য প্রোটিন (1.8গ্রাম) ও ফ্যাট থাকলেও খেজুর শরীরে পটাশিয়াম (696মিলিগ্রাম), সোডিয়াম (1মিলিগ্রাম), ক্যালসিয়াম (64মিলিগ্রাম), ম্যাগনেসিয়াম ও আয়রনের তাৎক্ষণিক উৎস হিসেবে ভালো কাজ করে।যেহেতু খেজুর খুব দ্রুত পরিপাক হয় তাই রক্তের মাধ্যমে গ্লুকোজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান ইফতার গ্রহণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো শরীরে ছড়িয়ে যায়। ফলে রোজা খোলার প্রায় সাথে সাথেই শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক করে দেয়।

শুধু রমজান মাসে নয়, সারা বছর নিয়মিত ভাবে খেজুর খেতে বলছেন পুষ্টিবিদরা। খেজুরে প্রচুর আয়রন (100 গ্রাম খেজুরে প্রায় 0.90মিলিগ্রাম) থাকায় প্রতিদিন খেজুর খাওয়ার অভ্যাস দেহের আয়রনের অভাব পূরণ করে এবং অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার হাত থেকে বাঁচায়। খেজুর রুচি বাড়ায়। অনেকক্ষণ খালি পেটে থাকলে পাকস্থলীতে পাচক রস ক্ষরণের ফলে অরুচি ভাব আসে। শুরুতেই খেজুর খেলে তা দূর হয়। এছাড়া খেজুর চিবিয়ে খেলেই পেটের গ্যাস দূর হয়ে যায়। সারাদিন পেট খালি থাকার জন্য অম্ল ও গ্যাস হতে পারে তাই শুরুতেই খেজুর খেয়ে জল পান করলে গ্যাস দূর করে। খেজুর কফ দূর করে, সর্দি কাশি এবং এজমায় উপকার দেয়। রোজা রেখে অনেকে ঠান্ডা শরবত পান করেন। হঠাৎ ঠান্ডা লাগা দূর করাতে এই খেজুর সাহায্য করে। খেজুরে প্রচুর ফাইবার থাকে (100গ্রাম খেজুরে প্রায় 7গ্রাম) যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও রক্তের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রন করে। তাজা খেজুর নরম ও মাংসল, যা সহজেই হজম হয় ও শরীরকে রিহাইড্রেট করতে সাহায্য করে। সারাদিনে জল না খাওয়ার জন্য যে জলাভাব তৈরি হয় তা দ্রুত মেরামত করে খেজুর। খেজুরে থাকা প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে। এখনকার বড়ো সমস্যা ওবেসিটি বা ওজন বেড়ে যাওয়া। সেক্ষেত্রে খেজুরের জুড়ি মেলা ভার কারণ খেজুরে আছে ডায়েটারি ফাইবার, যা কোলেস্টেরল থেকে মুক্তি দেয়, হার্ট ভালো রাখে ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রতিদিন খেজুর খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। খেজুরে প্রচুর এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। ফ্লাভোনইড, কার্টিনোইড, ফেনলিক এসিড – এই তিন রকমের খুব গুরুত্বপূর্ণ এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা পক্ষাঘাত, ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ এবং অন্যান্য দুরারোগ্য রোগ এমনকি ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। খেজুর প্রদাহ কমায়, মস্তিস্কে প্লাক তৈরিতে বাধা দেয় ফলে বয়স্কদের এলজাইমার রোগ প্রতিরোধ করে। এই রোগ হলে বিভিন্ন মানসিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় ও স্মৃতিশক্তি কমে যায়। গবেষণা থেকে জানা যায় গর্ভবতী মহিলারা গর্ভাবস্থার শেষ দিকে নিয়মিত খেজুর খেলে প্রসব স্বাভাবিক হয় ও প্রসববেদনা কম হয়। খেজুরে থাকা পটাশিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম শরীরের অস্থি ও কঙ্কাল তন্ত্র কে সুস্থ রাখে।

এক কথায় রোজা রাখার ফলে শরীরে যে ঘাটতি হয় তা মিটিয়ে রোজাদারকে আরো সুস্থ ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে খেজুরের বিকল্প পাওয়া অসম্ভব। খেজুর একদিকে যেমন সুস্বাদু তেমনই বিভিন্ন খাবার তৈরিতে ব্যবহার হয়। পৃথিবীতে প্রায় 40টির ও বেশি প্রকারের খেজুর পাওয়া যায়। মানুষ খাদ্য হিসেবে প্রায় 7000 বছর ধরে খেজুর ব্যবহার করছেন এবং বিগত 2000 বছর ধরে এটা চাষ হচ্ছে। খেজুরের দানার মধ্যে থাকা নতুন গাছের প্রাণশক্তি শুধু কয়েক বছর নয় কয়েক দশক পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। মরু অঞ্চলে মানুষ ছাড়াও অন্যান্য জীবজন্তু এই খেজুর গাছের উপর নির্ভরশীল। প্রাচীনকালে আরব দেশে সরাসরি চিকিৎসার জন্য পথ্য হিসাবে খেজুর ব্যবহার করত। এর পুষ্টিমূল্য বিচার করে প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় খেজুর রাখা উচিত।

বি.দ্র. : লেখালিখি ওয়েবসাইট লেখকদের ভাবনা প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম। লেখার বিষয়বস্তু ও অভিমত লেখকের ব্যক্তিগত – এর কোনো দায় আমাদের নেই।

তথ্যসূত্র


  1. https://www.healthline.com/nutrition/benefits-of-dates
  2. https://www.thespruceeats.com/islamic-tradition-breaking-fast-with-dates-2394244

লেখক পরিচিতিঃ মিজানুর রহমান সেখ


মিজানুর পেশায় শিক্ষক এবং একজন সমাজসেবক। বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্যই মূলত লেখালিখি। লেখক পদার্থবিদ্যা ও শিক্ষাবিজ্ঞানে মাস্টার্স।
Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।