সববাংলায়

কেশর পৃথিবীর সবথেকে দামি মশলা কেন

কেশর বহু বছর ধরে মশলা হিসেবে সমগ্র পৃথিবীতে সমাদৃত।তিন হাজার বছরের আগে থেকে রান্না ঘরে মশলা হিসেবে কেশর ব্যবহার হয়ে আসছে।বিশ্বে যত মশলা উৎপন্ন হয় কেশর কে সব মশলার রাজা বলা হয়।কি রঙে, কি গন্ধে কি স্বাদে কেশরের তুলনীয় কোন মশলাই নেই। খাঁটি কেশর ৬ লাখ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে এমন নজিরও পাওয়া যায়।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কি এমন কারণ থাকতে পারে যার কারণে কেশর পৃথিবীর সবথেকে দামী মশলা হয়ে উঠেছে?

কেশর বিশ্বের অল্প কিছু দেশে উৎপাদন হয়।তবে মূলত চারটি দেশের কেশর পৃথিবীতে বিখ্যাত-ভারত,ইটালি,স্পেন এবং ইরান। সারা পৃথিবীতে যত কেশর উৎপাদন হয় তার মধ্যে নব্বই শতাংশ কেশরই আসে ইরান থেকে। কেশর সব থেকে কম উৎপাদন হয় ভারতে।

কেশর পৃথিবীর সবথেকে দামি মশলা কেন | সববাংলায়

আগেই বলা হয়েছে পৃথিবীর অল্প কিছু স্থানে যেমন আমেরিকার কিছু অঞ্চলে, নিউজিল্যান্ডে এবং সুইজারল্যান্ডের অল্প কিছু স্থান ছাড়া সারা পৃথিবীর সমস্ত কেশর আসে প্রধানত চারটি দেশ থেকে। ইরান- ইরানের মাশাদ শহরের তোরবাত-ই-হেদারি তে মূলত সবথেকে বেশি কেশর উৎপাদন হয়।এখানকার রাস্তার পাশে যে দিকে তাকানো যাক দুপাশ জুড়ে কেবলই কেশর আর কেশর। ইরান ছাড়া এত কেশর আর কোন দেশে উৎপাদন হয় না।

কেশর পৃথিবীর সবথেকে দামি মশলা কেন | সববাংলায়

স্পেন- ইরানের পরই সব থেকে বেশি কেশর উৎপাদন হয় স্পেনে। স্পেনের ‘লা মানচা’ র কেশরও যথেষ্ট বিখ্যাত।

ভারত- ভারতের একটি রাজ্যের একটি শহরেই কেবল কেশর উৎপাদন হয়। কাশ্মীরের পাম্পরেতে।কেশর উৎপাদনের এই স্বল্পতাই কেশরের দুর্মূল্য হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ।

কেশর চাষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য: কেশর চাষের জন্য এমন এক আদর্শ জলবায়ুর প্রয়োজন হয় যা সব দেশে পাওয়া যায়না।কিরকম জলবায়ু দরকার দেখে নেওয়া যাক-

. যথেষ্ট ছিদ্র যুক্ত মাটি যাতে জল জমতে না পারে।
.ঠিক যে সময়ে কেশর বীজ থেকে শস্য হিসেবে কেশর অঙ্কুরিত হয় সেই সময় অঙ্কুরোদগমের জন্য যে নির্দিষ্ট পরিমাণ বৃষ্টিপাত প্রয়োজন একদম সেই পরিমাণ বৃষ্টি হতে হবে। বৃষ্টির পরিমাণে সামান্য পরিবর্তন অঙ্কুরোদগম স্তব্ধ করে দিতে পারে।
৩.একবার ফুল ফোটার পর যাতে ফুলগাছের গোড়ায় জল না জমে সেরকম ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. ঠান্ডা আবহাওয়া।

কেশর পৃথিবীর সবথেকে দামি মশলা কেন | সববাংলায়
এ তো গেল কেশর চাষের ঝামেলা। ক্ষেত থেকে কেশর তোলার ঝামেলা তো আরো সাংঘাতিক।কেশর ফুল মাটি থেকে মাত্র ছ’ইঞ্চি উঁচুতে ফোটে। কোমর ভেঙে ঝুঁকে প্রায় মাটিতে লেগে থাকা এই ফুল তোলা এক অকল্পনীয় পরিশ্রম সাধ্য কাজ। কেশর ফুলের পাপড়ি রানি (mauve) রঙের হয়। কেশর হিসেবে যেটা আমরা চিনি সেটা আসলে এই ফুলের গর্ভমুন্ড(Stigma)।ফসল তোলার ঋতুতে বেলা বাড়ার আগেই যতটা সম্ভব কেশর ফুল তুলে নিতে হয় কারণ প্রবল সূর্যালোক কেশরের প্রকৃত স্বাদ নষ্ট করে দেয়। তাই একদম সূর্য ওঠার সাথে সাথেই মাঠে নেমে পড়তে হয় কেশর ফুল তুলতে।কেশর ফুল অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য ফোটে। একদম ভোরে সূর্য ওঠার সাথে সাথেই সেই ফুল তুলতে নেমে পড়ে কেশর শ্রমিকরা তারপর থেকে টানা ছয় থেকে আটঘন্টা বিরতিহীন ভাবে পায়ের পাতা থেকে সামান্য উঁচুতে ফুটে থাকা কেশর ফুল তুলে যেতে হয় সূর্যালোকের উত্তাপ বাড়ার আগেই। কেশর চাষে নারী পুরুষ দুপক্ষেরই সমান অবদান থাকলেও কেশর ফুল তোলার ওই অবিশ্বাস্য পরিশ্রমের কাজটি কিন্তু কেবল মাত্র মহিলারাই করেন।

কেশর পৃথিবীর সবথেকে দামি মশলা কেন | সববাংলায়

আসলে কেশর ফুল এতটাই সংবেদনশীল হয় যে তোলবার সময় অত্যন্ত সতর্কতাই কেবল প্রয়োজন হয়না, প্রয়োজন কোমল স্পর্শের নয়তো হাতের মৃদু আঘাতে কেশরের প্রকৃত স্বাদে ব্যাপক তারতম্য ঘটে যাবে। মহিলাদের হাত পুরুষদের তুলনায় কোমল হওয়ায় কেশর ফুল তুলতে প্রচুর পরিমানে মহিলা শ্রমিক লাগে।অবশ্য হাতে কম সময় থাকলে নারী পুরুষ উভয়ই একসাথে কাজ করে।কাশ্মীরের পাম্পোরে তে কেশর ফুল তোলবার ঋতুতে পুরো শহর মাঠে নেমে পড়ে। ক্ষেত থেকে ফুল তোলবার পর যে ঝুড়িতে ফুলগুলো জমা করা হয় তাকে ‘ক্রিনজোল’ বলে।

কেশর পৃথিবীর সবথেকে দামি মশলা কেন | সববাংলায়

মাটি থেকে মাত্র ছ ইঞ্চি উঁচুতে থাকা কেশর ফুলগুলোর মাঝে একটা গর্ভ কেশর(Pistil) থেকে তিনটে করে গর্ভমুন্ড(Stamen)এবং তিনটে করে পুংকেশর (Stigma) বেরিয়ে থাকে। মজার ব্যাপার হল এই পুংকেশর কিন্তু কেশর নয়।কেশর হিসাবে যেটা আমরা চিনি সেটা হল-গর্ভমুন্ড।

কেশর পৃথিবীর সবথেকে দামি মশলা কেন | সববাংলায়

 

এক কেজি কেশর পেতে এক লক্ষ সত্তর হাজার ফুল তুলতে হয়।মাথায় রাখতে হবে সেটাও করতে হবে প্রায় মাটি ছোঁয়া অবস্থায় এক দুদিনের মধ্যে টানা আট ঘণ্টা বিরতিহীন ভাবে।এই অমানুষিক পরিশ্রম, এই অকল্পনীয় সতর্কতার কারণেই কেশরের দাম এরকম অবিশ্বাস্যরকমের।

কেশর পৃথিবীর সবথেকে দামি মশলা কেন | সববাংলায়

উৎকৃষ্টতা অনুযায়ী কেশরের অনেক ভাগ আছে।

যেমন ইরানে উৎপাদিত কেশরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ-সারগোল।এছাড়াও রয়েছে পুষাল, কঙ্গে।
স্পেনে উৎপাদিত কেশরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ- ক্যুপ। এছাড়াও রয়েছে মানচা, রিও।

কাশ্মীরে উৎপাদিত কেশরের মধ্যে-সর্বশ্রেষ্ঠ হল মংরা,লাচ্চা।

কেশরের বৈজ্ঞানিক নাম- Crocus Sativus ।কেশরকে ইংরেজিতে স্যাফরন (Saffron)বলে। শব্দটির উৎপত্তি মনে করা হয় দ্বাদশ শতকের ফরাসী শব্দ- সাফরান (Safran) যেটি আবার আরবি জাফারান থেকে এসেছে। সেই কারণে কেশরকে ‘জাফরান’ ও বলা হয়।

জাফরান হোক আর স্যাফ্রন–কেশর তার আপনগুণেই কেশর ফুলিয়ে রাজত্ব করছে পৃথিবীতে।তাও আবার তিন হাজার বছর ধরে একইভাবে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading