ধর্ম

চৈত্র মাসের লক্ষ্মীপূজা ব্রত

চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবার চৈত্র মাসের লক্ষ্মীপূজা ব্রত পালন করা হয়। বলা হয় এই ব্রত করলে তার সংসারে মা লক্ষ্মী বিরাজ করেন। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

একদিন নারায়ণের ইচ্ছে হল তিনি মর্ত্যে ঘুরবেন। তিনি তাঁর পুষ্প রথ বার করতেই লক্ষ্মী দেবীও বায়না করলেন তাঁর সাথে যাবার। অগত্যা তিনি লক্ষ্মীকে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়লেন। মর্ত্যে রথ এসে থামতে তারা বামুন বামুনির বেশ ধরে ঘুরতে লাগলেন। রথ থেকে নামার আগে নারায়ণ লক্ষ্মীকে বললেন, “ঘুরতে এসেছো ঘোরো কিন্তু উত্তর দিকে তাকাবে না আর ঐ দিকে যাবে না।”

লক্ষ্মীদেবী মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেও মনে মনে ভাবতে লাগলেন কি আছে ওইদিকে। সেই ভেবে তিনি উত্তর দিকে তাকিয়ে ফেললেন। সেই দিকে তাকিয়ে তাঁর মন আনন্দে ভরে গেল। তিনি দেখলেন তিল ফুলে সারা বাগান ভরে আছে। তা দেখে নারায়ণের বাধা না মেনে ওই দিকে গিয়ে ফুল তুলে খোঁপায় দিয়ে, গলায় পরে খানিক আঁচলে করে নিয়ে মহা আনন্দে ঘুরতে লাগলেন, এমন সময় সেই বাগানের মালিক এক বামুন এসে বললেন , “আমার বাগানের ফুল তুলেছ তুমি আর বাড়ি যেতে পারবে না।”
এই বলে বামুন লক্ষ্মী দেবীকে আটকে রাখলেন। লক্ষ্মীর আসতে দেরি দেখে নারায়ণ এগিয়ে দেখেন তিনি যা ভেবেছিলেন তাই হল। ফুল তোলার অপরাধে বাগানের মালিক লক্ষ্মীকে আটকে রেখেছে। নারায়ণ এগিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলে সেই ব্যক্তি বললেন, “যে আমার বাগানের ফুল তুলবে তাকে আমার বাড়িতে বারো বছরের জন্য রাঁধুনির কাজ করতে হবে।”
তা শুনে নারায়ণ লক্ষ্মীকে বললেন, “তোমায় বারণ করলাম তুমি শুনলে না। এবার আমায় ছেড়ে থাকো বারো বছরের জন্য।”
এই বলে তিনি চলে গেলেন। যাবার আগে বাগানের মালিক সেই বামুনকে বলে গেলেন , “ওকে কারোর এঁটো খেতে দেবে না, ঝাঁট দেওয়াবে না আর কারোর বাসী কাপড় ধোয়াবে না।”
এর পর সেই বামুন মা লক্ষ্মীকে বাড়ির ভিতর নিয়ে এল। বামুনের বৌ লক্ষ্মীকে দেখে বললেন, “আমাদের নিজেদেরই দুবেলা ঠিক করে অন্ন জোটে না ,তুমি একে আবার কোথা থেকে নিয়ে এলে?”
বামুনের বৌমারা সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল,বামুন তাদের সবাইকে বললেন, “যদি আমাদের জোটে তাহলে ওরও ঠিক জুটে যাবে। তোমরা শুধু ওকে আদর যত্নে রেখো তাহলেই হবে।”
বেলা হয়েছে দেখে লক্ষ্মী বললেন, “তোমরা সবাই এমন বসে আছো কেন যাও স্নান করে এসো।”
তা শুনে বামুনের বউ বললেন, “তেল পাবো কোথায়, দেখছ না তেল না মেখে মাথা শুকনো জট হয়ে আছে। আমার ছেলেরা ভিক্ষা করে আসুক তবে যা হয় দুটো রান্না চাপাব।”
মা লক্ষ্মী বললেন, “কেন তোমার ঘরেই তো সব আছে!”
এই বলে রান্না ঘরে এনে দেখালেন সারি দিয়ে সব কিছু সাজানো আছে। অনেক দিন পর এত জিনিস দেখে বাড়ির সবাই খুব খুশি। বামুনের বউ ,বৌমারা তাড়াতাড়ি রান্না চাপালেন আর বামুনের বউ আগে যত্ন করে মা লক্ষ্মীকে খেতে দিলেন। তারা সবাই ভাবলেন এ নিশ্চয় কোনো দেবী। তার পর থেকেই সবাই লক্ষ্মীর খুব যত্ন করতে লাগলেন। শুধু বামুনের মেজ বউ লক্ষ্মীকে দেখে আর রাগে গজ গজ করে। সে তার এঁটো সব মা লক্ষ্মীকে খেতে দেয়। মা লক্ষ্মীও সেটা জানেন, তিনি সব এঁটো নিয়ে ডালিম তলায় পুঁতে রাখতেন। এই ভাবে বারো বছর কেটে গেল। অনেক দিন পর ভালো গঙ্গা স্নানের যোগ আসতে বামুনি লক্ষ্মীকে বললেন,” চলো সবাই গঙ্গা স্নান করে আসি।”
শুনে লক্ষ্মী বললেন ,”আমার শরীর ভালো নেই। তোমরা যাও। তবে এই পাঁচ কড়ি দিলাম। এই দিয়ে মা গঙ্গার পুজো দিও।”
বামুনি বাড়ির সবাইকে নিয়ে গঙ্গাস্নান করে মা লক্ষ্মীর পাঁচ কড়ি দিয়ে পূজা দিতেই মা গঙ্গা চার হাত বাড়িয়ে পূজা নিয়ে চলে গেলেন। তা দেখে তো সবাই অবাক।  ওরা বুঝতে পারলেন উনি কোনো দেবীই হবেন। তাই ক্ষমা চাওয়ার জন্য সবাই তাড়াতাড়ি বাড়ি এলেন। এই দিকে বারো বছর কেটে যাওয়ায় নারায়ণ বামুনের বেশ ধরে রথে করে মা লক্ষ্মীকে নিতে এসেছেন। মা লক্ষ্মী রথের সামনে দাঁড়িয়ে নারায়ণের সাথে কথা বলছেন। বামুনি অমনি তার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। বললেন, “তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না মা! আমাদের ভুল ক্ষমা করে দাও।”
মা লক্ষ্মী বললেন, “আমার যে আর থাকার উপায় নেই, বারো বছর পূর্ণ হয়ে গেছে। তোমরা ভাদ্র, কার্তিক, পৌষ এবং চৈত্র মাসের লক্ষ্মীপূজা ভালো করে করবে। তাহলে আর তোমাদের অভাব থাকবে না। আর ডালিম গাছের তলায় অনেক ধন সম্পত্তি পোঁতা আছে তা তোমরা তুলে নিও।”
এই বলে পুষ্প রথে করে নারায়ণের সাথে লক্ষ্মী চলে গেলেন। মেজ বউ ধনসম্পত্তি পাবার লোভে তাড়াতাড়ি ডালিম গাছের গোড়া খুঁড়তে গেলে এক কেউটে সাপ বেরিয়ে তাকে কামড়ে দিল আর তিনি মারা গেলেন। বাড়ির অন্য সকলে ডালিম গাছের কাছে এসে মেজ বউয়ের এই অবস্থা দেখে বললেন, “এ লোভের শাস্তি পেয়েছে। মা লক্ষ্মীকে এক দিন যত্ন করেনি, এঁটো খাবার খেতে দিত। ওর এটাই প্রাপ্য ছিল।”

এর পর থেকে বছরে চারবার করে ওরা মা লক্ষ্মীর পুজো করতে থাকলেন। ওদের কিছুর অভাব রইল না। এই ভাবে এই চৈত্র মাসের লক্ষ্মীপূজা প্রচার হতে লাগল।

ব্রতকথাটি ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ২৬
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ১৮৭

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ইদুজ্জোহা বা বকরি ঈদ



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


বঙ্কিমচন্দ্র
বঙ্কিমচন্দ্র

বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন