ধর্ম

কার্তিক মাসের লক্ষ্মীপূজা ব্রত

কার্তিক মাসে যে লক্ষ্মী পূজা করা হয়, বলা হয় এই পূজা করলে মা লক্ষ্মী তার সংসারে সর্বদা অচলা থাকেন। । জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

একসময় অবন্তীনগরে ধর্মেশ্বর নামে এক রাজা বাস করতেন,তার রানীর নাম ধর্মদাসী এবং তাঁর পাঁচটি কন্যা ছিল। একদিন পরিবারের সবাই যখন একসাথে বসে গল্প করছিলেন এমন সময় রাজা পরিবারের অন্যদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কার ভাগ্যে খাও?”

পরিবারের সবাই রাজার মন রাখতে বললেন, “আমরা সবাই আপনার ভাগ্যে খাই।”
কিন্তু রাজার ছোট মেয়েটি তাতে সায় দিলো না। সে বলল ,”মা লক্ষ্মী আমাদের সবাইকে আহার জুগিয়ে থাকেন। আমরা যে যার নিজের ভাগ্যে খাই।”
এই কথা শুনে রাজা খুব রেগে গেলেন। তিনি বললেন, “আমার সামনে তুই এই কথা বললি কার সাহসে?”

তিনি রেগে গিয়ে বললেন, “আমি প্রতিজ্ঞা করলাম কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে যার মুখ প্রথম দেখবো তার সাথেই তোর বিয়ে দেব। দেখি তুই নিজের ভাগ্যে কি করে খাস! আর মা লক্ষ্মী তোকে কি রকম অন্ন জোগায়!”

এই কথা শুনে রানী খুব ভয় পেয়ে গেলেন। এদিকে রাজা রাজবাড়ির সবাইকে সকালে ঘুম থেকে উঠতে মানা করে দিলেন। সকালে হাট বাজার বন্ধ করার আদেশ করলেন। রাজার এই প্রতিজ্ঞার কথা এক গরিব বামুনের কানে গেল। সে ভাবল রাজা যার সাথে মেয়ের বিয়ে দেবেন তাকে কিছু ধন সম্পতি নিশ্চয়ই দেবেন। সেই ভেবে সে তার আঠারো বছরের ছেলেকে নিয়ে রাজবাড়ীতে লুকিয়ে রইল। রাজা ঘুম থেকে উঠলেই সে তার ছেলেকে রাজার সামনে এসে দাঁড়াতে বলল, আর বামুন লুকিয়ে রইল। ছেলেটিকে দেখে সে কে রাজা জিজ্ঞাসা করলে ,বামুন সামনে এসে বলল, “আমি আপনার প্রতিজ্ঞার কথা জানি এই আমার ছেলে।আমার ছেলের সাথে আপনার মেয়ের বিয়ে দিয়ে আপনার প্রতিজ্ঞা রক্ষে করুন।”

রাজা তাই করলেন। সঙ্গে কিছু ধন দিয়ে মেয়েকে বিদায় করলেন আর বিদায়ের সময় বললেন, “এতদিন আমার ভাগ্যে খেতে এবার নিজের ভাগ্যে খাওগে।”
বামুন অপর এক রাজার রাজ্যে বনের মধ্যে কুঁড়ে ঘরে থাকে। সেখানেই ছেলে, ছেলের বউকে নিয়ে উঠলেন, আর শাশুড়ি মা তাদের বরণ করে ঘরে তুললেন। রাজকন্যা শ্বশুর শাশুড়ির সেবা যত্ন করে নিজের স্বামীকে খাইয়ে যা বাঁচে তাই আনন্দ করে খায়। একদিন তার স্বামী আর শ্বশুরকে সে বলে, “আপনারা যখন বাড়ি আসবেন তখন খালি হাতে আসবেন না। কিছু না পেলে একগাছি ঘাস নিয়েই আসবেন।”

বামুন আর তার ছেলে তাই করতে থাকল। এক দিন ভিক্ষায় বেরিয়ে কিছু না পেয়ে রাস্তায় একটি মরা কালসাপ দেখতে পেয়ে তাই কুড়িয়ে নিয়ে এনে রাজকন্যাকে দিলে সে তাই খুশি হয়ে নিয়ে মাচায় তুলে রাখল। এই ভাবেই ভিক্ষা করে কুড়িয়ে বাড়িয়ে তাদের চলতে থাকল।

সেই দেশের রাজার একটি মাত্র ছেলের হঠাৎ কঠিন অসুখ হল। ডাক্তার কবরেজি অনেক দেখানো হল কিন্তু রোগ আরও বেড়ে গেল। শেষে এক সাধু এসে বলে যদি মরা কালসাপের মাথা পাওয়া যেত তাহলে আমি এই ছেলেকে সুস্থ করতে পারতাম। রাজার কথামত ঢেরা পিটিয়ে ঘোষনা করা হলো যে মরা কালসাপের মাথা দেবে তারা যা চাইবে রাজা তাদের তাই দেবে। রাজকন্যে বামুনকে বলল, “বাবা আপনি ওদেরকে ডাকুন আমি মরা কালসাপের মাথা দিচ্ছি।”

এই বলে মাচা থেকে মরা কালসাপ নামিয়ে তার মাথা কেটে দিল। আর তা থেকে ঔষধ বানিয়ে সাধু রাজার ছেলেকে ভালো করে দিলেন। এরপর রাজবাড়ী থেকে বামুনকে ডেকে পাঠালে রাজকন্যে বলে পাঠাল, “বাবা রাজামশাই আপনাকে ধন সম্পতি দিতে চাইলে আপনি নেবেন না। রাজাকে বলবেন আমি কিছুই চাই না, শুধু একটা প্রার্থনা কার্তিক মাসের অমাবস্যার দিন রাজবাড়ী এবং অন্য প্রজার ঘরে যেন আলো না জ্বলে।”
রাজা তাই মেনে নিলেন এবং ঢেরা পিটিয়ে ঘোষণা করলেন কার্তিকমাসের অমাবস্যায় রাতে যার ঘরে আলো জ্বলবে তার কঠিন শাস্তি হবে।

এই দিকে রাজকন্যে অমাবস্যার দিন উপোষ থেকে নিজের কুঁড়েঘর পরিষ্কার করে, একটা চৌকি পেতে তাতে আলপনা দিয়ে ফুল দিয়ে সাজিয়ে লক্ষ্মী পুজোর জোগাড় করে, কুঁড়েঘরের চারদিকে প্রদীপ জ্বালিয়ে মা লক্ষ্মীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। কার্তিকমাসে অমাবস্যার রাতে লক্ষ্মী পুজো, মা লক্ষ্মী পেঁচার পিঠে চড়ে পৃথিবীতে তার পুজো দেখতে এলেন। পেঁচা মা লক্ষ্মীকে নিয়ে চারদিক ঘুরেও কোথাও আলো দেখতে পেলেন না, মা লক্ষ্মী পেঁচাকে বললেন, “আজ আমার পুজো রাজ্যের কেউ আলো জ্বালিয়ে আমাকে আমন্ত্রণও জানালো না।”

তিনি ফিরেই যাচ্ছিলেন হঠাৎ পেঁচা বনের মধ্যে কুঁড়ে ঘরে আলো দেখতে পেয়ে তার মাকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলে সেখানে এসে দেখেন বামুনের বৌমা তার জন্য অপেক্ষায় বসে আছে। মা লক্ষ্মীকে আসতে দেখে গলায় কাপড় দিয়ে মাকে প্রণাম করে মাকে চৌকিতে বসিয়ে ভক্তিভরে পুজো করলেন। পুজো শেষে মা লক্ষ্মীকে সে বলে “মা, আমরা খুব গরিব। এই যৎ সামান্য জোগাড় করেছি আপনি এতেই খুশি হন।”
এর পর মায়ের স্তব করলেন। মা লক্ষ্মী খুশি হয়ে বললেন, “আর তোমার কোনো অভাব থাকবে না,আমি তোমার পুজোতে খুব খুশি।”

এই বলে মায়ের পায়ের নুপুর দিয়ে বললেন, “ভাদ্র, কার্তিক, পৌষ আর চৈত্র মাসে আমার উদ্দেশ্যে এই নুপুরের উপর পুজো করবে, তার আর অভাব থাকবে না।”

এরপর বামুনের কুঁড়েঘর রাজপ্রাসাদ হয়ে গেল। দাস দাসী ধন কিছুরই অভাব থাকল না। রাজকন্যে একদিন বামুনকে বলল, “বাবা আমাদের এখন কোনো অভাব নেই। কিছু পুণ্য কর্ম করলে হয় না? আপনি একটা পুকুর খোঁড়ান আর রাজ্যের সব লোককে নিমন্ত্রণ করুন।”

বামুন তার বৌমার কথামতো তাই করল। রাজ্যের ধনী গরিব দলে দলে সবাই এসে খেয়ে গেল। ওই দিকে রাজকন্যের বাবা মা লক্ষ্মীকে অবহেলা করায় তার রাজ্যপাট সব গিয়ে সে পথের ভিখারি হয়েছিলেন। দুটো খাবার আশায় সেও সেখানে এসেছিলেন। সবার মধ্যে রাজকন্যে তার বাবাকে ঠিক চিনতে পারল। সে তার শ্বশুরকে দিয়ে বাবাকে ঘরে আনিয়ে হাত পা ধুইয়ে সোনার থালা করে যত্ন সহকারে খেতে দিল। রাজা তার মেয়েকে একেবারেই চিনতে পারলেন না। রাজা রাজকন্যের দিকে তাকিয়ে মুখে অন্ন তোলেন আর কেঁদে তার বুক ভাসান,তখন রাজকন্যে রাজাকে কাঁদছে কেন জিজ্ঞাসা করলে রাজা বললেন, “আমিও এক সময় রাজা ছিলাম আর তোমারই মতো আমার একটা মেয়ে ছিল আমি তার উপর রাগ করে খুব গরিব ঘরে বিয়ে দিয়েছিলাম।”
জানি না সে এখন বেঁচে আছে কিনা। সেই দেখে রাজকন্যেও কেঁদে ফেলল। বলল, “আমিই আপনার সেই মেয়ে বাবা যাকে আপনি নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে বলেছিলেন।এবার দেখুন দেখি মা লক্ষ্মী আমাদের অন্ন যোগায় কিনা।”

রাজা বলেন, “আর লজ্জা দিস না মা। আমার ভুলেই আজ এই অবস্থা।”
সে তার বাবাকে লক্ষ্মী পুজো করার কথা বলল। রাজাও তার রাজ্যে ফিরে লক্ষ্মী পুজো করলেন। আর মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদে সব ফিরে পেয়ে তার রাজ্যে এই লক্ষ্মীপুজোর প্রচার করলেন। এই ভাবে এই লক্ষ্মীপুজো পৃথিবীতে প্রচারিত হল।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির
  3. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ শ্রীকালীকিশোর বিদ্যাবিনোদ সংকলিত ও শ্রীসুরেশ চৌধুরী কর্তৃক সংশোধিত প্রকাশকঃ অক্ষয় লাইব্রেরী

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন