জামাই ষষ্ঠী ।। অরণ্য ষষ্ঠী ।। শুক্লা ষষ্ঠী ব্রত

জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে জামাই ষষ্ঠী ব্রত পালন করা হয়ে থাকে। জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যার পরে যে ষষ্ঠী আসে সেই দিনটি হল শুক্লা ষষ্ঠী বা জামাই ষষ্ঠী। এই ষষ্ঠীর আরেক নাম অরণ্য ষষ্ঠী। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে প্রাচীন ভারতে মেয়ের বিয়ের পর তাঁর সন্তানসম্ভবা না হওয়া অবধি তাঁর বাবা বা মা তাঁর বাড়ি যেতে পারতেন না। কোন কারণে মেয়ের যদি সন্তান ধারণে সমস্যা হত, তাহলে মেয়ের বাড়ি বাপ মায়ের আসাই হয়ে উঠত না। তখন জামাই ষষ্ঠীর প্রচলন হল। এই দিনে মেয়ের বাপের বাড়িতে মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয় এবং তাঁদের কল্যাণের জন্য মা ষষ্ঠীর পুজো দেওয়া হয়। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

এক ব্রাহ্মণের ঘরে তাঁর তিন ছেলে ও তাঁদের তিন বউ থাকতেন। আর ছিল তাঁদের পোষা বেড়াল। তিন বউয়ের মধ্যে ছোট বউ মাঝে মাঝেই খাবার জিনিস চুরি করে খেতেন আর দোষ চাপাতেন তাঁদের পোষা বেড়ালটার ওপর। বেড়ালটা ছিল মা ষষ্ঠীর বাহন। সে মা ষষ্ঠীর কাছে ছোট বউয়ের নামে নালিশ করত। এইরকম ভাবেই একদিন জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে ব্রাহ্মণী ব্রত পালনের জন্য পায়েস, মিষ্টি রান্না করেছিলেন। তিনি স্নানে যাবার আগে ছোট বউকে খাবারগুলো দেখতে বলে গেলেন, “দেখো তো মা! বেড়ালটা যেন কিছুতে মুখ না দেয়।”
তিনি স্নানে গেলে খাবারগুলো দেখে ছোটবউ লোভ সামলাতে পারলেন না। সব খাবার থেকেই একটু একটু করে নিয়ে খেয়ে দেখলেন। আর দই নিয়ে বেড়ালটার মুখে লাগিয়ে দিয়ে এলেন। এরপর স্নান করে এসে ব্রাহ্মণী খাবারের এরম অবস্থা দেখে ছোটবউকে জিজ্ঞেস করলেন এরম কে করেছে! ছোটবউ বললেন, “কি জানি মা! আমার একটু চোখ লেগে গেছিল। মনে হয় বেড়ালটাই খেয়েছে।”
এই বলে তিনি বেড়ালটাকে নিয়ে এসে মাকে দেখালেন, “এই দেখুন মা! মুখে খাবার লেগে আছে এখনও!” বলে বেড়ালটাকে দু চার ঘা দিয়ে ছেড়ে দিলেন।

মনের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে বেড়ালটা বনে গিয়ে মা ষষ্ঠীর কাছে সব কথা বলল। মা ষষ্ঠী বললেন, “আমি সব জানি। তুই কাঁদিস না! আমি ওকে শীঘ্রই এর প্রতিদান দেব।”
কয়েকমাস পর ছোটবউ সন্তানসম্ভবা হলেন। তাঁর একটি ফুটফুটে ছেলে জন্মাল। বাড়ির সকলে তো বিশাল খুশি। ব্রাহ্মণী গরিবদের বস্ত্র বিতরণ করলেন। একদিন রাতে ছেলেকে কোলে নিয়ে শুয়েছিলেন ছোটবউ। পরের দিন ঘুম ভেঙে দেখলেন ছেলে তাঁর কাছে নেই। অনেক খুঁজেও কোথাও ছেলেকে পাওয়া গেল না। এইভাবে ছোটবউ সাত সাতটি সন্তানের জন্ম দিলেন, কিন্তু একইভাবে সকলেই যেন কোথায় নিখোঁজ হয়ে গেল। রাতে কোলে নিয়ে তিনি শুতেন আর সকালে উঠেই কাউকে খুঁজে পেতেন না। পাড়ার লোকেরা সকলে বলা চালু করল, “এ নিশ্চয়ই রাক্ষসী। নিজের ছেলেমেয়ে খেয়ে ফেলে। একে ঘরছাড়া করা উচিত।”
এই কথা শুনে ছোটবউ নিজেই ঘর ছেড়ে বনে চলে গেলেন। বনে এসে মা ষষ্ঠীর নাম করে কাঁদতে থাকলেন।

তাঁর কান্না শুনে মা ষষ্ঠীর দয়া হল। তিনি একজন বুড়ির ছদ্মবেশে এসে ছোটবউকে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন?”
ছোটবউ তাঁর দুঃখের কথা জানালেন। তখন বুড়ি বললেন, “নিজের দুঃখের কথা তো বললি কিন্তু ছেলেপুলে হবার আগে যে তুই খাবার চুরি করে তোদের বেড়ালের নামে দোষ দিতিস সেটা তো বললি না!”
ছোটবউ তখন বুড়ির পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়লেন, “তুমি কে মা! আমার এত কথা জানলে কি করে!”
মা ষষ্ঠী নিজের পরিচয় দিলেন। তখন ছোটবউ আরও জোরে তাঁর পা জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমি অনেক ভুল করেছি মা। আমায় ক্ষমা করুন। আপনি যা বলবেন তাই করব।”
তখন মা ষষ্ঠী তাঁকে বললেন, “পথের ধারে একটা মরা বেড়াল পচে পড়ে আছে। তুই এক হাঁড়ি দই নিয়ে ওর গায়ে ঢেলে চেটে আবার সেই দই হাঁড়িতে তুলতে পারলে তোর ছেলেমেয়েরা ফিরে আসবে”

ছোটবউ তাই করলেন। তখন মা ষষ্ঠী তাঁর ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, “এই দইয়ের ফোঁটা এদের কপালে দে। আর কখনও পুজোর জিনিস চুরি করে আমার বাহনের নামে দোষ দিবি না। আর ছেলেমেয়েকে কখনও ‘দূর হ! মরে যা’ বলবি না।”
এই বলে মা ষষ্ঠী অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ছোটবউ ছেলেমেয়েদের নিয়ে ফিরে এলেন। ব্রাহ্মণী নাতি নাতনিদের পেয়ে খুব খুশি হলেন। সকলে মা ষষ্ঠীর পূজা করলেন। এরপর ছেলেমেয়েরা বড় হলে তাঁদের বিয়ে দিলেন। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে মেয়ে জামাইকে ডেকে জামাই ষষ্ঠী করলেন। এইভাবে এই ব্রতের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

ব্রতটি ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৩২
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৬১
  3. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ শ্রীকালীকিশোর বিদ্যাবিনোদ সংকলিত ও শ্রীসুরেশ চৌধুরী কর্তৃক সংশোধিত প্রকাশকঃ অক্ষয় লাইব্রেরী, পৃষ্ঠা ৫৫
  4. https://eisamay.indiatimes.com/
  5. https://www.anandabazar.com

 

আপনার মতামত জানান