ধর্ম

জামাইষষ্ঠী ।। অরণ্য ষষ্ঠী ।। শুক্লা ষষ্ঠী

জামাই ষষ্ঠী মানেই চব্য চোষ্য লেহ্য পেয়'র যে মেলবন্ধন তাতে গরম মশলার মত  লেগে থাকে জামাই বাবাজীবনের দীর্ঘায়ু কামনা, জামাই আদর, ষষ্ঠী পূজো। জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যার পরে যে ষষ্ঠী আসে সেই দিনটি হল শুক্লা ষষ্ঠী বা জামাই ষষ্ঠী। এই জামাইষষ্ঠীর আরেক নাম অরণ্য ষষ্ঠী। সন্তানদের মঙ্গলার্থে মায়েরা এই ব্রত পালন করেন। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে পৌরাণিক এবং সামাজিক কাহিনীগুলো।

ইতিহাস বলে ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একসময় সংস্কার ছিল কন্যা যতদিন না পুত্রবতী হয় ততদিন কন্যার পিতা বা মাতা কন্যাগৃহে পদার্পণ করবেন না | এখন এই রীতির সমস্যা হল মেয়ের যদি সন্তান ধারণে সমস্যা থাকে তাহলে আর মেয়ের বাড়ি বাপ মায়ের আসাই হয়ে ওঠে না। সমাজের বিধানদাতারা তাই জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা ষষ্ঠীকে বেছে নিলেন জামাই ষষ্ঠী(jamai-sashti) হিসাবে | যেখানে মেয়ে জামাইকে নেমন্তন্ন করে সমাদর করা হবে ও কন্যার মুখ দর্শন করা যাবে আর সেইসঙ্গে মা ষষ্ঠীর পুজো করে তাঁকে খুশি করা যাতে কন্যা শীঘ্র পুত্রমুখ দর্শন করতে পারে | বর্তমানে অবশ্য এই সংস্কার পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে — কন্যার পিতামাতা অথবা যে ব্যক্তি কন্যা সম্প্রদান করবেন তিনি এক বৎসর কন্যার বাড়ি যাবেন না বা গেলেও কন্যার বাড়ির অন্নগ্রহণ করবেন না।

প্রসার ভারতীর প্রাক্তন কর্ণধার জহর সরকারের মতে - " আঠারো-উনিশ শতকে বাংলার সচ্ছল শ্রেণির মধ্যে বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহের ব্যাপক প্রচলন হয়, ফলে অগণিত বালবিধবার যন্ত্রণাময় জীবন, বিস্তর সতীদাহ। এই অবস্থায় জামাই ও স্বামীর দীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা বাঙালি মা এবং মেয়ের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্তত কলকাতা ও চার পাশের এলাকায় সন্তানের মঙ্গলকামনার চেয়ে এর গুরুত্ব বেশি ছিল। যখনই নতুন সংকট আসে, তার মোকাবিলার নতুন চেষ্টাও দেখা যায়। ইতিহাসে বার বার দেখেছি, যুগের প্রয়োজনে সমাজ কী ভাবে পুরনো আচার-অনুষ্ঠানগুলি সংশোধিত করে নেয়। ষষ্ঠী সন্তানের কল্যাণের জন্য পালনীয় একটি ব্রত, কন্যার ভবিষ্যত্‌ নিয়ে উদ্বিগ্ন বাঙালি মা অন্তত একটি ষষ্ঠীকে পালটে নিয়েছেন, জামাইয়ের জন্য ভূরিভোজের আয়োজন করেছেন।"

আবার এটাও দেখার প্রাচীন বাংলায় মেয়ে মানেই 'অন্তঃপুরবাসিনী'। একা একা বাড়ি থেকে বাড়ির বউ বেড়িয়ে বাপের বাড়ি যাবে এতো ভাবাই যেতো না। তাই 'মেয়ে'কে শ্বশুর বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি নিয়ে যাবার একটি উপলক্ষ্য তৈরি করা যাতে জামাইয়ের সাথে মেয়ে বাড়ি আসে আর জামাই সেবাও করা হল।

এখন প্রশ্ন হল জামাইয়ের এই আদরযত্নে মা ষষ্ঠী এলেন কোথা থেকে? এ একটা বড় ইতিহাস বটে। জহর সরকারের অভিমত এ বিষয়ে  অত্যন্ত  গুরুত্বপূর্ণ---  " মা ষষ্ঠী নিছক বাংলার এক গ্রামদেবী নন, শীতলা ও মনসার মতোই তিনিও ভারতের নানা অঞ্চলে পূজিত হন। এক শতাব্দী আগে উইলিয়ম ক্রুক লিখেছিলেন, ‘লোকসমাজে প্রচলিত নানা প্রথা ও রীতি নিয়ে যত চর্চা করা যায়, ততই হিন্দুধর্মের উত্‌সের কাছে পৌঁছনো যায়।'যায়।’ আশুতোষ ভট্টাচার্য লোকায়ত ধর্ম নিয়ে বিস্তর কাজ করেছিলেন। তাঁর মতে, ষষ্ঠী হলেন প্রসূতি এবং শিশুর রক্ষয়িত্রী। অন্য দিকে, নৃতত্ত্ব ও ইতিহাসের পণ্ডিত সুধীর রঞ্জন দাস এই অভিভাবক দেবীর জনজাতীয় উত্‌সের সন্ধান করেছিলেন। আবার হরপ্পাতেও প্রাগৈতিহাসিক এমন দেবীমূর্তি পাওয়া গেছে, যা দেখে নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেছেন, সিন্ধু সভ্যতাতেও ষষ্ঠীর আরাধনা চলত। এটা মানলে তো আমরা সোজা চার হাজার বছর পিছিয়ে যেতে পারি এবং সে ক্ষেত্রে আমাদের মতো লোভী জামাইদের এই গ্রাম্য দেবীটিকে আর একটু শ্রদ্ধার চোখে দেখা উচিত। তবে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, সন্তান জন্মের সঙ্গে প্রাচীন লোকবিশ্বাসে ‘ম্যাজিক’-এর যে যোগাযোগ ছিল, ষষ্ঠীর পুজো তার অনুসারী। জন মারডক, সি এইচ বাক-এর মতো গবেষকরা দেখিয়েছেন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কী ভাবে মেয়েরা ষষ্ঠী বা তাঁর অনুরূপ দেবীর আরাধনা করতেন। উইলিয়ম জোনস নাকি এই রীতির সঙ্গে প্রাচীন ইউরোপের লোকাচারের মিল দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন।পঞ্চম শতকের বায়ুপুরাণে ষষ্ঠী ৪৯টি দেবীর অন্যতম, আর একটি পুরাণে তাঁকে ‘সমস্ত মাতৃদেবীর মধ্যে আরাধ্যতমা’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীর যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে তিনি স্কন্দদেবের পালিকা-মা ও রক্ষয়িত্রী, কিন্তু পরবর্তী রচনায় তাঁর সঙ্গিনী, পদ্মপুরাণেও তিনি স্কন্দের স্ত্রী। ষষ্ঠীর কাহিনিগুলি পাওয়া যায় বাংলায় মঙ্গলকাব্যে, বিশেষ করে ষষ্ঠীমঙ্গল-এ, যেখানে সর্পদেবীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। বিহারে সন্তানজন্মের পরে ছ’দিনের অনুষ্ঠানটিকে ছ’ঠী বলা হয়, ষষ্ঠী সেখানে ছ’ঠী মাতা, সন্তানহীনা দম্পতিরা তাঁর আরাধনায় ব্রত পালন করেন, ষষ্ঠী ব্রত। ওডিশায় সন্তানজন্মের ছ’দিন এবং একুশ দিনে এই দেবী পূজিত হন। উত্তর ভারতের কোথাও কোথাও বিয়ের সময়েও ষষ্ঠীর পুজো করা হয়। ষষ্ঠীকে দেখি সাধারণত জননী রূপে: মার্জারবাহিনী, কোলে এক বা একাধিক শিশু। তাঁর নানান প্রতীক: মাটির কলসি, বটগাছ, বটগাছের নীচে লাল পাথর, ইত্যাদি। খোলা আকাশের নীচে কোনও একটা জায়গা তাঁর পুজোর জন্য নির্দিষ্ট হয়, তার নাম ষষ্ঠীতলা। মনে রাখতে হবে, এই সে দিন পর্যন্ত শিশুমৃত্যুর হার খুব বেশি ছিল। নবজাতককে রক্ষা করার জন্য মানুষ তাই ষষ্ঠীর শরণ নিত। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক হিন্দুধর্ম তাঁকে পৌরাণিক দেবীতে রূপান্তরিত করতে চাইল, লোকধর্ম চাইল পুরনো আচার বজায় রাখতে, ফলে টানাপড়েন চলল। টানাপড়েনের আর একটা চেহারাও দেখা গেছে। ষষ্ঠীকে বলা হয়েছে অমঙ্গলের দেবী, তিনি কুপিত হলে মা ও শিশুদের দুঃখ দেন। পঞ্চম শতকের কাশ্যপ সংহিতায় ষষ্ঠীকে বলা হয়েছে ‘জাতহরণী’, যিনি মাতৃগর্ভ থেকে ভ্রূণ অপহরণ করেন, সন্তান জন্মের ছ’দিনের মধ্যে তাকে ভক্ষণ করেন, তাই শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে ষষ্ঠ দিনে তাঁকে পুজো করা বিধেয়। কিন্তু এ-সবের মধ্যে জামাই ঢুকল কী করে? জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষে সাবিত্রী চতুর্দশীতে স্ত্রীরা স্বামীর দীর্ঘজীবন কামনা করে যমের আরাধনা করেন। মনে হয়, এই লোকাচারটির সূত্র ধরেই কলকাতার বাবু সংস্কৃতি এই ষষ্ঠীটি জামাইকে নিবেদন করেছিল। "

ষষ্ঠী পুজোয় ব্রতীরা সকালে চান করে উপোস থেকে নতুন পাখার ওপর আম্রপল্লব, আমসহ পাঁচফল আর ১০৮টি দুর্বাবাঁধা আঁটি দিয়ে পূজার উপকরণের সঙ্গে রাখে। করমচাসহ পাঁচ-সাত বা নয় রকমের ফল কেটে কাঁঠাল পাতার ওপর সাজিয়ে পুজোর সামনে রাখা হয়। ধান এ পুজোর সমৃদ্ধির প্রতীক, বহু সন্তানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং দুর্বা চিরসবুজ, চিরসতেজ বেঁচে থাকার ক্ষমতার অর্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ দুর্বা হল দীর্ঘ জীবনের প্রতীক। শাশুড়ি-মেয়ে-জামাতার দীর্ঘায়ু কামনা করে ধানদুর্বা দিয়ে উলুধ্বনিসহ বরণ করেন।

সনাতন ধর্মাবলম্বী মতে, এই পার্বণ মূলত পরিবেশ রক্ষার্থে গাছকে দেবতা বিশ্বাসে পুজো করা। কেননা এ আয়োজনে বিবিধ গাছের ডাল যেমন দরকার হয় তেমনি এ দিনে সনাতন পরিবারে থাকে বাহারি মৌসুমি ফল।

কোথাও কোথাও আবার জামাইকে শ্যালিকারা বাঁশের কঞ্চি বেঁকিয়ে ‘হার্ট শেপ’ তৈরি করে তাতে লাল সুতো দিয়ে ধান বেঁধে ভগ্নিপতিতে জামাই ষষ্ঠীর উপহার দেয়।

ঢাকা বা চট্টগ্রামে আবার বিয়ে পাকা হলে মেয়ে ও ছেলের বাড়ি একে অপরকে জৈষ্ঠ্য মাসে আম-দুধ খাওয়ানোর প্রথা আছে।

আসল কথা মেয়ে যাতে সুখে  দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারে তাই জৈষ্ঠ্য মাসে নতুন জামাইকে আদর করে বাড়িতে এনে আম-দুধ খাইয়ে আশীর্বাদ হিসাবে উপহার দেওয়া।সংস্কার যাই হোক না কেন, মেয়ে জামাইকে ডেকে এনে সমাদর করা ও সেইসঙ্গে কন্যা যাতে সন্তানবতী হয় সেই লক্ষ্যে ‘মা ষষ্ঠীকে’ জুড়ে দিয়ে উৎসবের নামকরণ হল জামাই ষষ্ঠী৷

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৩২
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৬১
  3. http://www.anandabazar.com
  4. https://banglalive.com
  5. https://ebela.in/
  6. https://bengali.news18.com
  7. https://www.eibela.com
  8. http://zeenews.india.com
  9. https://en.wikipedia.org

 
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!