ধর্ম

পদ্মিনী একাদশী ব্রত

মল মাসে সাধারনত কোন শুভ কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে শাস্ত্রে। মল মাস শ্রীকৃষ্ণের নাম সংকীর্তন করার পক্ষে আদর্শ মাস কারণ শ্রীকৃষ্ণ নিজে এই মাস কে নিজের নামে অভিহিত করে ‘ পুরুষোত্তম’ মাস বলেন। কথিত আছে,  যুধিষ্ঠির একবার শ্রীকৃষ্ণকে ডেকে বলেন যে তিনি  বহুধর্ম ও ব্রতের কথা শুনেছেন। কিন্তু এই ‘পদ্মিনী’ একাদশীর কথা তার অজানা। তাই তার অনুরোধ শ্রীকৃষ্ণের কাছে তিনি যদি পদ্মিনী একাদশী ব্রত মাহাত্ম্যর কথা তাকে শোনান। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে যে কাহিনী শোনালেন, তা নিচে দেওয়া হল।

একসময় রাজা কৃতবীর্য লঙ্কাপতি রাবণকে পরাজিত করে তাঁর কারাগারে রাবণকে বন্দী করে রাখে। পুলস্ত মুনি রাজার কাছে রাবণের মুক্তি কামনা করেন। মুনির আজ্ঞায় রাজা রাবনকে মুক্ত করে দেন। এই আশ্চর্যজনক কথা শুনে নারদ পুলস্ত মুনিকে জিজ্ঞাসা করেন, “হে মুনিবর! ইন্দ্র সহ সকল দেবতা যেখানে রাবণের কাছে পরাজিত হয়েছিল সেখানে কিভাবে কৃতবীর্য রাবণকে পরাজিত করল? কৃপা করে তা বলুন।”
পুলস্ত মুনি তখন রাবনের কাছে কৃতবীর্য’র জন্মরহস্য বর্ণনা করেন। ত্রেতাযুগে হৈহয় বংশে কৃতবীর্য নামে এক রাজা ছিলেন। মহিষ্মতীপুরে তার রাজধানী ছিল। রাজার এক হাজার পত্নী ছিল। কিন্তু রাজ্যভার গ্রহনের মতো কোন পুত্র রাজার ভাগ্যে হয়নি। দেবতাদের আরাধনাতেও সুফল মেলেনি তার। অবশেষে সাধুদের অনুমতি  অনুসারে বিভিন্ন ব্রত পালন করলেন। তবুও রাজার ছেলে হল না। মন্ত্রীর উপর রাজ্যভার অর্পণ করে তপস্যায় যাবেন বলে স্থির করলেন রাজা কৃতবীর্য। বরানী মহারাজ হরিশচন্দ্রের কন্যা পদ্মিনী ছিলেন অত্যন্ত পতিব্রতা। স্বামীর সঙ্গে তিনিও তপস্যার জন্য মন্দার পর্বতে গমন করলেন। সেখানে তারা দশ হাজার বছর কঠোর তপস্যা করলেন। কিন্তু তবুও কৃতবীর্য পুত্রসুখে বঞ্চিতই রইলেন। রাণী পদ্মিনী মহাসাধ্বী অনুসূয়াকে জিজ্ঞাসা করলেন- হে সাধ্বী! পুত্র লাভের জন্য আমার স্বামী দশ হাজার বছর তপস্যা করেও বিফল হয়েছে । এখন যে ব্রত পালনে ভগবান প্রসন্ন হন অতিশ্রেষ্ঠ পুত্র লাভ হয়, এমন কোন উপায় বিধান করুন। পদ্মিনীর প্রার্থনায় অনুসূয়া প্রসন্ন হয়ে বললেন- বত্রিশ মাস অন্তরে এক অধিমাস বা পুরুষোত্তম মাস আসে। এই মাসে পদ্মিণী ও পরমা দুই একাদশী। এই ব্রত পালন করলে পুত্র দাতা ভগবান শীঘ্রই প্রসন্ন হবেন। অনুসূয়ার নির্দেশে পদ্মিনী পরম শ্রদ্ধায় এই একাদশী ব্রত পালন করলেন। সেই ব্রতে সন্তুষ্ঠ হয়ে স্বয়ং ভগবান গরুড় বাহনে আরোহন করে পদ্মিনীর সম্মূখে উপস্থিত হলেন। ভগবান বললেন, “হে ভদ্রে! আমি প্রসন্ন হয়েছি। পুরুষোত্তম মাসের সমান কোন মাস আমার প্রিয় নয়। এই মাসের একাদশী আমার প্রিয়। তুমি সেই ব্রত যথাযথ পালন করেছ। তাই আমি তোমার ইচ্ছানুরূপ বর প্রদান করব।”
ভগবানের স্তব করে রাণী বললেন, “হে ভগবান! আমার স্বামীকে আপনি বরপ্রদান করুন।”
ভগবান তখন রাজার কাছে এস বললেন, “হে রাজেন্দ্র! আপনার অভিলষিত বর প্রার্থনা করুন।”
মহানন্দে রাজা বললেন, “হে জগৎপতি, মধুসূধন! দেবতা, মানুষ, নাগ, দৈত্য, রাক্ষস আদি কেউ তাকে পরাজিত করতে পারবে না, এমন পুত্র আমি প্রার্থনা করি।”
রাজার প্রার্থনা অনুসারে বরদান করে ভগবান অন্তর্হিত হলেন। রাজা পত্নীসহ সগৃহে ফিরে গেলেন। যথা সময়ে রাণী পদ্মিনীর গর্ভে মহাবলশালী এক পুত্রের জন্ম হয়। মহারাজ কৃতবীর্য পুত্রের নাম রাখে কার্তবীর্য। ত্রিলোক তার সমান কোন বীর ছিলনা । তাই দশানন রাবণ তার কাছে পরাজিত হয়।

শ্রী কৃষ্ণ বললেন, “হে মহারাজ! এই ব্রত যিনি পালন করবেন,তিনি ভগবান শ্রী হরির শ্রীপাদপদ্মে অহৈতুকী ভক্তি লাভ করবেন।”
শ্রী কৃষ্ণের উপদেশে ধর্মরাজ সপরিবারে এই একাদশী ব্রত পালন করেন। বলা হয় যিনি এই ব্রত মাহাত্ম্য পাঠ ও শ্রবন করেন তিনি বহু পুণ্য লাভ করেন। দশমীর দিন থেকেই ব্রতের শুরু হয়। কাঁসার পাত্রে খেতে হয় এইদিন। মসুর, ছোলা, শাক এবং অপরের অন্ন ও আমিষ দশমীর দিন বর্জন করতে হয়। পরের দিন প্রাতঃকৃত্যের পর সুগন্ধী ধূপ, দীপ, চন্দনাদি দিয়ে ভগবানের পূজা করতে হয়। রাত্রিতে জাগ্রত থেকে ভগবানের নাম ও গুণ কীর্ত্তন করতে হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


২ Comments

২ Comments

  1. সনাতন প্রেম

    ফেব্রুয়ারী ২, ২০২০ at ০০:০২

    অনেক অনেক ধন্যবাদ,অনেক আছে একাদশী আগে করে , আবার অনেকেই আছে একাদশী এক দিন পরে করে,, শাস্ত্রে এর উপযুক্ত ব্যাখ্যা জানতে চাই , দোয়া করে জানাবেন

    • সববাংলায়

      ফেব্রুয়ারী ২, ২০২০ at ২৩:২৬

      এই ধরণের ব্রত এক দিন আগে পরে পালন করার জন্য একাধিক কারণ আছে। যেমন, পঞ্জিকা (তিথির সময় ) রচিত হয় সূর্য সিদ্ধান্ত বা দৃক সিদ্ধান্ত মতে। সেক্ষেত্রে সময়ের কিছু পার্থক্য ঘটে এবং যাঁরা যে পঞ্জিকার সময় মেনে চলেন সেই অনুযায়ী পালন করেন। এছাড়া অনেক সময় কেউ কেউ সূর্যোদয় যে তিথিতে হয় সেই দিনকে সেই তিথি হিসেবে পালন করেন আবার কেউ দিনের বেশির ভাগ সময়টার উপর পালন করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোন দিন সকাল ৮ টায় একাদশী ছেড়ে গেলে ,কেউ কেউ সেই দিন টাকে একাদশী ধরেন, অনেকে আবার যেহেতু তার আগের দিনের বেশির ভাগ সময়টা একাদশী ছিল সেই হিসেবে আগের দিনে করেন। এ বছরের সরস্বতী পুজোতে ঠিক এরকমই ব্যাপারটা ঘটেছে।

      পড়তে থাকুন আমাদের বিভিন্ন পোস্ট, প্রশ্ন থাকলে জানান, আমরা উত্তর দিতে চেষ্টা করব।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।