ধর্ম

মল মাস

বলা হয় মল মাসে কোন শুভ কাজ করা উচিত নয়। আমরা প্রত্যেকেই জানি এই সর্বজনবিদিত তথ্যটি কিন্তু এই ‘মল মাস’টি ঠিক কি বস্তু আর ‘মল মাস’-এ কেনই বা শুভ কিছু করা উচিত নয়, এ সম্পর্কে আমাদের মত সাধারণ বাঙালিদের ধারণা কিন্তু বেশ অস্পষ্ট।আসুন আজ এই সুযোগে ‘মল মাস’ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যাক।

একদম প্রথমেই যেটা আমাদের জানতে হবে সেটা হল হিন্দু বর্ষপঞ্জী তৈরি হয় যখন তা তৈরি হয়েছিল প্রধানত আকাশে চাঁদ ও সূর্যের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। চাঁদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় মাস।চন্দ্রপথকে ২৮ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে নক্ষত্র ।

  1. অশ্বিনী
  2. ভরণী
  3. কৃত্তিকা
  4. রোহিণী
  5. মৃগশিরা
  6. আর্দ্রা
  7. পুনর্বসু
  8. পুষ্যা (তিষ্যা)
  9. অশ্লেষা
  10. মঘা
  11. পূর্বফল্গুনী
  12. উত্তরফল্গুনী
  13. হস্তা
  14. চিত্রা
  15. স্বাতি
  16. বিশাখা
  17. অনুরাধা
  18. জ্যেষ্ঠা
  19. মূলা
  20. পূর্বাষাঢ়া
  21. উত্তরাষাঢ়া
  22. অভিজয়িনী(অভীষ্ট বিজয়িনী)
  23. শ্রবণা(শ্রবণকারিনী)
  24. ধনিষ্ঠা(শ্রবিষ্ঠা) (সম্পদময়ী) (গতিময়ী)
  25. শতভিষা(শত আকাঙ্খিনী)
  26. পূর্ব ভাদ্রপদ(প্রথম আশীষপ্রাপ্তা)
  27. উত্তর ভাদ্রপদ(দ্বিতীয় আশীষপ্রাপ্তা)
  28. রেবতী(অগ্রসরিনী)

মাসের এই নামগুলি এক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রত্যেকটি মাসের নাম এসেছে সেই মাসের পূর্ণিমার দিনে চলমান নক্ষত্রের নাম থেকে।পূর্ণিমার দিন চাঁদ যে নক্ষত্রে অবস্থান করে  সেই অনুসারে  মাসের নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ইত্যাদি রাখা হয়েছে। প্রত্যেক নক্ষত্রের আকাশস্থানের পরিমাণ (৩৬০ / ২৮ = ১২ ডিগ্রী ৮৬ মিনিট)। যেমন, যে মাসের পূর্ণিমায় চিত্রা নক্ষত্র থাকে, সেই মাসের নাম চৈত্র; পূর্ণিমায় অশ্বিনী নক্ষত্র অবস্থান করলে সেই মাস হয় আশ্বিন। হিন্দু চান্দ্র পঞ্জিকায় ১২টি মাস রয়েছে ।

এবার জানতে হবে রাশি কি।  সূর্যের গতিপথকে ১২ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে রাশি বা সৌর মাস।

যে চান্দ্র মাসে সূর্য একটি রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন করে না, বরং মাসজুড়ে একটি নির্দিষ্ট রাশিতেই অবস্থান করে,  সেই মাসটির নাম পরবর্তী মাসের নাম অনুসারে হয় এবং এর সাথে “অধিক” শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়। বাংলায় অধিক মাসকে মলমাস বলে।

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে মোটামুটি দুই থেকে তিন বছর পরপর একটি অধিক মাস দেখা যায়। চান্দ্র ও সৌরবর্ষের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য অতিরিক্ত একটি মাস হিসাব করা হয়। এটি অনেকটা ইংরেজি অধিবর্ষের মতো। যেহেতু অধিমাসে কোন পালনীয় তিথি বিদ্যমান থাকে না, তাই কোনো বৈদিক কর্মকাণ্ড এই মাসে পালিত হয় না। সেজন্য স্মার্ত পণ্ডিতেরা অধিমাসকে ‘মলমাস’ বা ‘মলিনমাস’ বলে ঘৃণা করেন।মল মাস কে তাই অশুভ মনে করা হয়।

 

কিন্তু পরমার্থ-শাস্ত্র এ অধিমাসটিকে সর্বোপরি শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করেছে। যেহেতু এ মাসটি সকল প্রকার সকাম কর্মশূণ্য, তাই সেটি কৃষ্ণনামের জন্য সবথেকে উপযোগী। স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম পবিত্র বৈশাখ, কার্তিক, মাঘ মাস অপেক্ষা এই অধিমাসকে বেশি গুরুত্ব প্রদান করেছেন এবং একে নিজ নাম ‘পুরুষোত্তম দ্বারা অলংকৃত করেছেন।’মলমাস’-কে তাই ‘পুরুষোত্তম মাস’ বলা হয়।

 

বর্তমানে যে যে গৌরাব্দ পঞ্জিকা ব্যবহার করি এটি সরাসরি চান্দ্রীয় বর্ষগণনা পদ্ধতির নয়, আসলে চান্দ্র ও সৌরবর্ষের একটি মিশ্রণ।প্রতি চান্দ্রমাস ও সৌরমাসের দৈর্ঘে্র পার্থক্যের কারণে প্রতি মাসে ১৯ থেকে ২৬ ঘণ্টার (গড়ে ২৩ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট ও ২৮সেকেণ্ড) একটি ব্যবধান থেকে যায়। অর্থাৎ চান্দ্রবর্ষের ৩৬০টি তিথিতে সর্বমোট ৩৫৪.৩৬ সৌরদিন লাগে। ফলে প্রতিবছর চান্দ্র ও সৌরমাসের মধ্যে ১০দিন, ২১ ঘণ্টা, ৩৫ মিনিটের পার্থক্য হয়। এই অতিরিক্ত ১০দিন ২১ ঘণ্টা (২৯.৫৩ * ১০.৬৩) গড়ে ২.৭১ বছর বা ৩২.৫ মাসে যোগকরা হয়। ৩২ টি সৌরমাসের জন্য ৩৩টি  চান্দ্রমাস। মোট কথা, চান্দ্র ও সৌর বর্ষের মধ্যে একটি অতিরিক্ত মাস যোগ করতে হয়। সাধারণত, প্রতি ১৯ বছরে ৭টি অধিমাস পড়ে। এটি নির্ভর করে গ্রহসঞ্চারের সময়ের উপর ভিত্তি করে। কখনো সেটি ২৮ মাস, কখনো ৩১, ৩২, ৩৩ বা ৩৫ মাস হতে পারে। এজন্য মহাভারতে পাঁচ বছরে দুটি অতিরিক্ত মাসের কথা বলা হয়েছে। কেননা প্রতি তিন বছর পরপর এমন একটি সময় আসে যখন সূর্যের একটি রাশিতে ভ্রমণের সময়ে বা একটি সৌরমাসে দুটি অমাবস্যা বা তিনটি প্রতিপদ চলে আসে। প্রথম প্রতিপদের পর থেকে অধিক মাস শুরু হয়। দ্বিতীয় অমাবস্যার পরের প্রতিপদ থেকে প্রকৃত সৌরমাস হিসাব করা হয়। অধিক মাসে সৌর সংক্রান্তি হয় না। অধিক মাসকে সৌরবছরের কোনো মাসের সাথে যোগ  করে নামকরণ করা হয়। যে চান্দ্রমাসে সূর্য একটি রাশি হতে অন্য রাশিতে গমন করে না, বরং মাসজুড়ে একটি নির্দিষ্ট রাশিতেই অবস্থান করে,  সেই মাসটির নাম পরবর্তী মাসের নাম অনুসারে হয় এবং এর সাথে ‘অধিক’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়। কার্তিক ও মাঘ মাসে কখনো অধিক মাস হয় না।এই অধিমাস সংযোজন কৃত্রিম নয়, বরং স্বাভাবিক। উপরন্তু বৈদিক শাস্ত্রের অভ্রান্ততার একটি নিদর্শন। মলমাস চলাকালীন নেপালের কাঠমান্ডু জেলার মচ্ছেগাওঁ  শহরে এক মাস ধরে উৎসব হয়। সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী, মচ্ছেনারায়ণ (ভগবান বিষ্ণুর মৎস্য অবতারের নেপালি নাম)-এর জলে এই সময় স্নান করলে সমস্ত পাপমোচন হয়।

 

যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে আমরা মেনে এসছি ‘মল মাস’ অর্থেই তা অশুভ, কিন্তু আজ এও দেখলাম এই মলিনতার বিপরীতে পবিত্রতার ইঙ্গিতও বহন করছে সবার ব্রাত্য এই ‘মল মাস’।


১ Comment

1 Comment

  1. Pingback: পদ্মিনী একাদশী ব্রত | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!