ধর্ম

জয় মঙ্গলবার

জয় মঙ্গলবার একটি  জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরু থেকে সংক্রান্তি অবধি যে কটি মঙ্গলবার পড়ে, তার প্রতিটিই জয় মঙ্গলবার হিসাবে পালন করা হয়। কুমারী এবং সধবা উভয়েই এই ব্রত পালন করে থাকে। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

একদেশে এক সদাগর ও এক বেনে বাস করতো। সদাগরের সাত ছেলে ছিল আর বেনের ছিল সাত মেয়ে। একদিন মা মঙ্গলচণ্ডী এক বুড়ী বামনীর বেশ ধরে প্রথমে বেনের বাড়ি গেলেন। গিয়ে বললেন, “ওমা, দুটি ভিক্ষে দাওগো!”
বেনে বউ তাড়াতাড়ি ভিক্ষের থালা সাজিয়ে ভিক্ষে দিতে এলে বামনী জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ক’য় ছেলে, কয় মেয়ে মা?”
বেনে বউ বলল “আমার সাত মেয়ে মা। কোন ছেলে নেই।”
বামনী তখন বললেন, “আমি ছেলে আঁটকুড়োর মুখ দেখি না, আর মেয়ে আঁটকুড়োর ভিক্ষে নিই না।”
এই বলে যেই উনি চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন অমনি বেনে বউ কেঁদে তার পায়ে পড়ে বলল, “যাতে ছেলে হয়, তার একটা উপায় কর মা!”
বামনী তাকে একটি ফুল দিয়ে বললেন, “এই ফুল ধুয়ে জল খেলে তোমার ছেলে হবে, তার নাম রেখো জয়দেব।” এই বলে বামনী চলে গেলেন।

এবার সেই বামনী সদাগরের বাড়ি গেলেন। গিয়ে বললেন, "ওমা, দুটি ভিক্ষে দাওগো!"
সদাগর বউ একইভাবে ভিক্ষের থালা সাজিয়ে ভিক্ষে দিতে এলে বামনী জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ক’য় ছেলে, কয় মেয়ে মা?”
সদাগর বউ বলল “আমার সাত ছেলে মা। কোন মেয়ে নেই।”
বামনী তখন বললেন, “আমি মেয়ে আঁটকুড়োর মুখ দেখি না, আর ছেলে আঁটকুড়োর ভিক্ষে নিই না।”
এই বলে যেই উনি চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন অমনি সদাগর বউ কেঁদে পায়ে পড়ে বললে, “যাতে মেয়ে হয়, তার একটা উপায় কর মা!”
বামনী একটি ফুল দিয়ে বললেন, “এই ফুল ধুয়ে জল খেলে তোমার মেয়ে হবে, তার নাম রেখো জয়াবতী।”
এই বলে বামনী চলে গেলেন।

কালক্রমে দুই বউই পোয়াতি হল। বামনীর কথা অনুযায়ী তারা তাদের ছেলে মেয়ের নাম রাখল যথাক্রমে জয়দেব ও জয়াবতী।জয়দেব ও জয়াবতী ক্রমে বড় হল। একদিন যখন জয়াবতী মা মঙ্গলচণ্ডীর পুজো করছিল, তখন জয়দেবের পায়রা উড়ে এসে জয়াবতীর কোলে বসল। জয়দেব এসে তাকে বলল, "আমার পায়রা ধরেছ কেন? আমায় ফেরত দাও।"
জয়াবতী তাকে বলল, "আমি কেন ধরতে যাব। ও তো নিজেই এসে বসেছে আমার কোলে। আর আমি ওকে দেব না।"
জয়দেব রেগে গিয়ে তার পুজোর উপকরণের দিকে তাকিয়ে বলল, "যদি না দাও তাহলে এই সব কিন্তু আমি ফেলে দেব।"
এই কথা শুনে জয়াবতী ভয় পেয়ে বলল, "এরম বলতে নেই। আমি মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রত করছি"।
জয়দেব জিজ্ঞেস করল, "এতে কি হয়?"
জয়াবতী উত্তর দিল, "এ ব্রত করলে জলে ডোবে না, আগুনে পোড়ে না, খাঁড়ায় কাটে না, হারালে পেয়ে যায়, মরে গেলে বেঁচে যায়, দেশের রাজা মরলে সে রাজা হয়ে যায়।"
তারপর সে জয়দেবকে তার পায়রা দিয়ে দিল।

জয়দেব তার বাড়িতে এসে  দুঃখী মনে শুয়ে পড়ল। মা জিজ্ঞেস করতে সে বলল জয়াবতীর সাথে তার বিয়ে দিতে হবে। মা তাকে বলল এ আর এমন কথা কি, তার বাবাকে বলে সব ঠিক করা যাবে। জয়দেবের বাবা জয়াবতীর বাবাকে অনেক ভেট পাঠিয়ে তাকে রাজি করাল। জ্যৈষ্ঠমাসের মঙ্গলবার তাদের বিয়ের দিন ঠিক হল। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর জয়াবতী বাসরঘরে যখন জয়দেব ঘুমের ভান করে শুয়ে ছিল, তখন নিজের আঁচলের খুঁট খুলে গদ বের করে খেল। জয়দেব আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল “এটা কেন করলে?”
জয়াবতী বললে, “আজ মঙ্গলচণ্ডীর পূজো কিনা!”
“ও পূজো করলে কি হয়?” জয়দেব জিজ্ঞেস করল।
জয়াবতী বললে, “এ ব্রত করলে জলে ডোবে না, আগুনে পোড়ে না, খাঁড়ায় কাটে না, হারালে পেয়ে যায়, মরে গেলে বেঁচে যায়, দেশের রাজা মরলে সে রাজা হয়ে যায়। বিয়ের আগেই তো তোমায় বলেছিলাম।”

পরদিন সকালে সাতডিঙ্গা নানা ধনে পূর্ণ করে জয়াবতীর বাড়ি থেকে রওনা দিল সবাই। অনেক দূর যখন সমুদ্রের চারদিকে যখন শুধুই জল, তখন জয়দেব জয়াবতীকে ডেকে বলল, “দেখ এখানে জলদস্যুর ভয় বড়। তুমি গয়না গাঁটি সব খুলে ফেল।”
সমস্ত গয়না গাঁটি খুলে নিয়ে একটা পুঁটুলি করে জলে ফেলে দিল। ফেলে দিতেই একটা বোয়াল মাছে সেই পুঁটুলি গিলে ফেলল। তারপর যখন জয়দেবের বাড়ি বর-কনে এল,  পাড়ার সবাই তাদের বরণ করে  তুলতে গিয়ে নিজেদের মধ্যেই বলল “মাগো!মেয়েকে গয়না গাঁটি কিছুই দেয়নি!”
জয়েদেবের কানে কথা যেতেই সে সবাইকে চুপ করতে বলল। জয়দেবের বোনেরা বলল, "শ্বশুরবাড়ির ওপর কি টান দাদার!"
এরপর যখন বউভাতের সময় এল, তখন এক সমস্যা উপস্থিত হল। কোন জলাশয়ে নাকি মাছ পাওয়া যাচ্ছিল না। জেলেরা বারবার খালি হাতে ফিরে আসছিল। এইকথা শুনে জয়াবতী তাদের সমুদ্রে জাল ফেলতে বলল। জেলেরা সেই কথামত সমুদ্রে জাল ফেলে ঐ বোয়াল মাছটাকে ধরল। কিন্তু মাছটা ধরা পড়লেও কেউ সেটা কুটতে পারল না। শেষ কালে জয়দেব বলল “জয়াবতী মাছ কুটবে।”
শুনে সকলে হেসে উঠল। কিন্তু জয়াবতী মা মঙ্গলচণ্ডীকে স্মরণ করে মাছ কুটতে গেল। যেই না বঁটির গায়ে মাছ ঠেকাল অমনি মাছ কেটে খান খান হয়ে গেল, আর সেই গয়নার পুঁটলি তার কোলে এসে পড়ল। জয়াবতী সেই গয়নাগাটি  পড়ে বেরিয়ে এল যখন, সবাই অবাক হয়ে গেল দেখে। এরপর রান্না করার কথা এলেও, জয়দেব বলল, "জয়াবতী রান্না করবে।" জয়াবতী মা মঙ্গলচণ্ডীকে স্মরণ করে রাঁধতে গেল। সবাই খেয়ে সুখ্যাতি করল খুব।

এরপর তাদের যথাসময়ে একটি ছেলে হল। একদিন ছেলেকে শুইয়ে জয়াবতী কাজে গেছে, জয়দেব এসে ছেলেকে নিয়ে গিয়ে কুমোরের পৌনে ফেলে দিয়ে এল। সেদিন কুমোরের পৌন জ্বলল না। মা মঙ্গলচণ্ডী এসে ছেলেকে নিয়ে জয়াবতীর কোলে দিয়ে এলেন। আর একদিন জয়দেব ছেলেকে নিয়ে পুকুরে সিঁড়ির তলায় ঘাড় গুঁজে পুঁতে দিয়ে এল। মা মঙ্গলচণ্ডী আবারও তাদের ছেলে কে বাঁচিয়ে জয়াবতীর কোলে দিয়ে এলেন। আর একদিন জয়াবতী ছেলেকে শুইয়ে রেখে কাজ করতে গেলে, এসে দেখে  দেখে জয়দেব ছেলে কে একখানা কাটারি দিয়ে কাটছে। জয়াবতী দেখেই ছুটে এসে বললে, “তোমার এখনও বিশ্বাস হল না?” জয়দেব বলল “হ্যাঁ! এইবার আমার বিশ্বাস হয়েছে।” তারপর জয়াবতীর আরও অনেক ছেলে মেয়ে হল। জয়দেব-জয়াবতী সুখে ঘরকন্না করতে লাগলো। এরপর তারা তাদের সমস্ত ছেলেমেয়েদের এই ব্রতের কথা বলে প্রচার করতে বলল। এভাবেই জয় মঙ্গলবারের ব্রতকথা সবার মধ্যে প্রচার হল।

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৬০
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, পৃষ্ঠা ৪৭

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!