ধর্ম

নবরাত্রি

দুর্গাপূজোর সঙ্গে নবরাত্রি ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে। মহালয়ার পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নয় রাত্রি ধরে মা দুর্গার নয়টি শক্তির  যে পূজো হয় তাকেই নবরাত্রি বলে। শরৎ জুড়ে ভারতের পূর্বপ্রান্ত মেতে ওঠে শারদীয়া বা দেবী দুর্গার আরাধনায় যখন, তখন দেশের পশ্চিমপ্রান্ত মেতে ওঠে নবরাত্রি পালনে।বাংলার বাঙালিদের মাতৃ আরাধনার বাইরেও দেশের পশ্চিম প্রান্তে যে কত বড় আকারে এই দুর্গা আরাধনার সময়েই নবরাত্রি পালন হয় সেটা অনেকেই জানেন না। আজ এই নবরাত্রি বিষয়েই আমরা একটু জেনে নেব।

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, নবরাত্রি আসলে প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নয় রাত্রি ধরে মা দুর্গার নয়টি শক্তির আরাধনা।দুর্গার এই নয়টি শক্তি হলঃ-

১| শৈলপুত্রী : নবরাত্রির প্রথম রাত্রে নবদুর্গার প্রথম রূপ হল শৈলপুত্রী| শৈলপুত্রী নাম কারণ-  শৈল মানে হল পাহাড় | দুর্গা  হলেন হিমালয় পর্বতের কন্যা |যেহেতু তিনি শৈল (হিমালয়)এর কন্যা তাই তার নাম এখানে শৈলপুত্রী | এখানে দেবীর  বাহন ষাঁড়| তাঁর এক হাতে থাকে ত্রিশূল | অন্যহাতে পদ্ম |

২| ব্রহ্মচারিণী : নবরাত্রির দ্বিতীয় রাত্রে নবদুর্গার দ্বিতীয় রূপ হল ব্রহ্মচারিণী |যিনি ব্রহ্মাকে স্বয়ং জ্ঞান দান করেন তিনি এখানে শান্তির প্রতিভূ | তাঁর ডান হাতে থাকে রুদ্রাক্ষের জপমালা | বাঁ হাতে তিনি ধরে আছেন কমণ্ডলু | তিনি ভক্তদের সুখ, স্বস্তি, শান্তি দান করেন |

৩| চন্দ্রঘণ্টা : তৃতীয় রাতে নবদুর্গার তৃতীয় রূপ হল চন্দ্রঘণ্টা| তাঁর মাথায় থাকে একফালি চাঁদ | চাঁদের আকার আবার ঘণ্টার মতো |এই ঘণ্টা  দেবীদুর্গার মহিষাসুর বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের দেওয়া ঘণ্টা যার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি ছিল। এই দেবীর বাহন সিংহ | দশভুজা দেবীর দশ হাতে ধরা অস্ত্র |চন্দ্রের চেয়েও সুন্দরী ইনি |

৪| কুষ্মাণ্ড : সংস্কৃতে কু মানে স্বল্প | উষ্ম বা উষ্ণ হল গরম এবং অণ্ড মানে ডিম | তিনটি কথা মিলে হল কুষ্মাণ্ড | এই রূপে দেবী হলেন সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টির প্রতীক | অর্থাত্‍ তাঁর থেকেই জন্ম হয়েছে এই মহাবিশ্বের | নবরাত্রির চতুর্থ রাতে পূজিতা এই দেবীর কোথাও আট, কোথাও আবার দশ হাত | সিংহবাহিনী দেবী দশ হাতে ধারণ করে আছেন আয়ুধ এবং কমণ্ডলু |

৫| স্কন্দমাতা : বাংলায় যেমন দুর্গাকে গণেশজননী হিসেবে  পূজো করার রেওয়াজ আছে, পশ্চিম ভারতে তেমনি আবার দেবী দুর্গাকে  কার্তিকের মা হিসেবে পূজোর রেওয়াজ আছে | কার্তিকের এক নাম স্কন্দ | নবরাত্রির পঞ্চম রাতে দুর্গা পূজিত হন স্কন্দমাতা রূপে | এই দেবী চার হাতবিশিষ্টা | ডানদিকের উপরের হাতে ধরে আছেন শিশু কার্তিককে | প্রস্ফুটিত পদ্ম থাকে আর এক দক্ষিণ হস্তে | বাঁ দিকের একটি হাত বরাভয় দিচ্ছে | আর এক হাতে ধরে আছেন পদ্ম | এই রূপে দেবী দুর্গা কোনও বাহনে উপবিষ্ট নন | তিনি বসে থাকেন ফুটে থাকা কমলে |

৬ | কাত্যায়নী : নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে দেবী আরাধিত হন এই নামে।পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে বৈদিক যুগে কাত্যায়ন নামে এক ঋষি ছিলেন যার একটি পুত্র সন্তানের পর একটি কন্যসন্তান লাভের ইচ্ছা হয় | দেবী দুর্গার তপস্যা করে তিনি কন্যা সন্তান লাভ করেন | তাঁর স্তবে তুষ্ট হয়ে স্বয়ং দেবী দুর্গা জন্ম নেন  কাত্যায়নের কন্যা রূপে | তখন তাঁর নাম হয় কাত্যায়নী |

৭ | কালরাত্রি : নবরাত্রির সপ্তম রাতে দেবী পূজিত হন কালরাত্রি নামে। ঋগ্বেদের রাত্রিসুক্তে পরমাত্মাই রাত্রিদেবী। এখানে দেবী কৃষ্ণবর্ণা |অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহ থেকেই আবির্ভূতা বলেই তিনি কালরাত্রি।দেবীর এই রূপই উপাসিত হয় কালি রূপে | তবে এই রূপেও দেবী ভক্তের শুভ করেন | দেবীর বাহন গাধা |

৮| মহা গৌরী : নবরাত্রির অষ্টম রাতে দেবীর রূপ মহাগৌরি।দুর্গা নাকি আসলে কৃষ্ণবর্ণা | মহাদেব যখন গঙ্গাজল দিয়ে তাঁকে স্নান করান, তখন তিনি হয়ে ওঠেন গৌরবর্ণা |  তাঁর নাম হয় মহাগৌরী | প্রচলিত বিশ্বাস, নবরাত্রির অষ্টম রাতে তাঁর পুজো করলে সব পাপ ধুয়ে যায় | সাদা পোশাক পরিহিতা, চার হাত বিশিষ্টা দেবীর বাহন ষাঁড় ।

৯ | সিদ্ধিদাত্রী : নবদুর্গার নবম তথা শেষ রূপ হল সিদ্ধিদাত্রী | সিংহবাহিনী দেবীর চার হাতে আশীর্বাদী মুদ্রা | তিনি সিদ্ধি দান করেন | দেবী ভগবত্‍ পুরাণে অনুযায়ী, স্বয়ং মহাদেব দেবী দুর্গাকে সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজো করেছিলেন এবং তার ফলে মহাদেব সকল সিদ্ধি লাভ করেন | এই সিদ্ধিদাত্রীর আশীর্বাদেই অর্ধনারীশ্বর রূপ লাভ করেন মহাদেব |

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

To Top
error: Content is protected !!