বিজ্ঞান

চন্দ্রশেখর সীমা

চন্দ্রশেখর সীমা

মহাবিশ্বে অসংখ্য নক্ষত্র রয়েছে। আমাদের সৌরজগতে আমরা সূর্যকেই একমাত্র নক্ষত্র বলে চিনি। কিন্তু সূর্যের মতন আরও অনেক নক্ষত্র, এমনকি সূর্যের থেকে কয়েক হাজার গুণ বড় নক্ষত্রও রয়েছে মহাবিশ্বে। রাতের আকাশে গভীর কালো প্রেক্ষাপটে উজ্জ্বল আলোকবিন্দুগুলিকেই আমরা আসলে নক্ষত্র বা তারা বলে মনে করি। সেই সব নক্ষত্রের পেটের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম আর প্রতিনিয়ত নিউক্লীয় সংযোজনের ফলে নক্ষত্রের মধ্যে উৎপন্ন হয় তাপ ও আলো। ঘরে রান্নার জন্য যেরকম গ্যাস সিলিন্ডারের সাহায্যে ওভেন জ্বালানো যায়, যতক্ষণ গ্যাস থাকে ততক্ষণই ওভেনে রান্না সম্ভব। সেভাবেই এই নক্ষত্রের মধ্যেকার জ্বালানিও একদিন শেষ হবে আর তখন নক্ষত্রের ঠিক কী পরিণতি হবে তার ধারণা দেয় এই চন্দ্রশেখর সীমা (Chandrasekhar Limit)। ভারতীয় বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর সুব্রহ্মণ্যনের নাম জড়িয়ে আছে এই বিশেষ আবিষ্কারের সঙ্গে। আসুন জেনে নেওয়া যাক চন্দ্রশেখর সীমা বলতে আসলে ঠিক কী বোঝায়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্য বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের কতগুলি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। যেমন – প্রধান ক্রম নক্ষত্র (Main Sequence Star), শ্বেত বামন নক্ষত্র (White Dwarf Star), লাল বামন নক্ষত্র (Red Dwarf Star), দৈত্যাকার নক্ষত্র (Giant Star) এবং অতি দৈত্যাকার নক্ষত্র (Super Giant Star)। এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন একেক প্রকার নক্ষত্রের জন্মের সময় তার ভর একেক রকম হয়, নক্ষত্রটি কতকাল টিকে থাকবে তা নির্ভর করে সম্পূর্ণ তার ভরের উপর। এই প্রসঙ্গেই একেবারে সহজভাবে বলতে হয়, একটি স্থিতিশীল শ্বেত বামন নক্ষত্রের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ভরকেই চন্দ্রশেখর সীমা বলা হয়। বর্তমানে এই চন্দ্রশেখর সীমার সর্বগ্রাহ্য প্রামাণ্য মান হল 1.4 M0 অর্থাৎ সূর্যের ভরের ১.৪ গুণ (M0 = সূর্যের ভর)। নিখুঁত ভরের সাংখ্যমান হল ২.৭৬৫ × ১০৩০ কিলোগ্রাম।

একটি প্রধান ক্রমের নক্ষত্র মহাকর্ষের প্রবল আকর্ষণে সঙ্কুচিত হওয়া প্রতিরোধ করে তাপীয় চাপের সাহায্যে, কিন্তু শ্বেত বামন নক্ষত্র তা প্রতিরোধ করে ইলেকট্রন অবক্ষয় চাপের (Electron degeneracy pressure) মাধ্যমে। এখন এই ইলেকট্রন অবক্ষয় চাপ এবং নক্ষত্রের আভ্যন্তরীণ মহাকর্ষীয় চাপের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার সূচক হল এই চন্দ্রশেখর সীমা। ভারতীয় বিজ্ঞানী সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখরের নামে এই সীমাটির নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৩০ সালে তিনি অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার সূত্র অবলম্বনে এই সীমাটি নির্ণয় করেন। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত তাঁর অনেকগুলি গবেষণাপত্রে চন্দ্রশেখর দেখিয়েছিলেন যে শ্বেত বামন নক্ষত্রগুলি যারা অবক্ষয়িত ইলেকট্রনের চাপের মাধ্যমে স্থিতিশীল থাকে, তাদের ক্ষেত্রে সূর্য অপেক্ষা ১.৪ গুণ বেশি ভর হলে স্থিতিশীল থাকা সম্ভব নয় কারণ এর থেকে বেশি ভর হলে তা কেন্দ্রমুখী মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সঙ্কুচিত হয়ে নিউট্রন স্টার বা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবে। এই ধরনের নক্ষত্রগুলি যদি নিজেদের অভ্যন্তরে সঞ্চিত সমস্ত তাপ-নিউক্লীয় জ্বালানি সম্পূর্ণ শেষ করে না ফেলে, তবে সেক্ষেত্রে এই ভরের সীমা একটু বেশিও হতে পারে। ফলে সমস্ত শ্বেত বামন নক্ষত্রের ভর হয় এই চন্দ্রশেখর সীমার নিচে। খুব সংক্ষেপে বললে যে সমস্ত নক্ষত্রের আয়ুষ্কালের শেষে ভর থাকে চন্দ্রশেখর সীমার উপরে, সেই নক্ষত্র নিউট্রন নক্ষত্র অথবা একটি কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়। একটি নক্ষত্রের মধ্যে দুই ধরনের চাপ সর্বদা একে অপরের বিপরীতে কাজ করে। প্রথমত নক্ষত্রের অভ্যন্তরে ক্রমাগত নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়া ও কোয়ান্টাম প্রভাবের দরুন উদ্ভূত বহির্মুখী চাপ এবং দ্বিতীয়ত হল কেন্দ্রমুখী মহাকর্ষ বল। যে কোনও প্রধান ক্রমের নক্ষত্র কোটি কোটি বছর টিকে থাকে কেবলমাত্র এই দুই চাপের সাম্যাবস্থার কারণে। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে যখন জ্বালানি নিঃশেষিত হওয়ার কারণে আর নিউক্লীয় বিক্রিয়া সংঘটিত হতে পারে না, সেই সময় অন্তর্মুখী মহাকর্ষ বলের কারণে সেই নক্ষত্র সঙ্কুচিত হতে শুরু করে এবং এর ঘনত্ব বাড়তে থাকে। নক্ষত্রের ঘনত্ব বাড়তে বাড়তে তা প্রথমে নিউট্রন নক্ষত্র এবং অসীম ঘনত্ব সম্বলিত কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হতে পারে। এখানে স্মর্তব্য চন্দ্রশেখর সীমার কথা যা নির্দেশ করে নক্ষত্রের পরিণতি কীরূপ হবে।

জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার (Astrophysics) জগতে ‘চন্দ্রশেখর সীমা’র যুগান্তকারী তাত্ত্বিক আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানী সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখর ১৯৮৩ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। যদিও ব্রিটিশ জ্যোতির্পদার্থবিদ আর্থার এডিংটন চন্দ্রশেখর নির্ণীত এই সীমার ধারণার বিরোধিতা করেন। এডিংটন জানতেন যে তাত্ত্বিকভাবে কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব সম্ভব এবং চন্দ্রশেখর সীমার ধারণাটিই এই অস্তিত্বকে প্রমাণিত করে। কিন্তু ১৯৩৫ সালে চন্দ্রশেখরের সঙ্গে কথোপকথনকালে এডিংটন বলেছিলেন যে প্রাকৃতিক উপায়েই একটি নক্ষত্র সঙ্কুচিত হতে হতে একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধে এসে থেমে যাবে এবং সেখানে মহাকর্ষ অনেক বেশি শক্তিশালী হয় নক্ষত্রের বিকিরণ বন্ধ করার জন্য। অন্যদিকে আবার নিলস বোর, উইলিয়াম ফাউলার, উলফ্‌গ্যাং পাউলি প্রমুখ পদার্থবিদরা চন্দ্রশেখর সীমার ধারণায় সম্মত হয়েছিলেন।

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন