ধর্ম

হরিষ মঙ্গলচন্ডী ব্রত

বৈশাখ মাসের প্রথম মঙ্গলবারে হরিষ মঙ্গলচন্ডী ব্রত পালন করা হয়।  বলা হয় এই ব্রত পালন করলে তার চোখের জল পড়ে না। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের পেছনে প্রচলিত কাহিনী।

এক বামুনি আর এক গোয়ালিনী ছিল পরস্পরের সই অর্থাৎ বান্ধবী। প্রতি বৈশাখ মাসের প্রথম মঙ্গলবারে বামুনি হরিষ মঙ্গলচন্ডী ব্রত পালন করত। তা দেখে গোয়ালিনী বামুনিকে জিজ্ঞাসা করল, “সই! তুমি যে এই ব্রত পালন কর, এই ব্রত করলে কি হয়?”
বামুনি বলল,  “এই ব্রত করলে কারোর চোখের জল পরে না,চিরকাল সুখে কাটানো যায়।”
তা শুনে গোয়ালিনী তাকে অনুরোধ করল সেও এই ব্রত করবে। বামুনি যেন তাকে এই ব্রতের নিয়ম শিখিয়ে দেয়।   বামুনি তার সইকে বলল এই ব্রত খুব শক্ত আর সে এই  পালন করতে পারবে না।,কিন্তু  গোয়ালিনীর জোরাজুরিতে বামুনি তাকে সব নিয়ম বলে দিল। গোয়ালিনী বৈশাখ মাসের প্রথম মঙ্গলবারে এই ব্রত খুব নিয়মমতো নিষ্ঠা ভরে  করল। দয়াময়ী মঙ্গলচন্ডীর আশীর্বাদে তার  অনেক সুখ ধন সম্পত্তি হল। কিন্তু সে তো  খুব গরিব ছিল, তাই  এত ধন-সম্পত্তি পেয়ে তার অন্য  সমস্যা উপস্থিত হল ।

এতদিন সে তো দিন আনত আর দিন খেত ,তাই  তার এত সুখ আর সহ্য হল না।  হঠাৎ করে ধনী হয়ে কাদঁবার জন্য তার প্রাণ ছটফট  করতে লাগল। শেষে সে তার সইএর কাছে গিয়ে বলে, “সই আমার আর এই সুখ সহ্য হচ্ছে না আর আমি কাঁদতেও পারছি না। কিন্তু না কাঁদতে পারলে আমি মরেই যাবো মনে হচ্ছে।  তুমি আমাকে কাঁদার ব্যবস্থা করে দাও।গোয়ালিনীর কথা শুনে বামুনি অবাক । অনেক ভেবে বামুনি বলল, “সই এক কাজ করো ওই ধোপাদের মাচায় যে বড় লাউ গাছ হয়েছে তা তুমি ছিঁড়ে দাও।তাহলে ওরা তোমাকে গাল দেবে সেই দুঃখে তুমি কেঁদো।”
গোয়ালিনী আনন্দে তাই করল কিন্তু তার হাতের ছোয়ায় ধোপাদের লাউগাছ আরও লগলগে হয়ে গেল। তা দেখে ধোপারা গাধার পিঠে করে কচি লাউগাছের ডগা, বড় লাউ সব গোয়ালিনীর বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। সে ভেবেছিল কোথায় কাদঁবে,তার উল্টো হয়ে গেল। সে আবার তার সই এর কাছে দৌড়ে গেল। এবার তার সই বলল , ” রাজার হাতি মরে ওই বনের ধারে পড়ে আছে। তুমি হাতির গলা জড়িয়ে কাঁদগে,তাহলে রাজার সেপাই ভাববে তুমি হাতির দাঁত চুরি করতে এসেছো তখন তোমাকে চোর ভেবে মারবে। তখন না হয় তুমি কেঁদো।”
গোয়ালিনী তাই করল। কিন্তু তার ছোঁয়ায় মরা হাতি বেঁচে উঠল। সেটা দেখে সেপাইরা রাজাকে খবর দিল। রাজা সেই হাতির পিঠে চড়ে গোয়ালিনীর বাড়ি এসে তাকে প্রণাম করে অনেক ধন দৌলত দিয়ে গেল। তার ধনসম্পত্তি আরও বেড়ে গেল।

সে আবার তার সইয়ের কাছে ছুটে গেল। এবার বামুনি তাকে পরামর্শ দিল বিষের নাড়ু তৈরি করে জামাই বাড়ি পাঠাবার জন্য । বামুনি তাকে বলল, ” বিষের নাড়ু খেয়ে জামাই বাড়ির সবাই মরে গেলে তখন তোমাকে ডাইনি ভেবে অনেক গাল দেবে তারপর তুমি প্রানভরে কাদঁবে।”
গোয়ালিনী বিষের নাড়ু তার জামাই বাড়ি পাঠাল। কিন্তু মা মঙ্গলচন্ডী তার বিষের নাড়ু অমৃতের নাড়ু করে চলে গেলেন। জামাই বাড়ির সবাই নাড়ু খেয়ে খুব সুখ্যাতি করলো,আরও নাড়ু চেয়ে পাঠাল।গোয়ালিনী আবার তার সই এর কাছে দৌড়ে গেল, এবং বলল সে কাঁদবে ভেবেছিল কিন্তুজামাই বাড়ি থেকে তো আরও নাড়ু চেয়ে পাঠিয়েছে।

এবার তার মনে হল পরের বার থেকে আর মঙ্গলচন্ডীর পুজো করবে না। তারপর সে মঙ্গলবার মা মঙ্গলচন্ডীর পুজো করা বন্ধ করে দিল। মা গোয়ালিনীর উপর রেগে গেলেন এবং তার মাথা থেকে  আশীর্বাদের হাত তুলে নিলেন। পরদিন সকালে সে ঘুম থেকে উঠে দেখে তার ঘরে যে যেখানে ছিল সবাই মরে পরে আছে। তা দেখে সে কেঁদে কেঁদে গোটা বাড়ি,গোটা পাড়া মাথায় করল।সে কান্না আর থামে না। বুক চাপড়ে গলা ফাটিয়ে, মা মঙ্গলচন্ডীর ঘট ধরে সে খুব কাঁদল। শেষে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লে তাকে মা মঙ্গলচন্ডী স্বপ্ন দিয়ে বলেন আবার তাঁর পুজো করে সেই ঘটের জল নিয়ে সবার উপর ছিটিয়ে দিতে,  তাহলেই আবার সবাই বেঁচে উঠবে। সে তাই করল। ওই জল সবার উপর ছিটিয়ে দিলে আবার তারা সবাই বেঁচে উঠল। এই দৃশ্য দেখে পাড়ার সবাই হরিষ মঙ্গলচন্ডী ব্রত করা শুরু করে দিল। এই ভাবে এই ব্রত প্রচারিত হল।

তথ্যসূত্র


  1. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ আশুতোষ মজুমদার, প্রকাশকঃ অরুণ মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটির, ৫৭ পৃষ্ঠা
  2. মেয়েদের ব্রতকথা- লেখকঃ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও রমা দেবী কর্তৃক সংশোধিত, প্রকাশকঃ নির্মল কুমার সাহা, দেব সাহিত্য কুটির, ৩৭ পৃষ্ঠা

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।