পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের পশ্চিম পীরপাঞ্জাল পর্বতমালায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৬৫০ ফুট উচ্চতায় হাজি পীর গিরিপথ অবস্থিত। নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে অবস্থিত হওয়ায় ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের নিরাপত্তার জন্য এই গিরিপথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চল থেকে উরি–পুঞ্চ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি চালানো যায়। এই হাজি পীরকে কেন্দ্র করে ১৯৬৫ সালে ভারতীয় সেনা ও পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে হাজি পীরের লড়াই (Battle of Haji Pir Pass) সংঘটিত হয়। ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসে এই যুদ্ধটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাজি পীরের যুদ্ধে একদিকে যেমন ভারতীয় সেনার অদম্য জেদ, দুঃসাহসিকতা, পারদর্শিতা প্রদর্শিত হয়েছে, আবার অন্যদিকে এই যুদ্ধ ভারতের কূটনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে। হাজি পীর দখলের ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতারা ভারতীয় সেনার বিজিত হাজি পীর গিরিপথ পাকিস্তানকে ফিরিয়ে দেয়। এই যুদ্ধে অসীম সাহসিকতা এবং অসাধারণ নেতৃত্বের জন্য মেজর রঞ্জিত সিং দয়াল এবং ব্রিগেডিয়ার জোরাওয়ার চাঁদ বক্সী ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক পদক মহাবীর চক্র পান। এছাড়া ১ প্যারা রেজিমেন্টকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ২৬ থেকে ২৮ আগস্টের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনার হাজি পীরের লড়াই হয়। ভারতের পক্ষ থেকে ১ প্যারা রেজিমেন্ট, ১৯ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং ৪ রাজপুত রেজিমেন্ট প্রধান আক্রমণকারী ইউনিট হিসেবে এই যুদ্ধে অংশ নেয়।
ভারত-চিন যুদ্ধে চিনের কাছে ভারতের পরাজয়ের পর ১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান জম্মু ও কাশ্মীরে ‘অপারেশন জিব্রাল্টার’ নামে একটি গোপন সামরিক অভিযান শুরু করে। তারা চেয়েছিল, প্রায় ৩০,০০০ অনুপ্রবেশকারী কাশ্মীর উপত্যকা এবং রাজৌরি সেক্টরে ঢুকে ওই অঞ্চলটিকে অশান্ত করে তুলবে। তারা স্থানীয় জনগণকে বিদ্রোহে উসকানি দিয়ে ভারতের প্রশাসনিক কাঠামো ধ্বংস করে কাশ্মীরে নিজেদের ইচ্ছামত সরকার গঠন করতে চেয়েছিল।
কিন্তু পাকিস্তানের অভিযান শুরু হওয়ার পর স্থানীয় কাশ্মীরি জনগণ অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থন না করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ নেয়। তারা গোপনে অনুপ্রবেশকারীদের খবর ভারতীয় বাহিনীকে জানিয়ে দেয়। হাজি পীর গিরিপথ ছিল পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারী ও নাশকতাকারীদের প্রধান পথ। তাই সেই সময় অনুপ্রবেশকারীদের আটকে ওই অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখার জন্য ভারতীয় সেনা পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে অবস্থিত হাজি পীর গিরিপথ দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া এই গিরিপথ দখল করতে পারলে ভারতের উরি ও পুঞ্চ অঞ্চলের মধ্যে সরাসরি সড়ক নির্মাণ করে সহজে সামরিক রসদ সরবরাহ করা যেত। ফলে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা অনেকখানি সুরক্ষিত হত। এই কারণেই ভারতীয় সেনাবাহিনী হাজি পীর গিরিপথ দখলের জন্য আক্রমণ করেছিল।
হাজি পীর গিরিপথের প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে এই গিরিপথ দখল করা খুব একটা সহজ ছিল না। এছাড়া শত্রুপক্ষ সব সময় এই অঞ্চলটিকে দৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত করে রাখত। ভারতীয় সেনারা যদি এই অঞ্চল সরাসরি আক্রমণ করত তাহলে বহু ভারতীয় সেনার হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই কারণে হাজি পীরের লড়াইয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী সরাসরি আক্রমণ না করে একটি নিখুঁত সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের অধীনস্থ ৬৮ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড ব্রিগেডিয়ার জোরাওয়ার চাঁদ বক্সীর নেতৃত্বে পশ্চিম দিক থেকে হাজি পীর গিরিপথ আক্রমণ করে। এই অপারেশনের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন বক্সী’। এছাড়া একই সময়ে ২৫ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের ৯৩ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড দক্ষিণ দিকে পুঞ্চ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের উপর আক্রমণ করে। এই আক্রমণের সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন ফৌলাদ’ (Operation Faulad)। ব্রিগেডিয়ার জোরা সিং এই অপারেশনের নেতৃত্ব দেন। এই উভমুখী সাঁড়াশি আক্রমণের ফলে পাকিস্তানি সেনারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল।
শত্রুঘাঁটি দখলের জন্য ২৬ আগস্ট রাত সাড়ে নটা নাগাদ ভারতের ১ প্যারাশুট রেজিমেন্ট কাঁটাতার এবং মাইনফিল্ড ঘেরা যুদ্ধবিরতি রেখা অতিক্রম করে। এই সময় ব্যাটালিয়নের এক অংশ ও ফিল্ড অবজার্ভেশন অফিসারকে পর্বতমালার নীচে রেখে প্রবল বৃষ্টি, কুয়াশা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে মেজর রণজিৎ সিং দয়াল তাঁর বাকি সেনাদের নিয়ে হাজি পীরের খাড়া ঢাল বেয়ে উপরে ওঠেন। ভারতীয় সেনার এই অপ্রত্যাশিত দিক থেকে আক্রমণের ফলে পাকিস্তানি বাহিনী সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। আসলে এইরকম দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে ভারতীয় সেনা যে এভাবে আক্রমণ করতে পারে তা অনুমান করতে পারেনি পাকিস্তানি সেনা।
১৯৬৫ সালের ২৭ আগস্ট ভোররাতে ভারতীয় সেনারা সাঙ্ক অবস্থানের শত্রু ঘাঁটিগুলি দখল করে নেয়। তারপর তাঁরা লেদওয়ালি গলি দখল করে ওই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে। অবশেষে ভারতীয় সেনাবাহিনী ২৮ আগস্ট সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ হাজি পীর গিরিপথ দখল করে নেয়। তারপর পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ শুরু করলেও ১ প্যারা সেই আক্রমণ প্রতিহত ক’রে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিজেদের দখলে নেয়। এইভাবে ভারতীয় সেনা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই গিরিপথটি দখল করে স্বাধীনতার পর প্রথমবার ভারতীয় বাহিনী সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাজি পীরের লড়াই ভারতীয় সামরিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা রণকৌশল। হাজি পীর গিরিপথ দখল করে ভারতীয় সেনা কৌশলগত দিক থেকে একটি বড় বিজয় লাভ করেছিল। এই গিরিপথ দখলের পর ভারতীয় সেনাবাহিনী অনুপ্রবেশকারীদের রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেয়।
এই লড়াইয়ে ভারতের ১ প্যারা ব্যাটালিয়নের ৬ জন নিহত ও ২২ জন আহত হয়েছিল। অন্যদিকে এই যুদ্ধে ১৬ জনের মতো পাকিস্তান সেনার মৃত্যু হয়েছিল।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য এবং স্থানীয় কাশ্মীরি জনগণের সহযোগিতায় হাজি পীর দখলের পর পাকিস্তানি সেনার অপারেশন জিব্রাল্টার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এবং কাশ্মীরকে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ১৯৬৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান জম্মু সেক্টরের আখনুরকে লক্ষ করে ‘অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ (Operation Grand Slam) নামে আর একটি সামরিক অভিযান শুরু করে। ভারী ট্যাংক ও কামান নিয়ে চালানো এই হামলায় ভারতীয় বাহিনী তীব্র চাপের মুখে পড়ে যায়। তাই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডে আক্রমণের নির্দেশ দেন। এই আদেশের পর ভারতীয় সেনারা ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে লাহোর সেক্টর ও শিয়ালকোট সেক্টরের দিকে দুটি বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। ভারতের এই আকস্মিক ও শক্তিশালী পাল্টা হামলার কারণে পাকিস্তান আখনুর ও কাশ্মীরের ফ্রন্ট থেকে তাদের সেনা ও ট্যাংক সরিয়ে লাহোর এবং শিয়ালকোটে পাঠাতে বাধ্য হয়। এর ফলে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পূর্ণমাত্রায় শুরু হয়।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় অসীম সাহসিকতা এবং অসাধারণ নেতৃত্বের জন্য মেজর রঞ্জিত সিং দয়াল এবং ব্রিগেডিয়ার জোরাওয়ার চাঁদ বক্সী ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক পদক মহাবীর চক্র পেয়েছিলেন। ১ প্যারা রেজিমেন্টকে হাজি পীর যুদ্ধ সম্মাননা এবং জম্মু ও কাশ্মীর থিয়েটার সম্মাননা (১৯৬৫) প্রদান করা হয়েছিল।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের শেষে ১৯৬৬ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত উজবেকিস্তানের তাশখন্দে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই নিকোলায়েভিচ কোসিগিনের (Alexei Nikolayevich Kosygin) মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনার পর ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তাশখন্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, উভয় পক্ষের সেনাবাহিনী ১৯৬৫ সালে ৫ আগস্টের আগের অবস্থানে ফিরে যেতে রাজি হয়। তাই ভারত গুরুত্বপূর্ণ হাজি পীর গিরিপথ পাকিস্তানকে ফিরিয়ে দেয়। কিছু সামরিক বিশ্লেষকের মতে, পাকিস্তানি সেনারা আখনুর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে ফতেওয়াল রিজ (Fatewal Ridge) পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। তাই তারা হুমকি দিয়েছিল যে, যদি হাজি পীর পাকিস্তানকে ফিরিয়ে দেওয়া না হয় তাহলে তারা যে কোন মুহূর্তে আখনুর দখলের জন্য পুনরায় অভিযান শুরু করবে। আখনুর ও জম্মুর নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নিরুপায় হয়ে প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পাকিস্তানকে হাজি পীর ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে ‘কঠিন কিন্তু শান্তিমুখী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেন। কিন্তু এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল যে, অনেকের মতে সেই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের হুমকির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সম্পূর্ণ সক্ষম ও প্রস্তুত ছিল।
বিগত ছয় দশক ধরে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের রণকৌশল নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে হাজি পীর গিরিপথ ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি যথাযথ ছিল না। তাঁরা এই সিদ্ধান্তের পিছনে তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের দূরদর্শীতার অভাব লক্ষ করেছেন। তাঁরা সেই সময় ভারতীয় কৌশলগত পরিকল্পনাকারীদের সমালোচনা করেছেন। ভারত হাজি পীর গিরিপথটি ধরে রাখতে পারলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠত। অনেকে মনে করেন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপের কারণেই প্রধানমন্ত্রী সম্মত হতে বাধ্য হন। আসলে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পাকিস্তানের সাথে বিরোধ মিটিয়ে উপমহাদেশে স্থায়ী শান্তি ও সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছা থেকেই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, হাজি পীর অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই অনুপ্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান