ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান (Allauddin Khan) ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত জগতের একজন জনপ্রিয় সংগীতজ্ঞ ও বাদ্যযন্ত্র শিল্পী। তিনি ভারতীয় যন্ত্রসংগীতের পরিবেশন, শিক্ষাদান ও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেন এবং সরোদকে অন্যতম প্রধান একক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি মূলত সরোদ বাদক হিসাবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেন। সরোদ ছাড়াও তিনি সেতার, সানাই, বাঁশি, তবলা ও মৃদঙ্গসহ বহু বাদ্যযন্ত্রে অসাধারণ সুর তুলে দর্শকদের মুগ্ধ করতে পারতেন। আলাউদ্দিন খান হেমন্ত, হেম-বেহাগ, মঞ্জ-খামাজ, ইমনি মাঁঝ, মদনমঞ্জরী, জৌনপুরী টোড়ি-সহ বহু নতুন রাগ সৃষ্টি বা বিকশিত করেন। কয়েকটি নতুন বাদ্যযন্ত্র তৈরি করার ক্ষেত্রেও আলাউদ্দিন খানের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রদেশের মাইহারে তিনি সেনিয়া-মাইহার ঘরানার আধুনিক রূপ নির্মাণ ও বিকাশে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষক। তাঁর শিষ্যরা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি সংগীত নাটক একাডেমি ফেলোশিপ, পদ্মভূষণ এবং পদ্মবিভূষণ ইত্যাদি সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৮৮১ সালে (মতান্তরে ১৮৬২ সালে) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সির ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শিবপুর গ্রামে আলাউদ্দিন খানের জন্ম হয়। তাঁর বাবা সাবদার হোসেন খান বা সাধু খান ছিলেন পেশায় একজন সম্ভ্রান্ত কৃষক। এছাড়া সংগীতের প্রতিও তাঁর অনুরাগ ছিল। তিনি আগরতলা রাজদরবারের প্রধান সভাবাদক ওস্তাদ কাশেম আলী খানের শিষ্য ছিলেন। তিনি খুব ভালো সেতার বাজাতে পারতেন। আলাউদ্দিন খানের মায়ের নাম হরসুন্দরী। সাবদার হোসেন খানের পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। তাঁদের নাম হল – সমীরউদ্দিন খান, ফকির আফতাবউদ্দিন খান, আলাউদ্দিন খান, ওস্তাদ নায়েব আলি খান, ওস্তাদ আয়েত আলি খান, মধুমালতি খাতুন এবং কাদর খাতুন। ওস্তাদ আয়েত আলি খান ছিলেন একজন সেতার ও সুরবাহার বাদক। আলাউদ্দিন খান ছোটবেলা থেকে এক সুরেলা পরিবেশের মধ্যে বড় হন। তিনি মদনমঞ্জরী দেবীকে বিয়ে করেন। তাঁদের সন্তানদের নাম হল- আলি আকবর খান, শারিজা খান, জেহানারা খান এবং অন্নপূর্ণা দেবী। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে আলি আকবর খান ও অন্নপূর্ণা দেবী পরবর্তীকালে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেন। আলি আকবর খান সরোদবাদক এবং অন্নপূর্ণা দেবী সুরবাহারবাদক ও সংগীতশিক্ষক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন।
এক নজরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের জীবনী:
- জন্ম: ১৮৮১ সাল (মতান্তরে ১৮৬২)
- মৃত্যু: ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২
- কেন বিখ্যাত: মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা, প্রখ্যাত সরোদিয়া, বহু বাদ্যযন্ত্রের বাদক এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুরু।
- পুরস্কার: ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ (১৯৫৮) ও ‘পদ্মবিভূষণ’ (১৯৭১), সঙ্গীত নাটক অকাদেমি ফেলোশিপ (১৯৫৪) এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ‘দেশিকোত্তম’ (১৯৬১)।
শৈশব থেকেই আলাউদ্দিন খানের সংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। ছোটবেলায় তাঁর সংগীতের প্রথম পাঠ শুরু হয় পরিবারের মধ্যেই; তাঁর বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিন খান তাঁকে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা দেন। পাঁচ বছর বয়সে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। তবে তিনি প্রায়শই স্কুল ফাঁকি দিয়ে শিবপুরের একটি স্থানীয় শিব মন্দিরে ধর্মীয় সংগীত অনুষ্ঠান শুনতে যেতেন। অন্যদিকে তাঁর পরিবার চাইত না যে, তিনি সংগীতকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করুন। তাই মাত্র দশ বছর বয়সে আলাউদ্দিন খান বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে একটি যাত্রাদলে যোগ দেন। যাত্রাদলের সঙ্গে থাকার সময় তিনি বাংলার জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, পাঁচালি-সহ নানা লোকসংগীতের সঙ্গে পরিচিত হন এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন।
এরপর আর্থিক সংকট সত্ত্বেও আলাউদ্দিন খান কলকাতার বিখ্যাত সংগীত শিল্পী নুলো গোপালের কাছে প্রায় সাত বছর সংগীতের প্রশিক্ষণ নেন। কিন্তু নুলো গোপালের আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি কণ্ঠসংগীত চর্চা ছেড়ে যন্ত্রসংগীতে মনোনিবেশ করেন। তিনি সংগীত শিল্পী ও বাঁশিবাদক অমৃতলাল দত্ত বা হাবু দত্তের অধীনে বেশ কিছু বছর সংগীত চর্চা করেন। এখানে তিনি ভারতীয় ও পাশ্চাত্য উভয় পদ্ধতিতেই সংগীতের সাধনা করতেন। তিনি জনাব রবার্ট লোবোর কাছে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীত, হাজারী ওস্তাদের কাছে সানাই, নাকাড়া, টিকারা ও জগঝম্প বাজানোর তালিম নেন। এছাড়া তিনি মৃদঙ্গম, পাখাওয়াজ ও তবলা বাজানো শিখেছিলেন। আলাউদ্দিন খান ওস্তাদ আহমেদ আলি খানের কাছে সংগীত ও সরোদ বাদনের তালিম নেন। আহমেদ আলি খানের কাছে প্রায় পাঁচ বছর সরোদ শেখার পর আলাউদ্দিন খান রামপুরে গিয়ে তানসেন-পরম্পরার বিশিষ্ট বীণকার উজীর খানের শিষ্যত্ব লাভের চেষ্টা করেন।
সেই সময় রামপুর ছিল গানবাজনার শ্রেষ্ঠ আখড়া। রামপুর রাজবংশের রাজসভার সংগীতশিল্পী এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী সভাসদ ছিলেন উজীর খান। তিনি রামপুরের নবাব হামিদ আলি খানের দরবারের শীর্ষ মর্যাদা ভোগ করতেন। তবে তিনি বহু চেষ্টা করেও উজীর খানের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। এই সময় চরম আর্থিক কষ্ট ও সঠিকভাবে সংগীত চর্চা না করতে পারার জন্য আলাউদ্দিন খান এতটাই ভেঙে পড়েন যে, তিনি আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছিলেন। সেই সময় এক স্থানীয় মৌলবি তাঁকে সাহায্য করেন। মৌলবির মারফতে তিনি নবাব হামিদ আলি খানের কাছে একটি আবেদন পাঠান। তারপর তিনি নিজের অসামান্য বাদনশৈলী দ্বারা নবাবকে মুগ্ধ করেন। অবশেষে নবাবের মধ্যস্থতায় ওস্তাদ উজীর খান আলাউদ্দিন খানকে ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে শিষ্যত্ব লাভের পরও তিনি উজীর খানের থেকে সঠিক তালিম পেতেন না। প্রথম দুই বছর তাঁকে উজীর খানের বাড়িতে সাধারণ চাকুরের মতো ফাইফরমাশ খাটতে হত। পরবর্তীকালে আলাউদ্দিন খানের পারিবারিক সংকটের কথা জানার পর উজীর খান তাঁকে প্রকৃত সংগীতের তালিম দেওয়া শুরু করেন। উজীর খান তাঁকে সরোদ, রবাব ও সুরশৃঙ্গার শেখালেও বংশের নিয়ম অনুযায়ী বীণা শেখাননি। তবে তিনি আলাউদ্দিন খানকে সরোদের মাধ্যমে বীণার সমস্ত কঠিন কৌশল ও বাজানোর ঢং প্রয়োগ করার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
আলাউদ্দিন খান ১৯১৮ সালে মধ্যপ্রদেশের মাইহার রাজ্যে সংগীত শিক্ষার মাধ্যমে আশ্রয় ও জীবিকা অর্জনের জন্য ‘মাইহার ব্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা করেছিলন। মাইহার রাজ্যের শাসক ব্রজনাথ সিং এই ব্যান্ডের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আলাউদ্দিন খান প্রায় দশ-বারোটি নতুন বাদ্যযন্ত্র তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর নির্দেশনায় ছোট ভাই আয়েত আলি খান সেনীয়া রবাব, সুররবাব, সুরশৃঙ্গার ও পুরনো সরোদের সংমিশ্রণে একটি বড় আকারের আধুনিক সরোদ তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে মাইহার ঘরানায় এই সরোদ যন্ত্রটি বাজানো হয়। এছাড়া তাঁর পরিকল্পনা ও পরামর্শে ‘মন্ত্রনাদ’, ‘মনোহর’, ও ‘চন্দ্রসারঙ্গ’ নামক তিনটি বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হয়। পরবর্তীকালে সেতার ও ব্যাঞ্জোর মিশ্রণে ‘সেতার ব্যাঞ্জো’ নামে আর একটি যন্ত্র তৈরি করা হয়। এগুলি ছাড়া মাইহার ব্যান্ডের মূল আকর্ষণ ছিল ‘নলতরঙ্গ’ নামক এক বিশেষ বাদ্যযন্ত্র।
বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে জটিল রাগ রাগিণীকে সহজ ভাবে নানা ছন্দে অলঙ্কৃত করে পরিবেশন করতেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান। তিনি প্রায় তিরিশটির মত নতুন রাগ তৈরি করেছিলেন। তাঁর হেমন্ত, হেম বেহাগ, মাঝ খাম্বাজ, আহির ললিত, ইমন মাঁঝ ইত্যদি রাগগুলি ভারতীয় রাগ সংগীত জগতের বিখ্যাত মৌলিক রাগ। এই রাগগুলো মাইহার ঘরানা ছাড়াও অন্যান্য ঘরানাতে সমান জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
১৯৩৫ সালে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের দলের সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়ে সংগীত পরিবেশন করেছিলন। ১৯৫৫ সালে তিনি ভারতের মধ্যপ্রদেশের মাইহারে নতুন প্রতিভাদের উৎসাহিত করার জন্য মাইহার কলেজ অফ মিউজিক প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বেশ কিছু রাগ ও সংগীত রেকর্ড করেছিলেন।
আলাউদ্দিন খান নিজে যেমন একাধারে বিখ্যাত সংগীত শিল্পী ছিলেন আবার তিনি বেশ কিছু বিশ্ববন্দিত শিল্পী তৈরি করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কিছু ছাত্র-ছাত্রী সেতার বাদক পন্ডিত রবিশঙ্কর, সরোদ বাদক ওস্তাদ আলি আকবর খান, ভারতীয় হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সুরবাহার বাদক অন্নপূর্ণা দেবী, শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী এবং বিশ্বখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পান্নালাল ঘোষ, বসন্ত রাই, বাহাদুর খান, শরণ রানি প্রমুখ।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান তাঁর সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের অপরূপ সুরের মাধ্যমে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শ্রোতাদের বিমোহিত করে দিয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে লখনউয়ের ভাটখণ্ডের সংগীত বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘বাদ্য আচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর ভারতের প্রথম সংগীত সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। ১৯৫২ সালে তিনি প্রেসিডেনশিয়াল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছিলেন, যা বর্তমানে সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার নামে পরিচিত। ১৯৫৪ সালে তিনি সংগীত নাটক একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করেছিল। মধ্যপ্রদেশের খয়রাগড়ে ইন্দিরা কলা সংগীত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ‘সংগীত আচার্য ‘ পুরস্কারে সম্মানিত হন। ১৯৬৩ সালে কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট. উপাধি লাভ করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশিকোত্তম উপাধি পান। তিনি ১৯৭১ সালে পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত হন। এছাড়া দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব ল’ উপাধিতে ভূষিত করে। সংগীত জগতে তাঁর অসাধারণ অবদানের জন্য ঢাকার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র সংসদ তাঁকে আজীবন সদস্যপদ প্রদান করে সম্মানিত করে।
১৯৬৩ সালে ঋত্বিক ঘটক ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান’ নামক একটি তথ্যচিত্র পরিচালনা করেন। পরিচালক হরিসাধন দাসগুপ্ত ‘বাবা আলাউদ্দিন খান ‘ নামে আরেকটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। এছাড়া ১৯৯৩ সুনীল শানবাগ ‘মাইহার রাগ’ নামে একটি তথ্যচিত্র পরিচালনা করেন। এই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মাইহার ঘরানার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়। ১৯৯৪ সালে এই চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ নন-ফিচার চলচ্চিত্র হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশের মাইহারে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান