বহু ভারতীয় ইতিহাসবিদ ও জাতীয়তাবাদী নেতা ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ভারতের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি সিপাহী বিদ্রোহের অনেক আগে থেকেই ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরোধিতা করা শুরু করেছিল। তিলকা মাঝি (Tilka Majhi) ছিলেন এমনই একজন আদিবাসী নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। জঙ্গল ও জমির উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি একটি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আদিবাসী সংগঠিত করে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা যোদ্ধারা ধনুক-তীরসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে গেরিলা কৌশলে লড়াই করত বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা ব্রিটিশদের সরকারি শিবির ও কোষাগারে আক্রমণ চালায় বলেও প্রচলিত আছে। তিলকা মাঝির আন্দোলনে ব্রিটিশ বাহিনী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। প্রচলিত ইতিহাসে বলা হয়, ১৭৮৪ সালে তিলকা মাঝি বিষমাখা তির ছুঁড়ে ব্রিটিশ কর্মকর্তা অগাস্টাস ক্লিভল্যান্ডকে (Augustus Cleveland) গুরুতরভাবে আহত করেন এবং পরে ক্লিভল্যান্ডের মৃত্যু হয়। তবে আধুনিক কিছু গবেষণায় এই দাবি নিয়ে গুরুতর সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে; সরকারি নথি অনুযায়ী ক্লিভল্যান্ড ১৩ জানুয়ারি ১৭৮৪ অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যান। তিলকা মাঝির আন্দোলন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে আরও আদিবাসী আন্দোলন শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামী তিলকা মাঝির অবদানকে স্বীকার করে তাঁর নামে বেশ কিছু জায়গা এবং প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে।
১৭৫০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বর্তমান বিহারের সুলতানগঞ্জের তিলকপুর গ্রামে তিলকা মাঝির জন্ম হয়। অনেকে মনে করেন, তাঁর আসল নাম তিলকা মুর্মু। পাহাড়িয়া ভাষায় তিলকা শব্দের অর্থ হল ‘রাগী লাল চোখের ব্যক্তি’। বলা হয় যে, উগ্র স্বভাবের কারণে তাঁকে ওই নাম দেওয়া হয়েছিল। আর গ্রামের প্রধান হিসাবে তিনি গ্রামের মুখিয়া বা ‘মাঝি’ উপাধি পেয়েছিলেন। তবে কিছু নথিপত্রে তিলকা মাঝিকে জাবরা পাহাড়িয়া নামে উল্লেখ করা হয়েছিল। তিলকা মাঝি সাঁওতাল নাকি পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
তিলকা মাঝি ছোটবেলা থেকে প্রকৃতি ও গভীর অরণ্যের মুক্ত পরিবেশের মধ্যে বড় হন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অসীম সাহসী। তিনি তীর চালনো, বন্য পশু শিকার, নদী পারাপার করা ও উঁচু গাছে চড়ায় ছিলেন ওস্তাদ। কুস্তি এবং তীর-ধনুক চালানোর নানা কৌশল তিনি শৈশবেই আয়ত্ত করেন। গ্রামের যেকোনও সমস্যার সমাধান করতে তিনি সবার আগে এগিয়ে যেতেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি লক্ষ করেন, জমিদার ও কোম্পানির সদস্যরা কীভাবে বনের সম্পত্তি লুঠ করে সাধারণ আদিবাসীদের উপর অত্যাচার করে।
এক নজরে তিলকা মাঝির জীবনী:
- জন্ম: ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৭৫০
- মৃত্যু: ১৩ জানুয়ারি, ১৭৮৫
- কেন বিখ্যাত: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের অন্যতম প্রথম আদিবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও গেরিলা যোদ্ধা, যিনি রাজমহল ও ভাগলপুর অঞ্চলে তিলকা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
- স্বীকৃতি: তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে বিহারের বিখ্যাত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয়েছে ‘তিলকা মাঝি ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং ভাগলপুর ও দুমকায় তাঁর ব্রোঞ্জ মূর্তি ও স্মৃতিচক স্থাপিত হয়েছে।
১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করার পর পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের রাজস্ব ও প্রশাসনিক প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে। এর ফলে রাজমহল পাহাড় ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের আদিবাসী সমাজও কোম্পানির রাজস্বনীতি ও স্থানীয় জমিদারদের চাপের মুখে পড়ে। ইংরেজ সরকারের অতিরিক্ত খাজনার দাবি এবং মধ্যস্বত্বভোগী মহাজন ও জমিদারদের শোষণের ফলে রাজমহল পাহাড়ের নিরীহ আদিবাসীরা নিজেদের জমিতেই কার্যত ভূমিহীন মজুরে পরিণত হয়। বনাঞ্চলের স্বাভাবিক ফলমূল ও কাঠের ওপর কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম হলে আদিবাসীদের জীবিকা সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়ে।
১৭৭০ সালে পুরো বাংলা, বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যা বাংলার ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। এই সময় গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। চাষ করার মতো মানুষ ও গরুর অভাবে উর্বর কৃষিজমিগুলো ধীরে ধীরে জঙ্গলে পরিণত হয়। খাদ্যের অভাবে বহু মানুষ মারা যায়। এই অবস্থায় ভূমিহীন নিপীড়িত আদিবাসীদের সঙ্গে নিয়ে তিলকা মাঝি রাজমহল ও তার পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকায় আন্দোলন শুরু করেন।
তিলকা মাঝির বিদ্রোহ ঘোষণার পর ইংরেজরা বিদ্রোহ দমন করতে তৎপর হয়। কিন্তু রাজমহল পাহাড়ের মধ্যে আত্মগোপনকারী তিলকা মাঝিকে তারা খুঁজে পায়নি। ব্রিটিশ চরদের নজর এড়িয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে আদিবাসীদের গ্রামে গিয়ে আবেগমথিত ভাষণ দিতেন। জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করতেন। তিলকা মাঝি অরণ্য যুদ্ধে পটু এক দুর্ধর্ষ আদিবাসী গেরিলা বাহিনী তৈরি করেন। তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল তির ধনুক, তরবারি, বল্লম, টাঙ্গি, গুলতি ইত্যাদি দেশীয় অস্ত্র। এই সামান্য অস্ত্র নিয়েই তারা ব্রিটিশবাহিনীকে পরাজিত করতে চেয়েছিল। ওই বাহিনীর প্রত্যেকটি যোদ্ধাকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতেন তিলকা ও তাঁর বিশ্বস্ত সহকর্মীরা। সুদক্ষ দলবল নিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে ব্রিটিশ ক্যাম্প, কোষাগার ও জমিদারবাড়িতে আক্রমণ করতেন। তিলকা মাঝির দুঃসাহসী অভিযানে রমনা পাহাড়ি ও কারিয়া পুজহরের উপজাতির মানুষেরাও তাঁকে সাহায্য করত। ১৭৭৮ সালে প্রায় তেরোশো আদিবাসীদের নিয়ে তিনি রামগড়ের ব্রিটিশ ক্যাম্প ও সরকারি কোষাগারের অর্থ লুঠ করেন। লুঠ করা অর্থ তিনি অসহায় গরীব আদিবাসীদের মধ্যে দান করে দিতেন। এই কারণে রাজমহল এলাকার গরিব আদিবাসীদের কাছে তিলকা মাঝি হয়ে ওঠেন ‘বাবা তিলকা’।
তিলকা মাঝির এই অভিযানের পর ইংরেজরা ওই এলাকাটিকে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। তিলকার প্রতিরোধ দমন করতে ব্রিটিশ বাহিনী একাধিক সামরিক অভিযান চালায়। এই সময় ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে গেরিলা বাহিনীর রক্তক্ষয়ী খন্ডযুদ্ধ শুরু হয়।
এই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আদিবাসী উপজাতিগুলির মধ্যে লড়াই লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। আসলে তারা বুঝতে পেরেছিল যে, অরণ্য ও জমির উপর অধিকার কায়েম রাখতে হলে স্বাধীনচেতা উপজাতিদের জোট বিনষ্ট করা একান্ত জরুরী। এই কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন অগাস্টাস ক্লিভল্যান্ড সাহেব। তিনি ছিলেন ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা এবং ভাগলপুর-রাজমহল অঞ্চলের কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট। একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ কর্মকর্তা হিসাবে তিনি প্রথম থেকেই উপজাতির মানুষদের বিদ্রোহ দমন করতে চেয়েছিলেন। রাজমহল পাহাড়ের পাহাড়িয়া উপজাতিদের শান্ত রাখার জন্য তিনি ‘ভাগলপুর হিল রেঞ্জার্স’ নামক একটি বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলেন। পাহাড়িয়া আদিবাসীদের মধ্য থেকেই সেনা সংগ্রহ করে তিনি ওই বাহিনী গঠন করেন। যেসকল আদিবাসীরা এই বাহিনীতে যোগ দিত তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেত। এছাড়া ক্লিভল্যান্ড পাহাড়িয়া উপজাতির সর্দারদের কিছু টাকার বিনিময়ে নিজের অনুগত করে রেখেছিলেন। অন্যদিকে অন্যান্য আদিবাসী মানুষেরা সবরকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হত। তাদের অনেক বেশি খাজনা দিতে হত। এই জন্য পাহাড়িয়াসহ অন্যান্য সাধারণ আদিবাসী মানুষ ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।
১৭৮৪ সালে সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করার সময় তিলকা মাঝি একটি গাছের উপর থেকে ক্লিভল্যান্ড সাহেবকে বিষাক্ত তির ছুঁড়ে গুরুতর জখম করেন। ওই তির লাগার ফলে পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যু হয় বলে মনে করা হয়। ক্লিভল্যান্ডের হত্যাকারী হিসাবে তিলকা মাঝিকে বীরের মর্যাদায় ভূষিত করা হলেও, আধুনিক গবেষকরা এই ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেন।
ক্লিভল্যান্ডের উপর আক্রমণের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ব্রিটিশরা তিলকা মাঝিকে ধরার জন্য আরও সেনা পাঠায়। সেই সময় তারা কিছু আদিবাসীদের টাকার লোভ দেখিয়ে তিলকা মাঝির গোপন আস্তানার কথা জেনে নেয়। তারপর ১৭৮৪ সালে আয়ার কুত (Eyre Coote)-এর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বাহিনী তিলকার বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। ইংরেজ বাহিনীর বন্দুক ও কামানের হামলায় বহু আদিবাসী সেনার মৃত্যু হয়। ব্রিটিশ সেনা সুলতানগঞ্জ ও ভাগলপুরের সব পাহাড় ঘিরে ফেলে পাহাড়ে যাওয়ার সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দেয়। খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ ছাড়াই তিলকা মাঝি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ সেনার হাতে ধরা পড়েন।
তিলকা মাঝিকে গ্রেফতার করার পর ইংরেজ সেনাকর্তারা তাঁর উপর চরম অমানবিক ও নৃশংস অত্যাচার শুরু করে। শোনা যায়, তাঁকে ঘোড়ার লেজের সঙ্গে বেঁধে রুক্ষ পথ দিয়ে ভাগলপুর কালেক্টর সাহেবের বাসভবন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বটগাছে তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহটাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সেদিনটা ছিল ১৭৮৫ সালের ১৩ জানুয়ারি।
ভারতের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির মধ্যে শহীদ তিলকা মাঝিকে ঔপনিবেশিক-বিরোধী আদিবাসী সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রথমদিকের নেতা বলে স্মরণ করা হয়। তাঁর আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরবর্তী সময়ে জঙ্গলমহল ও ছোটনাগপুরের বিভিন্ন জনজাতি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন শুরু করে।
বিভিন্ন সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম ও আলোচনায় আদিবাসী বীর তিলকা মাঝির সংগ্রামের কথা উঠে এসেছে। তিলকা মাঝির আন্দোলনকে অবলম্বন করে মহাশ্বেতা দেবী ‘শালগিরার ডাকে’ নামক এক বিখ্যাত উপন্যাস রচনা করেন। বাবা তিলকা মাঝির নেতৃত্বে পরিচালিত আদিবাসী বিদ্রোহের ইতিহাস ও বীরত্ব এই উপন্যাসে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বীর শহীদ তিলকা মাঝির স্মৃতি ও অবদানকে অমর করে রাখতে বিহার ও ঝাড়খণ্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও স্মারক গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর ভাগলপুর শহরে তিলকা মাঝির ফাঁসির স্থানে তাঁর একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে এই এলাকার নাম তিলকা মাঝি চক । ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগনার সদর শহর দুমকাতেও তাঁর স্মরণে আরেকটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। বিহারের ভাগলপুরে তিলকা মাঝির আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঐতিহ্যবাহী ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নাম দেওয়া হয়েছে তিলকা মাঝি ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয়। জল-জঙ্গল-জমির আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে শহীদ তিলকা মাঝি চিরকাল মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে এক অমর বিপ্লবী হিসেবে ভাস্বর হয়ে থাকবেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান