ভূগোল

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা

বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশিরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ( Brahmanbaria )।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ত্রিপুরা জেলা নামেই পরিচিত ছিল। ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এই জেলার বর্তমান রূপটি গড়ে ওঠে৷ ঐতিহ্যবাহী তিতাস নদীর উপস্থিতি এই জেলাকে পর্যটকদের চোখে পৃথক করেছে। 

বাংলাদেশের একটি অন্যতম জেলা হল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। এই জেলার উত্তরে কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে কুমিল্লা জেলা, পূর্বদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী ও নরসিংদী জেলা ঘিরে রয়েছে সমগ্র জেলাটিকে। এই জেলা নদীবহুল। তিতাস, মেঘনা, আউলিয়াজুরী, কালাছড়ি, খাস্তি, ছিনাইহানি, ডোলভাঙ্গা, পাগলা, পুটিয়া, বলভদ্র, বলাক, বালিয়াজুড়ি, বালুয়া, বিজনা, বুড়ি, বেমালিয়া, মধ্যগঙ্গা, রোপা, লংঘুন, লাহুর, সোনাই, হাওড়া, হুরুল প্রভৃতি নদী কোমল করে রাখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি আর মানুষের মন।  

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বাংলাদেশের প্রায় ১,৯২৭.১১ বর্গ কিলোমিটার স্থান জুড়ে রয়েছে৷ ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমগ্র বাংলাদেশে চোদ্দতম জনবহুল জেলা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৮,৪০,৪৯৮ জন৷ মোট জনসংখ্যার ১৩,৬৬,৭১১ জন পুরুষ আর ১৪,৭৩,৭৮৭ জন মহিলা আছেন এই জেলায়। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নামকরণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। এস. এম. শাহনূরের লেখা ‘নামকরণের ইতিকথা’ থেকে জানা যায় যে, সেন বংশের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অভিজাত ব্রাহ্মণকুলের অভাবে পূজা-অর্চনায় প্রায় বিঘ্ন দেখা দিলে রাজা লক্ষণসেন আদিসুর কান্যকুব্জ থেকে কয়েকজন ব্রাহ্মণ পরিবারকে এই অঞ্চলে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যেই বেশ কিছু ব্রাহ্মণ পরিবার নিজস্ব বাড়ি তৈরি করে বসবাস করতে শুরু করেন শহরের মৌলভী পাড়ায়। তখন থেকেই এই জেলার নাম হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আবার অপর একটি মতানুসারে, দিল্লি থেকে আসা ইসলাম ধর্মপ্রচারক শাহ্‌ সুফী হজরত কাজী মাহমুদ শাহ্‌ এই শহর থেকে উল্লেখিত ব্রাহ্মণ পরিবারসমূহকে বেরিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার থেকে ব্রাহ্মণ বেরিয়ে যাও অর্থাৎ ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। একটা সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বাংলাদেশের সমতট জনপদের অংশ ছিল৷ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে এই জেলার অবদান অনেক। ইতিহাসে আমরা যে বারো ভুঁইয়াদের কথা পড়েছি, তাঁদের নেতা ঈসা খাঁ-র জন্ম হয় এখানেই এবং পরে ঈসা খাঁ সরাইল পরগণার জমিদারি পেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রাজধানী নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। ১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি লাভ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ত্রিপুরাকে যথাক্রমে ত্রিপুরা ও চাকলা রৌশনাবাদ এই দুই ভাগে বিভক্ত করে। এরপর ১৭৮১তে কুমিল্লা আর নোয়াখালির সরাইল পরগণা ছাড়া বাকি অংশ নিয়ে গড়ে ওঠে টিপ্পারা বা ত্রিপুরা জেলা। ইংরেজরা সুবিধের জন্য চাকলা রৌশনাবাদকে রৌশনাবাদ ত্রিপুরা বলতো। ১৯৬০ সালে প্রশাসনিক আদেশে ত্রিপুরা জেলার নামকরণ হয় কুমিল্লা জেলা। তার সুদীর্ঘ চব্বিশ বৎসর পর ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। এই চব্বিশ বছরের মাঝে বহু বিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে এই ত্রিপুরা জেলা। প্রথমে ১৮৩০ সালে নোয়াখালি থেকে ছাগলনাইয়া থানা ছাড়া বাকি সব অংশ বাদ দিয়ে ময়মনসিংহ থেকে সরাইল, দাউদপুর, হরিপুর, বেজরা ইত্যাদি পরগণা যুক্ত করা হয় ত্রিপুরার সঙ্গে। ১৮৬০ সাল নাগাদ ত্রিপুরা জেলার তিনটি সাব-ডিভিশনের সমষ্টি নিয়ে গড়ে ওঠে নাসিরনগর মহকুমা এবং ১৮৭১ সালে নাসিরনগর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মহকুমার স্থানান্তর ঘটে। সেইসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার অধীনে ছয়টি থানা গড়ে ওঠে – ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সরাইল, নাসিরনগর, নবীনগর, কসবা, বাঞ্ছারামপুর। এর অনেক পরে ১৯৮৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশের সব মহকুমাগুলিকেই জেলার মর্যাদা দেওয়া হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়াও জেলার মর্যাদা পায়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন শুরু হয়েছিল এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই জেলার আব্দুল কুদ্দুস মাখনের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সমস্ত সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে মুক্তির জেহাদ জানিয়ে রাস্তায় মিছিল বের করেন। ঐ বছরই ১৮ এপ্রিল আখাউড়ার দরুইন গ্রামে শহিদ হন মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা কামাল। কসবা উপজেলায় কুল্লাপাথর স্মৃতিসৌধ এখনও ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা-শহিদদের কবরে তাঁদের স্মৃতি দাফন করে রেখেছে।

এই জেলায় বাংলা ভাষাই প্রচলিত। বাংলাই এখানকার সরকারি স্বীকৃত ভাষা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে তার পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান ধর্মের মানুষও এই জেলায় বসবাস করেন।  

প্রশাসনিক দিক থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে ৯টি উপজেলা, ৯টি থানা, ৫টি পৌরসভা ও ৬টি সংসদীয় আসনে বিভক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও মোট ১০০টি ইউনিয়ন, ৯৯৩টি মৌজা এবং ১৩৩১টি গ্রাম রয়েছে এই জেলায়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৯টি উপজেলার মধ্যে বেশিরভাগ অংশেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংসদ গঠিত হয়েছিল, শুধুমাত্র সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অধীনে গঠিত সংসদ ছিল।   

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মানুষজনের প্রধান আয়ের উৎস হল কৃষি। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, এই জেলায় মোট ৮৯,৬৬৪ জন কৃষক রয়েছেন। মূলত বোরো ধান উৎপাদনের মাধ্যমেই এলাকার অর্থনীতি পুষ্ট হয়। এছাড়াও আউশ ধান, গম, পাট, শাকসব্জি, সর্ষে, মশলার ফলন এখানে বেশ ভালো হয়। প্রতি বছর প্রায় ৪,৩২,৭১০ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন হয় এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণস্থানের তালিকা অপূর্ণই থেকে যাবে যদি তালিকার শুরুতেই লক্ষীপুর শহীদ সমাধিস্থল, কালভৈরব, ফারুকী পার্কের স্মৃতিস্থম্ভ, হাতীর পুল, গঙ্গাসাগর দিঘী, জয়কুমার জমিদার বাড়ী, আশুগঞ্জ মেঘনা নদীর পার, টিঘর জামাল সাগর দীঘি, কেল্লা শহীদ মাজার, নাসিরনগর মেদিনী হাওড় অঞ্চলের নাম না থাকে। এছাড়াও বিখ্যাত ভ্রমণস্থানের মধ্যে পড়ে জেলার দক্ষিণ প্রান্তে ভাদুঘরে অ্যান্ডারসন খালের (কুরুলিয়া খাল) তীরে অবস্থিত ‘আবি ফিউচার পার্ক’, শিশুপার্ক ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সমাধিস্থল ‘কুল্লাপাথর শহীদ স্মৃতিসৌধ’। তবে এখানকার একমাত্র চা-বাগান যার আসল নাম ‘হরিহর টি এস্টেট’, তারপরে নবীনগরে বুড়ি নদীর সৌন্দর্য, কসবায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের হাট, রূপসদী জমিদার বাড়ি, হরষপুর জমিদারবাড়ির মতো বহু ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখার আছে এই জেলায়। তিতাস নদীর রূপ উপভোগ করতে করতে অদ্বৈত মল্লবর্মনের উপন্যাসের কথা স্মরণে আসতেই পারে। কিংবা হাতির পুল, কাজী মাহমুদ শাহের মাজার, বিদ্যাকুট সতীদাহ মন্দির এগুলিও বেশ রোমাঞ্চকর ইতিহাসের স্মৃতি বুকে নিয়ে রয়েছে আজও।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বহু কৃতী মানুষের জন্ম হয়েছে। বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত, বাঙালি সাহিত্যিক অদ্বৈত মল্লবর্মন, আল মাহমুদ, আব্দুল কাদির, মিন্নাত আলী এবং বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত শিল্পী অমর পাল, গিরীন চক্রবর্তী প্রমুখরা এই জেলাকে সমগ্র ভারতের দরবারে পরিচিত করে তুলেছেন নিজ গুণে ও দক্ষতায়। বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা-শহিদদের মধ্যে আবদুর রহমান, মনির আহমেদ খান, মোফাজ্জল হোসেন, শামসুল হক, শাহজাহান সিদ্দিকি প্রমুখরা জন্মেছেন এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে।   

এই জেলার পুতুল নাচও ছিল দেশ বিখ্যাত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রথম পুতুল নাচ সৃষ্টি করেছিলেন নবীনগর থানার কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল যিনি হিন্দু ধর্মের বা পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে নিজস্ব স্টাইলে তিনি পুতুল নাচ করাতেন। তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্যবসায়িক পুতুল নাচের স্রষ্টা বলা হয়। পুতুল নাচ ছাড়া নৌকা বাইচ, মোরগ লড়াই, ভাদুঘরের বান্নী (মেলা) যা ভাদুঘর তিতাস নদীর তীরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে যা এই জেলার ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য৷ প্রতি বছর মনসাপূজা উপলক্ষে ভাদ্রমাসে তিতাস নদী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়ে থাকে। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বলা হয় সঙ্গীতের পীঠস্থান কারণ বিখ্যাত সব কিংবদন্তি শিল্পীরা জন্মেছেন এখানেই যাঁদের মধ্যে ওস্তাদ আলি আকবর খান, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ প্রমুখদের নাম চিরস্মরণীয়। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলে চিহ্নিত করা হয় এই জেলাকে।

তথ্যসূত্র


 
Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।