সববাংলায়

মেটকাফ হল

বিভাগঃ ,

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এমন কিছু স্মৃতিস্তম্ভ, প্রাসাদ এবং বিল্ডিং রয়েছে, যা বছরের পর বছর ধরে শহরের সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক ল্যান্ডমার্ক হয়ে রয়েছে। কলকাতার এমনি এক বিশেষ ভবন হল মেটকাফ হল (Metcalfe Hall)। এই শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই হলটি ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাচীন স্থাপত্যের জাঁকজমকপূর্ণ ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। এছাড়া এই মেটকাফ হলের ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরী ছিল ভারতের প্রথম পাবলিক লাইব্রেরিগুলোর মধ্যে অন্যতম। পরবর্তীকালে এই লাইব্রেরী ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরী নামে পরিচিত হয় ও শেষে তা জাতীয় গ্রন্থাগারে পরিণত হয়।

মেটকাফ হল কোথায়

মেটকাফ হল হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন। এই হল কলকাতা শহরের কেন্দ্রস্থলে বিবাদী বাগ এলাকার কাছে স্ট্র্যান্ড রোড এবং হেয়ার স্ট্রিটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই হলের কাছে কলকাতার বিখ্যাত মিলেনিয়াম পার্ক রয়েছে। হলটির পাশ দিয়েই বয়ে গেছে হুগলি নদী, হলের মধ্যে থেকে যার অপরূপ সৌন্দর্য দর্শকরা উপভোগ করতে পারে।

মেটকাফ হলের ইতিহাস

১৮২৩ সালে কলকাতায় জন অ্যাডামসের উদ্যোগে ‘লাইসেন্সিং রেগুলেশন’ বা সংবাদপত্র আইন প্রকাশিত হয়েছিল। এই আইন ছিল ভারতের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। এই আইনের মাধ্যমে সংবাদপত্রের উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এই আইন অনুসারে লাইসেন্স ছাড়া প্রেস পরিচালনা করা অবৈধ বা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। এটি মূলত ভারতীয় ভাষার সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করতে জারি করা হয়েছিল। 

১৮৩৫ সাল থেকে ১৮৩৬ সাল পর্যন্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর জেনারেল থাকাকালীন স্যার চার্লস থিওফিলাস মেটকাফ সংবাদপত্রের ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞ তুলে নেন। এই কারণে তাকে ‘মুক্ত সংবাদপত্রের জনক’ বা ‘Liberator of the Press’ বলে অভিহিত করা হয়। তাঁর এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপকে সম্মান জানাতে কলকাতার বিশিষ্ট নাগরিকরা জনসভার মাধ্যমে তাঁর নামে একটি হল তৈরি করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এরপর ১৮৪০ সাল থেকে ১৮৪৪ সালের মধ্যে মেটকাফ হল তৈরি করা হয়।

শহরের ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত শ্রেণীর জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য এই সময় বিভিন্ন লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সেই সময়কার একটি বিখ্যাত লাইব্রেরী ছিল কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরী। প্রথমে এটি এসপ্ল্যানেড এলাকায় ছিল। এই সময় লর্ড মেটকাফও এখানে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লাইব্রেরী থেকে প্রায় চার হাজারের মতো বই স্থানান্তর করেছিলেন। এছাড়া ব্যক্তিগত অনুদানের মাধ্যমেও কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরীর বইয়ের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে শুরু করে। এই কারণে বইগুলিকে সুপরিসর ও উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরিত করার প্রয়োজনীয়তা হয়। তাই তৎকালীন ভারতের গভর্নর-জেনারেল লর্ড কার্জন পুরনো বইয়ের সুরক্ষা এবং জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরীকে নবনির্মিত মেটকাফ হলে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ১৯০৩ সালে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরীকে  ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরী নাম দিয়ে  মেটকাফ হলে স্থানান্তরিত করা হয়। তারপর তা জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এই লাইব্রেরীই পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার নামে পরিচিত হয়। তবে বর্তমানে এই লাইব্রেরীকে আলিপুর এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। বর্তমানে মেটকাফ হল বৌদ্ধিক আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্র হয়ে ওঠেছে। 

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে অবহেলা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মেটকাফ হলের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। যথাযথ যত্নের অভাবে বছরের পর বছর ধরে এই স্থাপত্যের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়। ১৯৯২ সালে ভারত সরকার দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ আইনের অধীনে কলকাতার মেটকাফ হলকে একটি সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। পরবর্তীকালে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ মেটকাফ হলের পূর্বের গৌরব পুনরুদ্ধার করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর জরাজীর্ণ অবস্থা থেকে এটি উদ্ধারের জন্য একটি বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। ২০১৯ সালে এটি পুনরুদ্ধার করে জনসাধারণের জন্য একটি জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক স্থান হিসেবে নতুন করে খুলে দেওয়া হয়। 

মেটকাফ হলের গঠনশৈলী

মেটকাফ হলের নকশা পরিকল্পনা করেছিলেন সিটি ম্যাজিস্ট্রেট সি কে রবিনসন। বাংলার গ্র্যান্ড মাস্টার ডঃ জেমস গ্রান্ট এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। জনসাধারণের চাঁদা থেকে ৬৮,০০০ টাকা নিয়ে এই হলটি তৈরি করা হয়েছিল। ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে দক্ষতার জন্য পরিচিত একটি বিখ্যাত সংস্থা বার্ন অ্যান্ড কোং এই হল তৈরি করেছিলেন। প্রাচীন গ্রীক মন্দিরের আদলে নির্মাণ করা হয়েছিল মেটকাফ হলটিকে। ভবনটি মূলত এথেন্সের উইন্ড টাওয়ারের আদলে তৈরি করা হয়।

এই হলটি একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপরে রয়েছে। মাটি থেকে এটি প্রায় ১০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। দুই তলা বিশিষ্ট এই ভবনের উপরে ওঠার জন্য বিশাল সিঁড়ি রয়েছে। এই হলের মোট ৩০টি করিন্থিয়ান স্তম্ভ রয়েছে। এই স্তম্ভগুলির প্রতিটির উচ্চতা প্রায় ছত্রিশ ফুট। এই স্তম্ভ এবং কলোনেডগুলিই পুরো ভবনটিকে ঘিরে রেখেছে। এই করিন্থিয়ান স্তম্ভগুলো ভবনটিকে একটি ধ্রুপদী গ্রিক স্থাপত্যের রূপ দিয়েছে। এছাড়া এই ভবনের পাঁচটি প্রশস্ত হল বা কক্ষ আছে। এই হলের বড় জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে যা পরিবেশকে আরও মনোরম করে তোলে। মেটকাফ হলের দুটি প্রবেশপথ রয়েছে, একটি হেয়ার স্ট্রিটের দিকে এবং অন্যটি স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে। তবে এখন আগের প্রধান প্রবেশপথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।পূর্ব দিকের হেয়ার স্ট্রিটের দিয়ে এখন এই ভবনটিতে প্রবেশ করা যায়। 

এই হলের ধ্রুপদী নকশাগুলি সেই যুগের ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য, মহিমা উভয়ই প্রতিফলিত করে। এই হলের সামগ্রিক নকশা নান্দনিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সেই সময়ের ঔপনিবেশিক শাসনের আকাঙ্ক্ষা এবং আদর্শেরও প্রতীক। স্থানীয় উপকরণ ও ইউরোপীয় স্থাপত্য কৌশলের সমন্বয়ে দেখা যায় এই ভবনে। এই হলের সম্মুখভাগ এবং অভ্যন্তরীণ স্থান জুড়ে তৎকালীন সময়ে প্রচলিত নানা কারুশিল্প দেখা যায়।

জনজীবনে মেটকাফ হলের প্রভাব

বর্তমানে এখানে মূলত ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধীনে একটি লাইব্রেরী ও অফিস রয়েছে। এছাড়া এশিয়াটিক সোসাইটির বিরল বিদেশী জার্নাল ও কিছু পাণ্ডুলিপি রয়েছে। এখানে ‘আমি কলকাতা’ নামের একটি মিউজিয়াম রয়েছে, যেখানে কলকাতা শহরকে একটি ডিজিটাল ও ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এখানে শিল্পকর্ম, ছবি এবং প্রদর্শনীর মাধ্যমে পুরোনো কলকাতার ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়। এই হলে একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠের নৌকা, মসলিন স্ক্রিনে প্রদর্শিত কলকাতার ভিডিও, সাদা-কালো নানা ছবি এবং বাংলার শিল্প ও হস্তশিল্প প্রদর্শিত হয়। শিল্প, কারুশিল্পকে একত্রিত করে সুন্দর অনুষ্ঠানের আয়োজনও এখানে করা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনীর মধ্যে রয়েছে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের কাজ, যা বাংলার শৈল্পিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। ভারতের পরিবর্তিত রাজনৈতিক দৃশ্যপট এবং ঐতিহ্যের সাথে কলকাতাও যে বিভিন্ন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে তাও মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়। এছাড়া এখানে কলকাতার দৈনন্দিন জীবন, আইকনিক ইয়েলো ট্যাক্সি, ট্রাম, কফি হাউস, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং হাওড়া ব্রীজের মতো স্থাপত্যের মডেল, আলোকচিত্রের নিদর্শন ইত্যাদি প্রদর্শিত হয়। এইসব চিত্রগুলি দর্শকদের মোহিত করে তোলে। আবার বাঙালি সংস্কৃতি, খাবার, থিয়েটার সংস্কৃতির নিদর্শনও রয়েছে এখানে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এখানে শহরের গল্পের উপস্থাপন করা হয়। এখানে মূলত কলকাতার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন গড়ে উঠেছে। এক কথায়, কলকাতা কীভাবে আজকের রূপে এসেছে তার ইতিহাস তুলে ধরে মেটকাফ হল। এছাড়া দর্শনার্থীরা কলকাতা সম্পর্কে তাদের চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে নোট রেখে যেতে পারেন এখানে। বর্তমানে মেটকাফ হলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিল্প প্রদর্শনী এবং আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয় জনজীবন ও শিল্পপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। তাই এখন হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক হলটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading