কলকাতার আলিপুর অঞ্চলে অবস্থিত জাতীয় গ্রন্থাগার বা ন্যাশনাল লাইব্রেরি হল ভারতের বৃহত্তম গ্রন্থাগার এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এই গ্রন্থাগারের প্রধান ভবনটি হল ঐতিহাসিক বেলভেডিয়ার হাউস, যা ঔপনিবেশিক যুগের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য। দীর্ঘ ইতিহাস, বিশাল সংগ্রহ এবং স্থাপত্যের ঐতিহ্যের জন্য ন্যাশনাল লাইব্রেরি শুধু একটি গ্রন্থাগার নয়, বরং ভারতের জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বহু গবেষক, ছাত্রছাত্রী এবং পাঠক প্রতিদিন এখানে এসে বই পড়েন এবং বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি কোথায়
ন্যাশনাল লাইব্রেরি কলকাতার আলিপুর অঞ্চলে অবস্থিত। নিকটেই রয়েছে আলিপুর চিড়িয়াখানা, আলিপুর জেল মিউজিয়াম এবং কলকাতার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। গ্রন্থাগারটি একটি বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ জুড়ে গড়ে উঠেছে। বিশাল সবুজ উদ্যান, গাছপালা এবং খোলা জায়গার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বেলভেডিয়ার হাউস এই পুরো এলাকার প্রধান আকর্ষণ। এই প্রশস্ত পরিবেশ গ্রন্থাগারের শান্ত ও অধ্যয়নমুখী পরিবেশ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ন্যাশনাল লাইব্রেরির ইতিহাস
বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরির প্রধান ভবনটি এককালে ছিল ঐতিহাসিক বেলভেডিয়ার হাউস। অষ্টাদশ শতকে আলিপুর অঞ্চলে এই প্রাসাদসদৃশ ভবনটি নির্মিত হয়। সেই সময় এটি উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হত। পরে এটি বেঙ্গলের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সরকারি বাসভবন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে ১৮৩৬ সালে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল এই অঞ্চলের প্রথম বড় পাবলিক লাইব্রেরিগুলির একটি। পরবর্তীকালে ১৮৯১ সালে কলকাতার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের গ্রন্থাগার একত্র করে ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে সেই সময় এই লাইব্রেরির ব্যবহার মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন কলকাতায় একটি বড় পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি এবং ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির সংগ্রহ গুলোকে একত্রিত করা হয়। ১৯০৩ সালে কলকাতার মেটকাফ হলে নতুন ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি অ্যাক্ট পাস করে ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরির নাম পরিবর্তন করে ন্যাশনাল লাইব্রেরি রাখা হয়। সেই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে গ্রন্থাগারের বিশাল সংগ্রহের জন্য আরও বড় স্থানের প্রয়োজন। তাই গ্রন্থাগারটিকে কলকাতার এসপ্ল্যানেড এলাকা থেকে সরিয়ে আনা হয় আলিপুরের ঐতিহাসিক বেলভেডিয়ার এস্টেটে।
বেলভেডিয়ার হাউস পরবর্তীকালে ন্যাশনাল লাইব্রেরির প্রধান ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। সংস্কার ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পর ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ন্যাশনাল লাইব্রেরিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে জনসাধারণের জন্য খুলে দেন। এরপর থেকেই বেলভেডিয়ার হাউস ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এইভাবে ঔপনিবেশিক প্রাসাদ থেকে শুরু করে বেলভেডিয়ার হাউস ধীরে ধীরে ভারতের বৃহত্তম গ্রন্থাগারের প্রধান ভবনে পরিণত হয়েছে।
ন্যাশনাল লাইব্রেরির গঠনশৈলী
ন্যাশনাল লাইব্রেরির প্রধান ভবন বেলভেডিয়ার হাউস ঔপনিবেশিক যুগের ইউরোপীয় ধাঁচের স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। এই ধরনের স্থাপত্যে সাধারণত সমমিত নকশা, বড় বড় কলাম, প্রশস্ত বারান্দা এবং উঁচু ছাদ দেখা যায় – বেলভেডিয়ার হাউসেও এই বৈশিষ্ট্যগুলি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। ভবনের সম্মুখভাগে প্রশস্ত সিঁড়ি এবং কলামযুক্ত বারান্দা এটিকে একটি প্রাসাদসদৃশ রূপ দিয়েছে। ভবনটি মূলত ইট, চুন-সুরকি এবং ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ উপকরণ দিয়ে তৈরি। উঁচু ছাদ এবং বড় বড় জানালার কারণে ভবনের ভিতরে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস প্রবেশ করতে পারে। এই ধরনের স্থাপত্যরীতি বিশেষভাবে উপযোগী ছিল কলকাতার গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য। প্রশস্ত করিডর এবং বড় বড় কক্ষ ভবনটির অভ্যন্তরীণ বিন্যাসকে আরও কার্যকর করেছে।
বেলভেডিয়ার হাউসের চারপাশে বিস্তীর্ণ সবুজ প্রাঙ্গণ রয়েছে, যা পুরো স্থাপত্যটিকে আরও সুদৃশ্য করে তুলেছে। পরবর্তীকালে গ্রন্থাগারের প্রয়োজন অনুযায়ী এই প্রাঙ্গণের মধ্যে আরও কয়েকটি আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এই নতুন ভবনগুলিতে বিভিন্ন পাঠাগার কক্ষ, সংগ্রহশালা এবং সংরক্ষণাগার স্থাপন করা হয়েছে। তবে নতুন স্থাপনা যুক্ত হলেও বেলভেডিয়ার হাউস এখনও ন্যাশনাল লাইব্রেরির ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এর স্থাপত্যরীতি কলকাতার ঔপনিবেশিক যুগের স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জনজীবনে ন্যাশনাল লাইব্রেরির প্রভাব
ন্যাশনাল লাইব্রেরি ভারতের জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রী, গবেষক এবং লেখক এখানে এসে বই পড়েন ও তথ্য সংগ্রহ করেন। ফলে এই স্থাপত্যটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ভবন নয়, বরং শিক্ষাজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। গ্রন্থাগারের বিশাল সংগ্রহে লক্ষ লক্ষ বই, পত্রিকা, মানচিত্র এবং বিরল দলিল সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় ভাষার বই সংগ্রহের ক্ষেত্রে এটি দেশের অন্যতম বৃহত্তম কেন্দ্র। এর ফলে দেশের ইতিহাস, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণে ন্যাশনাল লাইব্রেরির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও এই প্রতিষ্ঠান গভীরভাবে যুক্ত। বহু গবেষক, লেখক এবং ইতিহাসবিদ তাঁদের কাজের জন্য এই গ্রন্থাগারের উপর নির্ভর করেন। যদিও এটি কোনও পর্যটনকেন্দ্র নয়, তবু এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্থাপত্যের জন্য অনেক মানুষ এই জায়গাটি দেখতে আসেন। এইভাবে ন্যাশনাল লাইব্রেরি শুধু একটি গ্রন্থাগার নয়, বরং জ্ঞান, ইতিহাস এবং স্থাপত্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থান।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান